|
টেস্টে অকৃতকার্য হলে কি এসএসসি পরীক্ষায় বাধা দিতে পারে স্কুল?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() টেস্টে অকৃতকার্য হলে কি এসএসসি পরীক্ষায় বাধা দিতে পারে স্কুল? এর মধ্যে টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ ১০৩ জনকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। বাকি ৩৮২ জন পরীক্ষা দিয়ে সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এই নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর সেখানে নিয়ম বর্হিভূত কৌশল নেওয়া হয়েছে কিনা, সেটা জানতে স্কুলটির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। কিন্তু টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করার কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেওয়ার সুযোগ কি একটি স্কুলের রয়েছে? এ বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম কী? ১৫ বছর ধরে পাসের হার শতভাগ এই স্কুলে যে স্কুলটিকে নিয়ে এই আলোচনার শুরু, সেটি হলো নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস। ২০০৮ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১২ সাল থেকে টানা ১৫ বছর এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার শতভাগ। এর মধ্যে ২০১৫, ২০১৭, ২০২২ ও ২০২৫ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। চলতি বছরও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে স্কুলটিতে।এবার স্কুলটি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৮২ জনের সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। ওই ১৫ বছরে স্কুলটি থেকে মাধ্যমিকে ট্যালেন্টপুল ও সাধারণে বৃত্তিও পেয়েছে ১৫৩ জন। স্কুলটির প্রকাশিত ফলাফলের তালিকায় ২০১৫ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে দশম এবং পরবর্তী বিভিন্ন বছরে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘দেশসেরা’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। তারপরও স্কুলটি নিয়ে অভিযোগ কেন স্কুলটি এখন আলোচনায় আসার কারণ হলো ঢাকা বোর্ডের পাঠানো ‘শোকজ’। গত ১০ অগাস্ট মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে এবারও শতভাগ পাস ও জিপিএ-ফাইভ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচনা হয়। অনেকেই অভিযোগ করেন, জিপিএ-৫ পাওয়ার হার বাড়ানোর জন্য ও রেকর্ড ধরে রাখার জন্য এই স্কুলে অনেক শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসতেই দেওয়া হয় না। বিষয়টি ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের নজরে এলে তারা ঘটনার সার্বিক সত্যতা যাচাই এবং প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য জানতে স্কুলকে গত ১৬ আগস্ট একটি নোটিশ দেয়। বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক ড. মো. মাসুদ রানা খান স্বাক্ষরিত সেই আদেশে বলা হয়, চলতি বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষায় ‘শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের জন্য নিয়মবহির্ভূত কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ’ উঠেছে নাসিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের বিরুদ্ধে। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীর তথ্য, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর তথ্য, এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর তথ্য এবং এসএসসি পরীক্ষায় ফরমপূরণকৃত শিক্ষার্থীর তথ্যসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র সশরীরে উপস্থিত হয়ে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে উত্থাপিত অভিযোগের কারণ ব্যাখ্যার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন আহমেদের সঙ্গে মঙ্গলবার সারা দিন মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে গণমাধ্যম। কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দেননি। আর স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেলেও তিনি জানিয়েছেন, স্কুলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছে, তার জবাব স্কুল প্রমাণসহ দিবে। এর চেয়ে বেশি কিছু জানার থাকলে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। তবে প্রধান শিক্ষক এক গণমাধ্যমকে বলেছেন, শোকজের বিষয়ে আমরা অবগত আছি। আমাদের ৪৮৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৩ জন টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ায় তাদের বাদ দিয়ে ৩৮২ জন শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তারা সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। এ নিয়ে একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমাদের সব কাজের স্বচ্ছতা রয়েছে। আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বোর্ডকে জবাব দেব। যা বলছে স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ওই স্কুলের কয়েকজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে গণমাধ্যম। বিভিন্ন কারণে তারা তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। তাদের মধ্যে একজন অভিযোগ করে বলে, এ বছর তার ওই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্কুলের টেস্ট পরীক্ষায় দুই নম্বরের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে সে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। তাই ওই স্কুল থেকে বের হয়ে অন্য স্কুল থেকে পরীক্ষা দেয়। অন্য স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে সে ও তার সহপাঠীদের অনেকেই জিপিএ-৫ পেয়েছে বলে দাবি তার। তাহলে স্কুলের পরীক্ষায় কেন সে উত্তীর্ণ হতে পারেনি জানতে চাইলে সে বলে, টেস্ট পরীক্ষায় বোর্ড স্ট্যান্ডার্ড প্রশ্ন করা হয় না। এরা ক্লাস ওয়ান থেকে টেন পর্যন্ত পড়ায়। এরপর যখনই মনে হয় যে একে দিয়ে আমরা এ+ পাব না, তখন অকৃতকার্য দেখায় এবং অভিভাবকদের বলে, আপনার মেয়েকে আরো এক বছর স্কুলে রাখেন, আমরা এ বছর ফরম পূরণ করতে দেব না। এগুলা বলে শিক্ষার্থীদেরকে আটকে দেয়। টেস্ট পরীক্ষার খাতা তারা পুনরায় দেখেছিল কিনা জানতে চাইলে হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিয়ে সে বলে, আমরা দেখলাম যে দুই-তিন মার্ক কম পেয়ে ফেল আসছে আমাদের। তখন আমরা বললাম, এই খাতা তো বোর্ডে দেখলে দুই তিন নাম্বার দিত। তখন তারা বলছেন, আমরা বোর্ডের মতো খাতা দেখি না। দুই-একজন পায়েও ধরেছে যে পরীক্ষা দিতে দেন। কিন্তু স্যার বলছেন, তোমরা তো এ+ পাবা না, তোমাদেরকে পাস করায়ে দিয়ে কি করব। তাদের নিয়ম হলো, যতজন পরীক্ষা দেওয়াবে, ততজনকেই এ+ পেতে হবে। এই শিক্ষার্থী আরো জানায় যে, গত নভেম্বরে হওয়া স্কুলের টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর তারা চলতি বছর জানুয়ারিতে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেছিল। অভিযোগের পরের দিন জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয় যে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে। এরপর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বসেই তারা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা দেয়। ওই পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হয়েছিল, তাদেরকে ফরম পূরণ করতে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন জেলা প্রশাসক, এই তথ্য জানিয়ে তিনি আরো দাবি করেন, জেলা প্রশাসক তাদের সামনে বসেই প্রধান শিক্ষককে কল দেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষক জানান, তারা ফরম পূরণ করতে দিবেন না। স্কুলটির আরেক প্রাক্তন শিক্ষার্থীও দাবি করে যে, স্কুলের টেস্ট পরীক্ষায় উচ্চতর গণিতে সে অকৃতকার্য হয়েছিল, তাই সে সেখান থেকে পরীক্ষা দিতে পারেনি। কিন্তু জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বসে দেওয়া সেই পরীক্ষায় সে প্রথম হয়েছিল। পরে সে নরসিংদী সানবীম স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দেয় এবং জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতকার্য হয়। এই শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্কুলটিতে মাসিক বেতন দুই হাজার ৩০০ টাকা। এর পাশাপাশি অন্যান্য ফি-ও আছে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল শুধু স্কুলে পড়েই করে না। তাদেরকে স্কুলেরই শিক্ষকদের কাছে বছরব্যাপী প্রাইভেট পড়তে হয়। এদিকে, শিক্ষার্থীরা যে জেলা প্রশাসকের কথা বলছে, তার নাম মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কমিশন সচিব হিসেবে কর্মরত। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, স্কুলের কথা হলো ওরা ফেল করেছে। তখন আমি দেখতে চাইলাম যে আসলেই ফেল করার মতো কিনা। অনেকেই ফেল করেছে। কয়েকজন পাসও করেছে। তখন অনুরোধ করেছিলাম যে যারা পাস করেছে, এদেরকে বিবেচনা করা যায় কিনা। পরে জানতে পেরেছি যে ওরা টিসি নিয়ে অন্য স্কুলে চলে গেছে। তিনি আরো বলেন, এ বিষয়ে তখন তাদেরকে বলেছিলাম যে কতজন এ+ পেয়েছে, সেটি আমাদের দেখার বিষয় না। একজন শিক্ষার্থীও যেন ফেল না করে, সেভাবে পাঠদান করেন। টেস্ট পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম কী? বাংলাদেশে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, এসএসসি পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীর পড়াশোনার মান যাচাই করে দেখতে স্কুল থেকে টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষা নেওয়া হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অফিশিয়াল নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচনী (টেস্ট) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। বোর্ডের পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালায় বলা আছে, বোর্ড অনুমোদিত কোনো বিদ্যালয় থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষাক্রম শেষ করার পর ওই বোর্ডে রেজিস্ট্রেশন করা শিক্ষার্থী নিজ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। সেখানে স্পষ্ট করে এও লেখা রয়েছে, বোর্ডের কেবল বৈধ রেজিস্ট্রেশনধারী এবং নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্র/ছাত্রীরাই পরীক্ষার আবেদন ফরম পূরণ করতে পারবে। ২০১৮ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে জারি করা একটি বিশেষ আদেশে এসএসসি ও এইচএসসি নির্বাচনী পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মূল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি না দেওয়া সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্বাচনী পরীক্ষার উত্তরপত্র বা খাতা পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলকভাবে সংরক্ষণ করারও আদেশ দেওয়া হয় তখন। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করতে হবে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানের ইন্টেনশন থাকে যে যারা জিপিএ-৫ পাবে না, তাদেরকে ইচ্ছে করে ফেল দেখাব, যাতে ফরম পূরণ করতে না পারে। এই বিষয়টিকে তিনি ‘অসুস্থ প্রতিযোগিতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বোর্ড কোনো র্যাকিং করে না, গত তিন বছরে করেনি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদেরকে সেরা দেখানোর জন্য এটা করে। নিজেকে সেরা দেখালে সেরা শিক্ষার্থীগুলো পাবে। বেতন বেশি নিতে পারবে। তিনি মনে করেন, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করে, তখন ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পাঠদানের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং ওই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বছরের পর বেতন-ভাতা নিয়ে কেন-ই বা ওপরের ক্লাসে তোলা হলো, এটিও তখন বিষয়। হাসান আরো জানান, তারপরও কোনো শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করলে তার পুনরায় (রিটেক) একাধিকবার টেস্ট পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষমতাও ওই প্রতিষ্ঠানের হাতে আছে। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
