|
ক্রেতার প্রতিচ্ছবি দেখায় নাজিয়ার 'মিরর'
সাকিব আল রোমান
|
![]() ক্রেতার প্রতিচ্ছবি দেখায় নাজিয়ার 'মিরর' শুরুটা ২০১৪ সালের মার্চ মাস। তখন অনার্স শেষ করে কিছুটা অধ্যবসায়। অনলাইনে জব সার্কেল দেখেই সময় কাটতো তরুণীর। দেখতে দেখতে ফেইসবুকে পেজ পেজ খোলার পরিকল্পনা। কিন্তু কিভাবে পেজ খুলে? এমনটা ভাবতে ভাবতে একদা একটা পেজ খুলেই ফেলে নাজিয়া। নাম নিয়ে বাধে বিপত্তি! নাম না হয় মেনে নিলাম, পণ্যটা কি রাখবো? পণ্য রাখলেই কি বিক্রি হয়? কি হবে এত সাত-পাঁচ ভেবে? যা হবার তাই তো হবে। বিক্রি হলে ভালো না হলে নিজেই ব্যবহার করবো না হয় কাছের মানুষদের উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দিবো, এটাই শেষ কথা। স্টুডেন্ট বয়সে তো একটু হিসেব করেই খরচ দেয় পরিবার। চাপিয়ে চলায় অভ্যস্ত স্বাভাবিক। তবে, ফ্যাশন সচেতন নাজিয়া সেখান থেকেইও কিছু আর্ন করার চেষ্টা চালাতেন। একটা সময় তার মস্তিস্কে সেট হয়ে যায় কোথায় গেলে কি সেভ হবে। অনেক গল্পই তো বলা হলো, এবার আসি আসল কথায়। 'মিরর' কেন পেজ নাম দেয়া হলো আসুন জেনে নেই নাজিয়ার মুখ থেকেই। ![]() ক্রেতার প্রতিচ্ছবি দেখায় নাজিয়ার 'মিরর' এ বিষয়ে নাজিয়া 'নতুন সময়'কে বলেন, পেজের নাম অনেক ভাবে ঠিক করলাম মিরর দিব। কারন একমাত্র আয়নাতেই আমরা আমাদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। আমার প্রোডাক্ট কিনে মানুষ তার সুন্দর প্রতিচ্ছবি দেখবে। তাই এটাই আমর ভাবনা ছিল, আর সেখান থেকেই মিরর নামকরণ। তিনি আরও বলেন, কাছের এক বন্ধুর থেকে কিছু টাকা ধার নিয়ে কিছু জুয়েলারি কিনলাম। সেগুলোর ছবি আপলোড দিলাম। সারাদিন এটা নিয়েই এতো ভাবতাম, যে আর কি সেল করা যাবে? লাইক কিভাবে বাড়াবো? জল্পনা কল্পনা চলতেই থাকত। কাছের পরিচিত বন্ধু-বান্ধবি, ছোট বোনদের কে বলতাম লাইক আর শেয়ার করো পেজটা। তারপর ভাবলাম হলুদের 'গহনা' বানিয়ে এমন কারিগর আমার জানা আছে। পরে হলুদের গহনার অর্ডার নেয়া শুরু করলাম। তারপর দেখলাম তখন নেটের লেস শাড়ির খুব ডিমান্ড, পরে প্রি-অর্ডার এ অনেক কম প্রফিটে লেস শাড়ি অর্ডার নিতাম। আবার ছোট বোনের শিক্ষিকার রিলেটেড একজন কসমেটিক সেল করত তার থেকে কিছু কিছু আনতাম বাকিতে সেল করে করে টাকা দিয়ে দিতাম। মিরর এমডি বলেন, এলাকায় এক বুটিক থেকে আমি ড্রেস কিনতাম, ওই আপুর সাথে অনেক ভালো সম্পর্ক ছিল, সেই সুবাদে তার থেকে ড্রেস নিয়ে সেল করতাম। এভাবে একটু একটু করে আগাচ্ছিলাম, কিন্তু কচ্ছপের গতিতে। সব থেকে বড় সমস্যা ছিল মূলধনের অভাব। কারন, আমার মা বাবার এসবে সাপোর্ট ছিল না। তাদের থেকে লুকিয়েই বিজিনেসটা করতাম প্রথম দিকে। গল্পটা এখানেই শেষ নয়, বলা চলে গল্পের শুরুটা এখানেই! কান পেতে শুনছেন এই 'নতুন সময়'র প্রতিবেদক। নাজিয়া বলেন, তারপর আমার বিয়ে হয়। শ্বশুরবাড়িতে প্রথম প্রথম কেউ কিছু বলত নাহ কিন্তু কেউ বিষয়টা পছন্দ করত নাহ, ভাবতো একটা জব করাই ভালো। আমার স্বামী বলতো , যতদিন জব না পাও করতে থাকো। জব খুঁজতাম কিন্তু বিজনেসে বেশি টাইম দিতাম। এমনও হত পরিচিতদের বাসায় প্রডাক্ট নিয়ে যেতাম, যাতে দেখে ভালো ভাবে বেশি প্রোডাক্টস নিতে পারে। এর কারণ হিসেবে এই উদ্যোক্তা জানান, 'সবাই বলত অনলাইন-এ আসলে দেখে তারা কনফিউজড। অনেক দূরে দূরে আত্তিও, পরিচিত বন্ধু -বান্ধবদের বাসায় গিয়ে দেখিয়ে প্রোডাক্ট দিতাম। অনেকেই ভালো ভালো প্রডাক্ট পেয়ে রেগুলার আসতে বলতো আর অনেক অনেক প্রডাক্ট নিত। আমার স্বামী চাইত আমি জব করি' 'নতুন সময়' প্রতিবেদককে তিনি আরও বলেন, সে (স্বামী) দেখত আমার কষ্ট হয় এত প্রডাক্ট নিয়ে যেতে। কিন্তু বিয়ের পর পর আমার স্বামীর জব পরিবর্তন করার জন্য আর্থিকভাবে পিছিয়ে পরে। সংসারের গুরু দায়িত্বটা ছিল তার উপরই। আমি আমার নিজের হাত খরচটা চালানোর জন্য সাথে তাকে যদি কিছুটা সাপোর্ট দেয়া যায় তাই এই বিজিনেসটা কষ্ট হলেও এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলাম। জব খুঁজেছি কিন্তু 'আদর্শ লিপী বইটা আর পুরো পাওয়া হয়নি' অর্থ্যাৎ যা পেতাম তা সুবিধামত হচ্ছিল না। মিরর এমডি বলেন, আমি কিভাবে অনলাইন মার্কেটিং করে জানতাম নাহ। তাই বেশি দূর এগুতে পারছিলাম নাহ। তারপর কেপিটাল কম ছিল। এলাকায় অনেকে বিজিনেস করতো পরিচিতদের মধ্যে। বিভিন্নজন থেকে প্রডাক্ট নিয়ে সেল করতাম। অনেক লিং খুঁজে খুঁজে এমন একজনকে বের করলাম যে নিজে প্রডাক্ট ইম্পোর্ট করে। তার থেকে প্রডাক্ট নিয়ে সেল করা শুরু করলাম। তখন আমার অনলাইনে কাজ করার সব থেকে সুবিধাজনক যে জিনিসটা একটি 'এন্ড্রয়েট ফোন' তা কেনার সাধ্য ছিল না! বাসার পিসিতেও প্রব্লেম ছিল। পরবর্তীতে কর্তা (স্বামী) অফিস থেকে ল্যাপটপ বয়ে নিয়ে আসতে শুরু করে আমার জন্য, আমি সন্ধ্যার পর থেকে সারা রাত জেগে কাজ করে সকালে ঘুমাতাম। এভাবেই চলতে ছিল দিনগুলো। প্রায় মাস তিনেক পরে পিসিটা ঠিক করে দেয় ঘরওয়ালা (স্বামী)। ৬ মাস পরে আমি কিছু টাকা দিলাম, সে আরও কিছু যুক্ত করে একটা মোটামুটি ভালো এন্ড্রয়েড ফোন কিনে দেয়। শুরু হয়ে আমার স্বপ্ন জয়ের যুদ্ধ। তিনি তৎকালীন স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, তখন বিজিনেস অনেক ভালো হচ্ছিলো। ডিজিটাল মার্কেটিং সম্পর্কেও আইডিয়া রপ্ত হয়ে যায় ততদিনে। অনলাইন বিজিনেসের ডিমান্ড বাড়তে থাকে দেশব্যাপী। একবছর পর থেকেই আমি নিজের হাত খরচ চালিয়ে কিছু ছোট ছোট অবদান রাখতে সক্ষম হই পরিবারের জন্য। তারপর আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি [একটু মুচকি হেসে শুকরিয়া স্বরুপ 'আলহামদুলিল্লাহ']। তারপর আরও অনেক ইম্পোর্টার পেলাম বিভিন্ন সুত্রে। নিজের বিজিনেসের প্রফিট আর স্বামীর কিছু সহায়তায় বাড়তে থাকে মূলধন। অনেক প্রডাক্ট বাড়ালাম। দিনের পর দিন ক্রেতার সংখ্যা বাড়তে থাকল। আমার সবসময় চেষ্টা থাকতো ক্রেতা কি চায় তা জেনে তাকে তার বাজেটমত বেষ্ট প্রোডাক্টস দেয়া। ![]() ক্রেতার প্রতিচ্ছবি দেখায় নাজিয়ার 'মিরর' মানবিক নাজিয়া বলেন, বিগত ৫ বছরে এমনও হয়েছে নিজে লস দিয়েও অনেক সময় কোন প্রডাক্ট ক্রেতার পছন্দ না হলে পরিবর্তন করে দিয়েছি। ক্রেতার সংখ্যা অনেক বাড়াবো টার্গেট ছিল। তবে, নাহ! কম থাকুক কিন্তু তারা যেন রেগুলার ক্রেতা হয় এটাই চাওয়া ছিল। সেই চাওয়া পূরণ করেছে বিধাতা। ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, ভেবেিছি অনেকদিন যতই অনলাইন করি ক্রেতার একটা চাহিদা থাকবেই, তা হলে ক্রেতার অধিকার দেখে যাচাই বাছাই করে কেনার তা থেকে তাকে কেন বঞ্চিত করবো? তার জন্য মাথায় একটা শোরুম দেয়ার পরিকল্পনা করে এগিয়ে ছিলাম। স্বপ্নটা বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। 'মিরর' তার প্রথম শো-রুম দিচ্ছে মিরপুর অরিজিনাল ১০ এ। এবার মুলধন কিন্তু বেশির ভাগই আমার [মিষ্টি হেসে]। তবে, সাথে আমার স্বামীর সমর্থন বরাবরের মতই আছে। যাই করি সে সবসময় সেটাকে কিভাবে সুন্দর ভাবে গুছিয়ে করা যায় আরও ভালো করতে পরামর্শ দেয়, অনেক কাজ এগিয়ে দেয় অবসরে। তার মানসিক, শারিরিক ও আর্থিক সাপোর্ট ছাড়া আজকের এই অবস্থা আমার একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। স্বামী-ক্রেতা ও শুভাকাঙ্খিদের উদ্দেশে 'মিরর' এমডি বলেন, আমার স্বামী সম্পর্কে হয়তো বলে শেষ করতে পারবো না। তবে ক্ষুদ্র শব্দে বলতে পারি আমার এতদূর আসার পেছনে যে হাতটি আমাকে আগলে রেখেছে সে আমার স্বামী। আমার জীবনে অনেক চড়াই-উৎরাই পার করেছি তখন যারা আমাকে বিশ্বাস করে পাশে দাড়িয়েছিলেন, যারা আমার খারাপ সময়ে আমাকে বিশ্বাস করে আমার প্রডাক্ট নিয়ে বিজিনেসে সাহায্য করেছে তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আমার চেষ্টা-শ্রম-ক্রেতার প্রতি সততা আর সবার সাহায্য নিয়েই আমি আজকের এই মিররের নাজিয়া। থাকতে চাই আমৃত্যু। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
