বিএফডিসি মূল ফটকের সামনে যেতেই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। দ্রুত পায়ে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির অফিসে ঢুকে গেলাম। সেখানে নৃত্য পরিচালক মাসুম বাবুল, আলেক জান্ডার বো, জায়েদ খান, জয় চৌধুরীসহ অনেকেই আছেন। চায়ের সঙ্গে আড্ডা জমে উঠতে সময় লাগলো না। শুটিং থেকে ফেরার পথে একবার ডাকাতের কবলে পড়েছিলেন নৃত্য পরিচালক ইউসুফ। শুরু হলো সেই গল্প।
ইউসুফ শুরু করলেন এভাবে: ‘শুটিং শেষ করে কুমিল্লা থেকে ঢাকা ফিরছিলাম অরুণাদি (অরুণা বিশ্বাস), চিত্রনায়ক সুমিত এবং আমি। রাত প্রায় ২টা। হঠাৎ গাড়ির সামনে মুখ কাপড়ে ঢাকা কয়েকজন এসে দাঁড়ালো। প্রত্যেকের হাতে রাম দা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম গাড়ির জানালা দিয়ে সুমিতের গলায় দা ধরে টাকা, মোবাইল ছিনিয়ে নিচ্ছে একজন। গাড়ির ড্রাইভারের হাত থেতলে দিয়েছে। অরুণাদি এবং আমি চিৎকার করছি। হঠাৎ আমি বলে ফেললাম ‘এই পিস্তল বেড় কর’। কথাটা শুনেই ডাকাতের দল দৌড়ে পালালো। অথচ সেদিন আমাদের কাছে কোনো পিস্তল ছিলো না। এই ফাঁকে আমরা দ্রুত গাড়ি নিয়ে চলে আসি।’
ইউসুফ ভাইয়ের উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হলো। এমন সময় শিল্পী সমিতিতে ঢুকলেন অভিনেত্রী শবনম পারভীন। তিনি দুই নং ফ্লোরে ‘নবাব এলএলবি’ সিনেমার শুটিং করছেন। শুটিংয়ের ফাঁকে এসেছেন। এসেই যখন শুনলেন ডাকাতির গল্প হচ্ছে, তখন তিনিও গল্পের ঝাপি খুলে বসলেন।
শবনম পারভীন বলতে শুরু করলেন এভাবে: ‘এটি ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। বাবার শরীরিক কিছু সমস্যা আছে। পরদিন সকালে চেকআপ করাতে হবে। বাবা ৯টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন। সেদিনও ঘুমিয়েছেন। কিন্তু আমার ঘুম আসছিলো না। হঠাৎ একটা শব্দ কানে এলো। গুরুত্ব দিলাম না। চোখ প্রায় লেগে এসেছে। কিছুক্ষণ পর আবার শব্দ হলো। চোখ মেলে দেখি আমার সামনে কয়েকজন দা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার স্বামীকে ততক্ষণে বেঁধে ফেলেছে। পাশের রুমে আমার মেয়েদেরও হাত-মুখ বেঁধে রেখেছে। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলাম! এদিকে বাবার রুম থেকে গোঙানির শব্দ পাচ্ছি। বুঝলাম বাবাকেও বেঁধে ফেলেছে। আমি ডাকাতদের সঙ্গে ঘুরছি আর বলছি- তোমরা সব নিয়ে তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে দাও। কিন্তু ওরা আমার কথা পাত্তা দিচ্ছিল না। উল্টো ফ্রিজ থেকে দধি বের করে আয়েশ করে খাচ্ছিল।’
উপস্থিত সবাই এ কথায় হেসে উঠলাম। শবনম পারভীনের প্রতিক্রিয়া ঠিক উল্টো। কণ্ঠ ধরে আসছে। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘আজ বিষয়টি হাসির মনে হলেও সেদিন আমি জীবনের মূল্যবান সম্পদ হারিয়েছি। ডাকাতরা চলে যাওয়ার পর লক্ষ্য করলাম বাবা আর বেঁচে নেই। শ্বাস আটকে বাবার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে বাবা খুব ছটফট করেছিল। ডাকাতের দল ভেবেছিল বাবা হয়তো চিৎকার করবে। তাই ওরা বাবার মুখ শক্ত করে বেঁধেছিল। অথচ বাবা শ্বাস নিতে পারছিলেন না বলেই ছটফট করছিলেন।’
হঠাৎ করেই কক্ষে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। এদিকে বৃষ্টিও কমে এসেছে। মন খারাপ করে ভাঙল আমাদের রাতের আড্ডা।