অবশেষে অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। ডিসেম্বরেই খুলে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জের বহুল প্রতীক্ষিত পঞ্চবটি-মুক্তারপুর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দ্বিতল সড়কের একটি অংশে ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলক যান চলাচল শুরু হয়েছে। শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে টোল প্লাজা, র্যাম্প ও সড়কের আনুষঙ্গিক অবকাঠামোয়। সবকিছু ঠিক থাকলে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর উদ্বোধন করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এই বিশাল অবকাঠামো ঘিরে এখন দুই জেলার মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা। বিশেষ করে পঞ্চবটি, ফতুল্লা, কাশীপুর, বিসিক শিল্পনগরী ও মুন্সীগঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগে নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিনের যানজটের দুর্ভোগ থেকে মুক্তির পাশাপাশি শিল্পকারখানার পণ্য পরিবহনেও সময় ও ব্যয় কমার আশা করা হচ্ছে।
গত ১৫ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সড়কটি চালুর আশাবাদ ব্যক্ত করেন। প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানিয়েছেন, উদ্বোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সময় চেয়ে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। তবে উদ্বোধনের চূড়ান্ত তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।
প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণ কাশীপুরে নির্মিত ১০ লেনের টোল প্লাজা। পঞ্চবটি প্রবেশমুখে কোনো টোল প্লাজা রাখা হয়নি। কাশীপুরে ছয়টি লেন দিয়ে মূল উড়াল সড়কে যানবাহন চলাচল এবং বাকি চারটি লেন দিয়ে ওঠানামার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
উপরের সড়কটি ১১ মিটার প্রশস্ত। এতে রয়েছে দুটি যান চলাচলের লেন। মাঝখানে প্রায় আড়াই মিটার জায়গা রাখা হয়েছে জরুরি প্রয়োজনে বিকল যানবাহন সরিয়ে রাখার জন্য। নিচে থাকছে ৫৪ ফুট প্রশস্ত চার লেনের সড়ক। অর্থাৎ দ্রুতগতির যানবাহন চলবে ওপর দিয়ে, আর স্থানীয় ও স্বল্প দূরত্বের যানবাহনের জন্য থাকছে নিচের সড়ক।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রকল্পটির ব্যয় ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। পঞ্চবটি থেকে চরসৈয়দপুর পর্যন্ত ৬ দশমিক ২৫ কিলোমিটার দ্বিতল সড়কের পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় তিন কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও র্যাম্প। পঞ্চবটি মোড়ে তিনটি এবং কাশীপুরে দুটি র্যাম্প রয়েছে।
অক্টোবরের শেষ দিকে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৯৯ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানানো হয়। এখন চলছে টোল প্লাজার সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার স্থাপন, র্যাম্পের রেলিং, আলোকসজ্জা এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ।
তবে সড়কটি চালুর আগেই টোলের হার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যানবাহনের শ্রেণিভেদে পঞ্চবটি থেকে চরসৈয়দপুর পর্যন্ত মোটরসাইকেলের টোল ৪০ টাকা, সিএনজি ৫০, প্রাইভেটকার ১০০, মাইক্রোবাস ১৫০, মিনিবাস ২০০, বড় বাস ৩০০ এবং ছয় চাকার ট্রাকের জন্য ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১০ চাকার ট্রাকের টোল ৬০০ এবং ট্রেইলারের ৮০০ টাকা। কাশীপুর পর্যন্ত স্বল্প দূরত্বের জন্য রয়েছে পৃথক টোল হার।
মুন্সীগঞ্জের কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পক্ষ থেকে এই টোলকে ব্যয়বহুল উল্লেখ করে কমানোর দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বে চলাচলকারী যানবাহনের টোল পুনর্বিবেচনার দাবি উঠেছে।
অন্যদিকে নিচের চার লেনের সড়ক টোলমুক্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে টোল এড়াতে অধিকসংখ্যক যানবাহন নিচের সড়ক ব্যবহার করলে সেখানে নতুন করে যানজট তৈরির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, পঞ্চবটি, বিসিক শিল্পনগরী এবং মুন্সীগঞ্জের শিল্পকারখানাগুলোর পণ্য পরিবহনে সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানকে। বাড়ে জ্বালানি খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং পণ্য সরবরাহে বিলম্ব।
প্রকল্পের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, সড়কটি চালু হলে যাতায়াতের সময় প্রায় ৬২ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমতে পারে। যানবাহনের গড় গতি বাড়তে পারে ৪ দশমিক ৪৫ গুণ। তবে বাস্তবে এই সুফল কতটা মিলবে, তা নির্ভর করবে সড়ক ব্যবস্থাপনার ওপর।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উড়াল সড়ক চালু হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। পঞ্চবটি মোড়, ফতুল্লা, বিসিক শিল্পাঞ্চল এবং চাষাঢ়ামুখী সংযোগ সড়কগুলোতে যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে নতুন অবকাঠামোর সুফল অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
প্রশ্ন উঠেছে, টোল আদায় ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হবে তো? নিচের সড়কে যানবাহনের চাপ সামলানোর প্রস্তুতি কতটা? নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে কি?
৩ হাজার ৩১৮ কোটি টাকার এই প্রকল্প এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। দুই জেলার মানুষের প্রত্যাশা, এটি যেন আরেকটি ব্যয়বহুল অবকাঠামো হয়েই না থাকে; বরং যানজটের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়ে নারায়ণগঞ্জের শিল্প-বাণিজ্য ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে সত্যিকার অর্থেই গতি ফেরায়।