ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বৃহস্পতিবার ৩০ জুলাই ২০২৬ ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
কেমন অধিনায়ক ছিলেন মিরাজ, কেন তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো?
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Thursday, 30 July, 2026, 12:40 PM
সর্বশেষ আপডেট: Thursday, 30 July, 2026, 12:55 PM

কেমন অধিনায়ক ছিলেন মিরাজ, কেন তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো?

কেমন অধিনায়ক ছিলেন মিরাজ, কেন তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো?

“টানা চার সিরিজ জয়ের পর একটি সিরিজের ব্যর্থতায় কি নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা ঠিক হবে?”, ওয়ানডে অধিনায়ক পরিবর্তনের পালায় বিসিবির অন্দরে মধ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত প্রশ্ন ছিল এটিই। তবু নীতি-নির্ধারকদের স্থির বিশ্বাস ছিল, পরিবর্তনটি জরুরি। তিন সংস্করণের দলে সামগ্রিক সমন্বয়ের স্বার্থে, আগামী বিশ্বকাপে তাকিয়ে, আগের বোর্ডের ভুল শোধরানোর তাগিদ থেকে এবং মেহেদী হাসান মিরাজের নিজের জন্যও। বিসিবি পরিচালকদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই সিদ্ধান্তে মূল ভূমিকা ছিল সভাপতি তামিম ইকবালের।

তামিম শুধু বিসিবি সভাপতিই নন, বোর্ডের ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগও তিনি দেখভাল করেন। জাতীয় দল সংক্রান্ত কার্যক্রম এই বিভাগের আওতায়ই পড়ে। তিনি নিজে মিরাজের সঙ্গে কথা বলে যেমন বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন, তেমনি বোর্ড পরিচালকদের সঙ্গেও কথা বলে পরিষ্কার করেছেন ভাবনা। তবে অনুমিতভাবেই, সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না!

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবং এদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি অনুযায়ী, এই ধরনের সিদ্ধান্ত কখনোই সহজ নয়। সবশেষ পাঁচ সিরিজের চারটিতেই জয়ী অধিনায়ককে সরিয়ে দেওয়ার নজিরও আর নেই। ২৪টি ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়ে অধিনায়ক হিসেবে তার সাফল্যের হার ৪৩.৭৫ শতাংশ। বাংলাদেশের বাস্তবতায় যা খারাপ নয় খু একটা। তার পরও সামনে তাকিয়ে নেতৃত্বের গভীরে গিয়েই পরিবর্তনটি আনা জরুরি মনে করেছে বিসিবি।

মিরাজকে সরিয়ে লিটন দাসকে অধিনায়ক ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন তামিম। পারফরমার মিরাজকে ফিরে পাওয়ার তাগিদ, তিন সংস্করণে তিন অধিনায়ক থাকলে সমন্বয়ের বড় টানাপোড়েন, টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হিসেবে নজরকাড়া লিটনকে ওয়ানডেতেও এই রূপে পাওয়ার আশা, এই সবকিছুরই ভূমিকা ছিল নেতৃত্বে পরিবর্তনের পেছনে। তবে বিসিবি কর্তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল ওয়ানডে দলে মিরাজের জায়গাই নড়বড়ে হয়ে পড়া, আগামী বিশ্বকাপের ভেন্যু দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েতে মিরাজের সম্ভাব্য কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন এবং সর্বোপরি, তার নেতৃত্বগুণ নিয়ে সংশয়।

দলের ওপর ও ড্রেসিং রুমে তার কর্তৃত্ব যথেষ্ট নয় বলেই মনে হচ্ছিল বিসিবি কর্তাদের। সেই কর্তৃত্ব মানে খবরদারি নয়, বরং ক্রিকেটারদের ওপর তার ছাপ ও ওপর প্রভাব। অধিনায়ক হিসেবে দলের ভেতর যথেষ্ট সম্মান ও সমীহ তিনি আদায় করতে পারছিলেন কি না, এই প্রশ্ন উঠছিল এবং সেই প্রশ্নের উত্তর মিরাজের জন্য খুব সুখকর নয়।

নিখাদ ক্রিকেটীয় দিক থেকেও মিরাজের নেতৃত্বে ঘাটতির জায়গা দেখছিল বিসিবি। এমনকি অনেক সময় জয়ের ম্যাচগুলিতেও মিরাজের কিছু অন-ফিল্ড সিদ্ধান্ত বেশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে দেশের ক্রিকেট আঙিনায় এবং বিসিবি কর্তাদের নজর এড়ায়নি তা।

অধিনায়ক মিরাজের টানা চারটি সিরিজ জয়কে আরও একটি কারণে পাশ কাটাতে পেরেছে বিসিবি। ওই জয়গুলির সবকটিই ছিল দেশের মাঠে। বিদেশের মাঠে তিন সিরিজের সবকটিতেই হেরেছেন অধিনায়ক মিরাজ। গত বছর শ্রীলঙ্কা সফরে ২-১ ব্যবধানে হারের পর আবু ধাবিতে হোয়াইটওয়াশড হতে হয় আফগানিস্তানের কাছে। এরপর জিম্বাবুয়ের কাছে সিরিজ হারার পরই অধিনায়ক মিরাজের পরিণতি একরকম চূড়ান্ত হয়ে যায়।

সংবাদ সম্মেলনে তামিম যে কারণগুলি তুলে ধরেছেন, সেগুলি সিদ্ধান্তের পেছনে রেখেছে সহায়ক ভূমিকা। বিসিবি সভাপতি সুনির্দিষ্ট করেই বলেছেন, বোলিং ঠিকঠাক হলেও ব্যাটিংটা ভালো হচ্ছে না অধিনায়কের। পরিসংখ্যান সেটির পক্ষে স্বাক্ষ্য দেয় স্পষ্ট।

ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হিসেবে চার ওয়ানডের তিনটিতেই ফিফটি করেছিলেন মিরাজ। কিন্তু নিয়মিত অধিনায়ক হওয়ার পর তাই সেই ব্যাটিং ফর্ম হারিয়ে যায় পুরোপুরি। ১৭ ইনিংসে ফিফটি করতে পেরেছেন মোটে একটি। সেটির পরও পেরিয়ে গেছে ১৩ ইনিংস।

নিয়মিত অধিনায়ক হিসেবে ১৭ ইনিংসে তার ব্যাটিং গড় ১৯.৪২। স্ট্রাইক রেট ৬৯.৯২।

এই সময়ে উইকেট নিয়েছেন তিনি ২২টি। ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন ৪.০৯। অসাধারণ কিছু না হলেও এই পারফরম্যান্স খারাপ নয় মোটেও। তবে ব্যাটিং-বোলিংয়ের অলরাউন্ড প্যাকেজ হিসেবে খুব আকর্ষণীয় কিছু নয়। ব্যাটিংয়ে টানা অবদান রাখতে না পারলে স্রেফ এই বোলিং দিয়ে দলে জায়গা ধরে রাখা কঠিন। কিছু উইকেটে, কিছু প্রতিপক্ষের সঙ্গে, কিছু প্রেক্ষাপটে যেমন তিনি কার্যকর হতে পারেন, আবার কিছু কিছু প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন আরও ধারাল কোনো বোলার কিংবা আরও উপযোগী কোনো ব্যাটসম্যান।

দলীয় ভারসাম্যের ক্ষেত্রে স্বয়ং অধিনায়কই এখানে বড় বাধা হয়ে উঠছিলেন কখনও কখনও। পাশাপাশি বিসিবির পর্যবেক্ষণ ছিল, অধিনায়ক হিসেবেও বাড়তি তেমন কিছু তিনি যোগ করতে পারছিলেন না।

বিসিবি কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিরাজের সঙ্গে বিসিবি প্রধানের কথোপকথনের বড় অংশজুড়ে ছিল ব্যাটিং। ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দিয়ে ফর্ম ফিরে পাওয়ার তাগিদ তাকে দিয়েছেন তামিম।

পরিবর্তনের জন্য সময়টাও ছিল বিসিবির ভাবনায় খুব গুরুত্বপূর্ণ। আরও দু-একটি সিরিজ মিরাজকে পরখ করতে পারতেনন না। কিন্তু যেহেতু সংশয়ের জায়গাটা তৈরি হয়েছে তাকে নিয়ে এবং বিশ্বকাপে তিনি অধিনায়ক হিসেবে যেতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্ন খোদ বিসিবির অন্দরেই জেগে উঠেছে, এরপর তারা আর সময় ক্ষেপণের যৌক্তিকতা দেখেননি। বরং ভারতের বিপক্ষে সিরিজের আগে নতুন অধিনায়ককে সময় দিতে চেয়েছেন পরিকল্পনার জন্য। বিশ্বকাপের জন্যও যথেষ্ট সময় অধিনায়ককে দিতে চেয়েছেন তারা।

মিরাজকে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আরেকটি প্রভাবক ছিল লিটনের মতো বিকল্প তৈরি থাকাও। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে লিটনের নেতৃত্বের ধরন, তার পরিকল্পনা, ভাবনার গভীরতা, তার প্রতি সতীর্থদের সমীহ, সবকিছু দেখে ওয়ানডে দলেও তার ছাপ দেখার আকাঙ্ক্ষা জেগেছে বিসিবি কর্তাদের। যদিও এই সংস্করণে তার ব্যাটিং ফর্মের অধারাবাহিকতার ব্যাপারটি আলোচনায় এসেছে, তবে সাদা বলের দুই সংস্করণে এই অধিনায়কই উপযুক্ত মনে করেছে বোর্ড।

পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলার পর মূল ব্যাপার ছিল প্রক্রিয়ার, যেখানে বরাবরই বড় গলদ বা ঘাটতি রয়ে যায় বাংলাদেশের ক্রিকেটে। গত বছর নাজমুল হোসেন শান্তকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াতেও যা ছিল প্রকাশ্য। গত বছরের জুনে আচমকাই শান্তকে সরিয়ে মিরাজকে ওয়ানডে দলের দায়িত্ব দেয় আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ড। বোর্ডের সেই সিদ্ধান্তে যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল শান্তর ওপর। সেটি প্রকাশ্য হয়ে ওঠে, যখন ক্ষোভে-অভিমানে টেস্ট দলের নেতৃত্বও ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।

বলার অপেক্ষা রাখে না, শান্তর সঙ্গে যোগাযোগে বড় ঘাটতি ছিল তখনকার বোর্ড প্রধান আমিনুল ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমুল আবেদিন ফাহিমের। পরে যদিও তারা শান্তকে বুঝিয়ে আবার টেস্ট নেতৃত্বে ফিরতে রাজি করান, তবে আগের সেই ক্ষত রয়েই যায়। আগেও নানা সময়ে দেখা গেছে, সংবাদমাধ্যমে খবর দেখে পরিবর্তনের কথা জেনেছেন অধিনায়কেরা।

এবার মিরাজকে বদল করে লিটনকে নেতৃত্বে আনার পর প্রশ্নটি আবার উঠল। প্রক্রিয়া ঠিকঠাক অনুসরণ করা হয়েছে তো?

প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই তামিমের ঝটপট জবাব ছিল, “প্রক্রিয়া যেটি অনুসরণ করার কথা, আমি সেটি অনুসরণ করেছি। যারা যারা এটির সঙ্গে সম্পৃক্ত, সবাইকেই জানানো হয়েছে। সবাই একমত হয়েছে। এরপরই ব্যাপারটি আপনাদের (সংবাদমাধ্যম) সামনে এসেছে।”

এবার তাই প্রক্রিয়াতেও কোনো ফাঁক ছিল না বলেই এখনও পর্যন্ত মনে হচ্ছে।

যদিও মিরাজ সানন্দে ‘একমত’ হয়েছেন বা সিদ্ধান্তটি সাদরে গ্রহণ করেছেন, ব্যাপারটি পুরোপুরি তা নয়। বোর্ড সভাপতির সঙ্গে কথোপকথনে তিনিও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন, নানা পারিপার্শ্বিকতা তুলে ধরেছেন এবং পরোক্ষে সময়ও চেয়েছেন। তবে একটা পর্যায়ে গিয়ে তিনি বোর্ড সভাপতির সঙ্গে এক বিন্দুতে আসতে পেরেছেন। হতে পারে, সেটা সম্ভাব্য পরিণতি বুঝতে পেরেই।

নেতৃত্বে পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর মিরাজ ঘনিষ্ঠদের বলেছেন, “মনে হয় একটা বড় ভার নেমে গেল।” তার সেই কথায় স্বস্তির ছাপই হয়তো বেশি। তবে সেই ঘনিষ্ঠদেরই উপলব্ধি, আক্ষেপ, হতাশা ও হাহাকারও আছে তার ভেতরে। যদিও নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে কাছের মানুষদের তিনি এটাও বলেছেন, বোর্ড প্রধানে যুক্তি-তর্কের ভিত্তি বেশ মজবুত এবং দিনশেষে সেখানে দ্বিমত করার অবকাশ খুব বেশি নেই। পারফর্ম করেই তিনি এখন ওয়ানডে দলে নিজের উপযোগীতা প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ নিচ্ছেন।

সব মিলিয়ে বোর্ড এবং বিদায়ী অধিনায়ক এখন তাকাচ্ছেন সামনে, দেশের ক্রিকেটের জন্য যা আপাতত ইতিবাচক।

আরও একটি ইতিবাচক ব্যাপার, বাংলাদেশের ক্রিকেটে ‘সাহসী’ সিদ্ধান্ত ও ‘জনপ্রিয়’ সিদ্ধান্ত একবিন্দুতে মিলে যাওয়ার নজির আছে খুব কমই। মিরাজের নেতৃত্বে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সেই বিরল ব্যাপারটিই সম্ভবত ঘটেছে!

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status