ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বৃহস্পতিবার ২৫ জুন ২০২৬ ১১ আষাঢ় ১৪৩৩
‘নির্যাতনের পর নারীদেহ বিলে ফেলে দিত হানাদাররা’
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Sunday, 8 March, 2020, 4:39 PM
সর্বশেষ আপডেট: Sunday, 8 March, 2020, 4:44 PM

‘নির্যাতনের পর নারীদেহ বিলে ফেলে দিত হানাদাররা’

‘নির্যাতনের পর নারীদেহ বিলে ফেলে দিত হানাদাররা’

১৯৭১ সালের ৪ মার্চ। সামরিক পোশাক খুলে ছেড়া লুঙ্গি পড়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালাতে গিয়ে পাকিস্তানীদের হাতে ধরা পড়লাম। আমিসহ আরো দুজনকে এমন একটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছিলো যেখানে ৫০-৬০ জন বাঙালি নারীকে পাশবিক নির্যাতন করা হতো। তাদের কেউ মারা গেলে পাশের বিলে ফেলে দিতো।

আমি উপায় খুঁজছিলাম। একপর্যায়ে তিন পাকসেনাকে মেরে ওই নারীদের নিয়ে পালিয়ে যাই।

বলছিলেন মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বায়রা গ্রামের বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল খান।

সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিলের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি জানান, ১৯৬৯ সালে তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।  প্রথমে তার পোস্টিং হয় রাওয়ালপিন্ডির একটি সামরিক বিমান ঘাটিতে। ৭১ এর জানুয়ারীতে তিন মাসের ছুটিতে বাড়িতে আসেন। ছুটি শেষে ১২ মার্চ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে যোগদানের জন্য রিপোর্ট করেন। কয়েকদিন পর রাওয়ালপিন্ডি যাওয়ার ফ্লাইট ছিলো। ওইসময় তিনিসহ কয়েকজন বাঙালি সেনা সদস্য থাকতেন বর্তমান বনানী রেলস্টেশনের কাছে একটি টিনশেড ক্যাম্পে।

২৫ মার্চ রাতে ঢাকা শহরে গুলাগুলির শব্দে তাদের ঘুমভেঙ্গে যায়। পরেরদিন তারা সাদা পোশাকে ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যান।
আব্দুল জলিল তখন ছেড়া লুঙ্গী আর গেঞ্জি পড়ে মানিকগঞ্জের দিকে রওনা দেন। কিন্তু টঙ্গীর কাছাকাছি আসার পর পাকিস্তানী আর্মীরা তাকেসহ সঙ্গে থাকা আরো দুইজনকে ধরে ফেলে।

ওই দুইজনের একজন ছিলেন –মিরপুরের আব্বাস নামে এক কশাই, অন্যজন কুমিল্লার পাটুয়ারী। তাদের ধরে নিয়ে বর্তমান শাহজালাল আন্তরজাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি সেনাক্যাম্পে কাজ করতে দেয়া হয়।

পাকিস্তানী সেনারা বুজতে পারেনি যে আব্দুল জলিল একজন সেনা সদস্য। আব্বাসের পরিচয় পেয়ে তাকে দিয়ে ক্যাম্পের গরু-ছাগল জবাইয়ের কাজ করাতো।

একপর্যায়ে জলিল জানতে পারে যে ওই ক্যাম্পে তিনজন পাকিস্তানি সেনা পাহারায় থাকে। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল পালানোর সুযোগ খুজতে থাকেন।  

এ বিষয়ে প্রথমে কথা বলেন আব্বাসের সঙ্গে। পরে পাটুয়ারীর সঙ্গে। পাহারাদার তিন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যাকরে পালানোর পরিকল্পনা করা হয়। আব্বাসের কাছে আগে থেকেই গরু ছাগল জবাইয়ের তিন চারটি চাপাতি ছিল।

কয়েক দিন পর এক সন্ধ্যায় আসে সেই মাহিন্দ্রক্ষণ। ওই সময় পাহারায় থাকা তিনজন ছাড়া আর কোন পাকিস্তানি সেনা ছিলোনা। সন্ধায় তিন সেনাকে খাবার দেন আব্দুল জলিল। পাকিস্তানি সৈন্যরা খাবার খেতে বসলে আচমকা জলিল ও আব্বাস দুটি চাপাতি দিয়ে তাদের খুন করেন। এরপর ক্যাম্প থেকে বন্দি নারীদের নিয়ে পালিয়ে যান।   

দুইদিন পর সঙ্গে থাকা সিংগাইরের একনারী এবং ধামরাইয়ের আরেক নারীকে নিয়ে জলিল সিংগাইরের বায়রা গ্রামের বাড়িতে যান। পরে নারীরাও তাদের নিজ নিজ বাড়িতে চলে যান।   

আব্দুল জলিল বলেন, বাড়িতে আসার কয়েকদিন পর সিংগাইর থানা পুলিশ আমার খোঁজে আসে। আমি তখন বাড়ি ছিলাম না। পুলিশ জানায় ,সেনাবাহিনী থেকে পালানোর অভিযোগে জলিলের বিরুদ্ধে  গ্রেফতারী জারি হয়েছে।

তিনি বলেন, এ কথা শুনে কয়েকদিন অন্য গ্রামে পালিয়ে থাকি। একসময় শুনতে পাই হরিরামপুরে ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ হচ্ছে। এলাকার আরো কয়েকজন মিলে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করি।
আমাদেরকে কমান্ডার তোবারক হোসেন লডুর বাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত   করা হলো। আমাকে বাহিনীর ট্রেনার কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ট্রেনিং দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন অভিযানেও  নিয়মিত অংশ নিয়েছি।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল আরো বলেন, যে কয়েকটি অভিযানে অংশ নিয়েছি তার মধ্যে ২৯ অক্টোবর সিংগাইরের গোলাইডাঙ্গার যুদ্ধ ছিল অন্যতম। ওটা ছিল সফল অভিযান।

সেসময় আমরা গোলাইডাঙ্গা স্কুলে অবস্থান নিই। এ খবর দালালদের মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনারা জানতে পারে। প্রায় একশত পাকসেনা সাতটি নৌকায় কালিগঙ্গা নদী পথে মুক্তি যোদ্ধাদের ক্যাম্প আক্রমন করতে আসে। এখবর মুক্তিযোদ্ধারা আগেই পেয়ে যান। আমরা তখন না পালিয়ে পাল্টা আক্রমনের প্রস্তুতি নেই।

জলিল বলেন, তখন ছিলো বর্ষাকাল।  আমাদের কাছে বেশিরভাগই ছিলো থ্রি নট থ্রি রাইফেল। পাকিস্তানিদের নৌকা দেখার সঙ্গে সঙ্গে   আমরা ফায়ার শুরু করি। একটি নৌকা ছাড়া বাকিগুলো ডুবাতে সক্ষম হই।

তারা মেশিনগানসহ অটোমেটিক রাইফেল দিয়ে একনাগারে গুলি ছুড়তে থাকে। আমরা তখন পিছু হটি। এ সময় আমি একটি মাটির ডিবিতে আটকা পড়ি।

আমার হাতে ছিলো একটি মার্ক টু রাইফেল। একপর্যায়ে তিন পাকসেনাকে হত্যা করি। ওই যুদ্ধে ৮১ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। মানিকগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাদের এটাই ছিলো একটি সফল যুদ্ধ।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status