ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২৬ ১ শ্রাবণ ১৪৩৩
মহাখালী বাস টার্মিনাল ইজারার দরপত্র ভেস্তে যাচ্ছে বারবার, নেপথ্যে কী?
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Thursday, 16 July, 2026, 3:45 PM

মহাখালী বাস টার্মিনাল ইজারার দরপত্র ভেস্তে যাচ্ছে বারবার, নেপথ্যে কী?

মহাখালী বাস টার্মিনাল ইজারার দরপত্র ভেস্তে যাচ্ছে বারবার, নেপথ্যে কী?

তিন দফায় দরপত্র আহ্বান করেও মহাখালী আন্তজেলা বাস টার্মিনালের ইজারা দিতে পারেনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। কখনো শিডিউল বিক্রিই হয়নি, কখনো বিক্রি হলেও জমা হয়নি দরপ্রস্তাব, আবার কখনো দরপ্রস্তাব জমা পড়লেও তা আগের বছরের চেয়ে তো কমই, ভিত্তিমূল্যেরও অর্ধেক।

ডিএনসিসির কর্মকর্তাদের সন্দেহ, ভিত্তিমূল্য কমিয়ে কম দামে ইজারা পেতেই সুকৌশলে দরপত্রপ্রক্রিয়া ভন্ডুল করা হচ্ছে। এই সন্দেহের কারণ ব্যাখ্যা করে তাঁরা বলছেন, তিন দফা দরপত্র আহ্বানের পরও কাঙ্ক্ষিত দরদাতা না মিললে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ইজারার ভিত্তিমূল্য পুনর্নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। সেই সুযোগই নিতে চাইছে ইজারা নিতে আগ্রহীরা।

ইজারা নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন বিএনপি কিংবা এর সহযোগী সংগঠনের নেতা। তাঁরাই এই কৌশল খাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, বর্তমান ভিত্তিমূল্যে ইজারা নিলে লাভ করা সম্ভব নয়।

এই দরপত্রে নানাভাবে আলোচনায় আসছে বিএনপির ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক এম এ কাইয়ুমের স্বজন, ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরিদ হোসেন, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন, চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি শাখাওয়াত হোসেন এবং স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মশিউর রহমানের নাম।

ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, বাইরে রাজনৈতিক চক্র, পাঁয়তারা যা–ই থাকুক না কেন, নিয়মের বাইরে গিয়ে কাউকে কম দামে ইজারা দেওয়ার সুযোগ নেই।

তিন দফায় ব্যর্থ

মহাখালী আন্তজেলা বাস টার্মিনালের ইজারা দিতে গত জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত তিন দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। ডিএনসিসির পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফার তিনটি পর্যায়ে মোট ১১টি শিডিউল বিক্রি হলেও একটি দরপ্রস্তাবও জমা পড়েনি। দ্বিতীয় দফার প্রথম পর্যায়ে একটি শিডিউল বিক্রি হয়, সেটিও জমা পড়েনি। পরের তিনটি পর্যায়ে মোট চারটি শিডিউল বিক্রি হয়। এর মধ্যে তিনটি দরপ্রস্তাব জমা পড়লেও প্রস্তাবিত দর ছিল ভিত্তিমূল্যের অর্ধেকের কম। এরপর গত মে মাসে তৃতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। তার প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়েও কোনো শিডিউল বিক্রি হয়নি।

গতবার টার্মিনালটির ইজারা হয়েছিল ২ কোটি ৪১ লাখ টাকায়। ডিএনসিসি এবার ইজারার ভিত্তিমূল্য ধরেছে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। হিসাবটি করেছে এভাবে, দিনে ১ হাজার ১০০টি বাসে থেকে ৫০ টাকা হারে ৫৫ হাজার টাকা টোল আসে। দিনে গড়ে ৫০টি লেগুনা ও অটোরিকশা থেকে ১০ টাকা হারে ৫০০ টাকা আদায় হয়। শৌচাগার ব্যবহার থেকে প্রতিদিন আদায় হয় ৬ হাজার ৫০০ টাকা। টার্মিনালের ভেতরে থাকা ৯৭টি দোকান ও টিকিট বিক্রির কাউন্টার থেকে প্রতি মাসে ১ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ভাড়া আসে।
ভিত্তিমূল্য ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা

এই বাস টার্মিনালের ইজারার জন্য বিভিন্ন খাতে সম্ভাব্য আয়ের হিসাব ধরে ডিএনসিসি সরকারনির্ধারিত ভিত্তিমূল্য রেখেছে প্রায় ২ কোটি ৪৬ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন টার্মিনাল ব্যবহারকারী ১ হাজার ১০০টি বাসের প্রতিটি থেকে ৫০ টাকা হারে ৫৫ হাজার টাকা টোল আদায় হয়। প্রতিদিন গড়ে ৫০টি লেগুনা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে ১০ টাকা হারে ৫০০ টাকা আদায় হয়। টার্মিনালের শৌচাগার ব্যবহার থেকে প্রতিদিন ৬ হাজার ৫০০ টাকা আয় হয়। টার্মিনালের ভেতরে থাকা ৯৭টি দোকান ও টিকিট বিক্রির কাউন্টার থেকে প্রতি মাসে ভাড়া আসে ১ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। বছরে ৩৬০ কার্যদিবস ধরে সম্ভাব্য আয় হিসাব করে ইজারার ভিত্তিমূল্য ঠিক করেছে ডিএনসিসি।

গত অর্থবছরে টার্মিনালটির ইজারা হয়েছিল ২ কোটি ৪১ লাখ টাকায়। সে সময় ভিত্তিমূল্য ছিল প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ ৩ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, এবার টার্মিনালের দোকান ও টিকিট কাউন্টারের ভাড়া প্রতি বর্গফুট ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করায় ইজারার ভিত্তিমূল্যও কিছুটা বেড়েছে।

এদিকে টার্মিনালের আগের ইজারার মেয়াদ শেষ হয়েছিল গত ১৪ মার্চ। এর পর থেকে এটি খাস, অর্থাৎ নিজেদের ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করছে ডিএনসিসি।  গত ১৫ মার্চ থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত ১০২ দিনে দোকান ও টিকিট কাউন্টারের ভাড়া বাদে আদায় হয়েছে ৫৪ লাখ ৯১ হাজার ৮৯৮ টাকা। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে আদায় হয়েছে ৫৩ হাজার ৮৪২ টাকা। তাতে বছরে আয় দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ডিএনসিসির দাবি, বছরে সম্ভাব্য আয় প্রায় ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা। আদায়ের ঘাটতির জন্য জনবলসংকটকে দায়ী করছেন ডিএনসিসি কর্মকর্তারা।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিবহন বিভাগের একজন কর্মকর্তা  বলেন, খাস ব্যবস্থাপনায় জনবলসংকট থাকায় সব খাত থেকে যথাযথ রাজস্ব আদায় সম্ভবপর হয় না। তবে ইজারা–ব্যবস্থায় এই সীমাবদ্ধতা থাকে না। তাই বর্তমান ভিত্তিমূল্য বাস্তবসম্মত।

শিডিউল বিক্রি হয়, জমা পড়ে না

বাস টার্মিনালটি কম দরে ইজারা পেতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিতভাবে দরপ্রস্তাব জমা না দেওয়ার কৌশল নিয়েছে, এমন ইঙ্গিত মিলেছে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে।

দুই দফায় শিডিউল কিনেও দরপ্রস্তাব জমা দেয়নি এম এইচ এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির মালিক নাজমুল হুদা। তিনি বিএনপি নেতা এম এ কাইয়ুমের ভাতিজা। কাইয়ুম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। শিডিউল কেনার চালানে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে ফোন ধরেন কামরুল হুদা। তিনি নিজেকে নাজমুল হুদার বড় ভাই পরিচয় দিয়ে বলেন, প্রতিষ্ঠানের দেখভালের দায়িত্ব তিনি সামলাচ্ছেন।

গতবার ইজারা নিয়ে লাভ হয়নি দাবি করে কামরুল হুদা বলেন, ভ্যাট-ট্যাক্সসহ প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ব্যাংক সুদের খরচও ওঠে না। তাই এবার দরপ্রস্তাব জমা দেননি তাঁরা। ইজারার ভিত্তিমূল্য পুনর্বিবেচনা করতে ডিএনসিসিকে অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানান কামরুল হুদা। তিনি হিসাব কষে বলেন, ইজারার দর দেড় কোটি টাকায় নামানো হলে ব্যবসাটি লাভজনক হবে এবং ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা মুনাফা করা সম্ভব হবে।

কম দামে ইজারা নেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে দরপত্র জমা না দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, টার্মিনালে কোনো চাঁদাবাজি বা দখলদারি নেই। সিটি করপোরেশন ভিত্তিমূল্য পুনর্মূল্যায়নের কথা জানিয়েছে, তাঁরা এখন সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এম এ কাইয়ুমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। খুদে বার্তারও জবাব দেননি।

কামরুল হুদা জানান, গত বছর তাঁরা আগের ইজারাদার ও ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরিদ হোসেনের সঙ্গে যৌথভাবে টার্মিনাল পরিচালনা করেছিলেন। ফরিদ হোসেনের প্রতিষ্ঠান এস এফ করপোরেশন এ বছর দুই দফায় শিডিউল কিনলেও কোনোবারই দরপ্রস্তাব জমা দেয়নি।

ফরিদ হোসেন  বলেন, সেবার ইজারা নিয়ে লোকসান হয়েছে। তাই ভিত্তিমূল্য কমানোর বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় দরপ্রস্তাব জমা দেননি। কৌশল খাটানোর অভিযোগ তিনিও অস্বীকার করেন।

দরপ্রস্তাব ভিত্তিমূল্যের অর্ধেকের কম

টার্মিনালটি ইজারা পেতে সবচেয়ে বেশি চারবার শিডিউল কেনে আরিনাজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রথম দুইবার দরপ্রস্তাব জমা না দিলেও পরের দুইবার প্রতিষ্ঠানটি এক কোটি টাকা করে দরপ্রস্তাব করে।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি শাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকারনির্ধারিত মূল্য তাঁদের কাছে বেশি মনে হয়েছে। তাই নিজেদের হিসাব অনুযায়ী এক কোটি টাকা দর দিয়েছেন। ভিত্তিমূল্য কমানো হলে আবারও দরপত্রে অংশ নেওয়ার কথা ভাববেন।

শাখাওয়াত দাবি করেন, তিনি কোনো ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক গ্রুপের প্রতিনিধিত্ব করেননি। এ বিষয়ে এম এ কাইয়ুম বা শেখ ফরিদ হোসেনের সঙ্গেও তাঁর কোনো আলোচনা হয়নি।

দরপত্র আহ্বানের দ্বিতীয় দফায় এশিয়া প্যাসিফিক ট্রেডিংয়ের মালিক ইমদাদ হোসেনও এক কোটি টাকার দরপ্রস্তাব দেন। তাঁর মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এদিকে শাখাওয়াত হোসেনের দাবি, ছাত্রদলে যুক্ত ইমদাদ তাঁদের সঙ্গেই আছেন।

এ ছাড়া সফট টাচ নেটওয়ার্কের মালিক ও স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মশিউর রহমান এবং মেসার্স সাখাওয়াত এন্টারপ্রাইজের মালিক, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন—এই দুজন শিডিউল কিনলেও দরপ্রস্তাব জমা দেননি। তাঁদের বক্তব্য, সরকারনির্ধারিত দরে ইজারা নিলে ব্যবসা লাভজনক হবে না।

অন্যদিকে শিডিউল কেনা ক্ল্যাসিক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক, কাফরুল থানা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান দাবি করেন, হুমকি পাওয়ায় নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি দরপ্রস্তাব জমা দেননি। তবে কারা তাঁকে হুমকি দিয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।

ইজারাদার না পেলে দরপত্র পুনর্মূল্যায়ন হবে কি না, জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, তিনবার দরপত্র আহ্বানের পর নিয়ম অনুযায়ী দর পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন হলে নিয়ম মেনেই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status