|
আইফোনের লোভেই তাজমিন হত্যা? সিএনজিচালককে ঘিরে যত রহস্যের জট
নতুন সময় প্রতিনিধি
|
![]() আইফোনের লোভেই তাজমিন হত্যা? সিএনজিচালককে ঘিরে যত রহস্যের জট এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালক মো. সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয়েছে তাজমিনের আইফোন। ফোনের কললিস্ট, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বিকেলে ফোনটি উদ্ধার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার হওয়া আইফোনের কললিস্ট, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার সূত্র মেলানোর চেষ্টা করছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, তা এখনো যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার সুমন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত বলে তারা মনে করছেন। তবে তিনি একাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর কথা রয়েছে। বাসা থেকে বেরিয়ে দুই জেলায়, এরপর কুমিল্লায় ফেরা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তাজমিন। পরিবারের সদস্যদের সে জানিয়েছিল, বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে যাচ্ছে। পরে তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, ওই দিন সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়েছিল। পরদিন কুমিল্লায় ফিরে আবার কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে তাকে গাড়ি থেকে একা নামতে দেখা যায়। পরে হোটেলের আশপাশের বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজে তার হাতে মোবাইল ফোন এবং কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ দেখা যায়। একপর্যায়ে তাকে সড়কের দিকে চলে যেতে দেখা গেলেও এরপর তার গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। সিএনজিতে ওঠার পর কী ঘটেছিল? তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার জন্য তাজমিন একাই একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে। চালক সুমন তার হাতে থাকা আইফোন দেখতে পান। এরপর শহরের পথে না গিয়ে তিনি অটোরিকশাটি অন্য পথে নিয়ে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পুলিশের দাবি, সুমন মাদকাসক্ত অবস্থায় অটোরিকশা চালাতেন। তবে ঘটনার সময় তার শারীরিক অবস্থা এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এর সম্পর্ক তদন্তের বিষয়। তদন্তকারীদের ধারণা, আইফোনের প্রতি লোভ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে হত্যার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং ঘটনার পুরো বিবরণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে এখনো তদন্ত চলছে। ধানক্ষেতের পাশে পড়ে ছিল সিএনজি, পরে মিলল মরদেহ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের পাশ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলের কাছে গিয়ে তারা ধানক্ষেতের পাশে অটোরিকশাটি পড়ে থাকতে দেখেন। আশপাশের ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির আলামতও তাদের চোখে পড়ে। পরে আলামত অনুসরণ করে সামনের একটি ধানক্ষেতে মরদেহ দেখতে পান তারা। এরপর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। অটোরিকশার সূত্র ধরে গ্রেপ্তার সুমন মরদেহের পাশ থেকে উদ্ধার করা অটোরিকশাটির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে এর মালিক হিসেবে লালমাই উপজেলার আবুল হাসেমকে শনাক্ত করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, অটোরিকশাটি ভাড়ায় চালাতেন মো. সুমন। সুমন লালমাই উপজেলার বাগমারা ইউনিয়নের জয়নগর এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। পরে তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালিয়ে শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে আটক করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বিকেলে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়। সুমন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা। কয়েক বছর আগে বিয়ের পর ঘরজামাই হিসেবে লালমাইয়ের জয়নগর গ্রামে বসবাস শুরু করেন তিনি। প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক বিরোধের জেরে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে জানা গেছে। আইফোনের তথ্যেই মিলবে কি সব প্রশ্নের উত্তর? তাজমিন কেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে গিয়েছিল, সেখানে কার সঙ্গে দেখা করেছিল এবং কুমিল্লায় ফিরে কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কি না- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। তার নতুন কিংবা পুরোনো পরিচিতদের কেউ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া আইফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে তাজমিনের চলাফেরা এবং যোগাযোগের সূত্রগুলো যাচাই করছে পুলিশ। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে, যাতে ঘটনার আগে ও পরে তার গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। এ ছাড়া হত্যার আগে তাজমিন ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কি না, তা মেডিকেল প্রতিবেদনের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার তার মরদেহ যশোরের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া আইফোনের তথ্য, কললিস্ট, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গ্রেপ্তার সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। শনিবার সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।’ তাজমিনের হাতে থাকা একটি আইফোন কি শেষ পর্যন্ত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে প্রমাণিত হবে, নাকি তদন্তে বেরিয়ে আসবে আরও কোনো যোগসূত্র- এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
