|
স্বামী ক্যানসারে, স্ত্রী প্রসূতি ওয়ার্ডে—নিউইয়র্কের দুই হাসপাতালে চলছিল দুই যুদ্ধ
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() স্বামী ক্যানসারে, স্ত্রী প্রসূতি ওয়ার্ডে—নিউইয়র্কের দুই হাসপাতালে চলছিল দুই যুদ্ধ জীবনের সবকিছুই চলছিল স্বাভাবিক নিয়মে। বড় মেয়ে অর্নির স্কুল, স্বামী-স্ত্রীর সংগীতচর্চা আর প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষ দিকে হঠাৎ করেই বদলে যায় সবকিছু। পেটে অস্বস্তি আর পিঠে ব্যথা অনুভব করতে শুরু করেন ইবরার টিপু। স্ত্রী বিন্দুকণা তাঁকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বললেও শুরুতে বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। কারণ, দেশে থাকাকালে দুই দশক ধরে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতেন। প্রতিবছর পুরো শরীরের চেকআপ করলেও কখনো কোনো বড় ধরনের সমস্যা ধরা পড়েনি। কিন্তু ২০২৫ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর যে খবর পেলেন, তা যেন মুহূর্তেই ওলট–পালট করে দেয় তাঁর জীবন। ![]() ইবরার টিপু ও বিন্দুকণা যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ইবরার টিপু জানতে পারেন, তিনি কিডনি ক্যানসারে আক্রান্ত, আর তা অ্যাডভান্স পর্যায়ে আছে। খবরটি শুনে হতবাক হন টিপু। এমনকি দেশে করানো দীর্ঘদিনের বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিও তাঁর আস্থা কমে যায়। তত দিনে পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ, স্ত্রী বিন্দুকণা তখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বড় মেয়ে অর্নির বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। প্রবাসজীবনে সব কাজ নিজেদেরই সামলাতে হয়। তাই স্ত্রী ও সন্তানের কথা ভেবে প্রথম দিকে ক্যানসারের বিষয়টি গোপন রাখেন টিপু। কিন্তু একসময় তা আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। বিন্দুকণা জানান, ইবরার টিপুকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে একপর্যায়ে চিকিৎসক সরাসরি বলে দেন, তাঁর স্বামী কিডনির ক্যানসারে আক্রান্ত এবং রোগটি ছড়িয়ে গেছে। এমনকি চিকিৎসক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, কয়েক মাসের বেশি সময় বাঁচবে না। চিকিৎসকের কাছ এমন কথা শোনার পর তাঁর পুরো পৃথিবী ওলট–পালট হয়ে যায়। বললেন, ‘চিকিৎসক বললেন, রোগের যে অবস্থা, টিপুর বাঁচার সম্ভাবনা কম। কথাটা শোনার পর আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি। মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলাম।’ পরে বিন্দুকণার চিকিৎসকেরা তাঁকে জানান, এই পড়ে যাওয়ার কারণে গর্ভের সন্তানেরও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারত। এরপর শুরু হয় এক অনিশ্চিত যুদ্ধ। ![]() ক্যানসার আক্রান্তের পরে ও আগের ইবরার টিপু স্বামী ইবরার টিপু ক্যানসারে আক্রান্ত, স্কুলপড়ুয়া বড় মেয়ে, সঙ্গে অনাগত সন্তান—সব মিলিয়ে কীভাবে সামনে এগোবেন, কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না বিন্দুকণা। তিনি বলেন, সন্তান পেটে নিয়েই টিপুকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটেছি। কীভাবে চিকিৎসা করানো যায়, কার কাছে গেলে ভালো হবে—সেসব উপায় খুঁজেছি। পরে একজন চায়নিজ চিকিৎসকের সন্ধান পাই। তাঁর কাছ থেকে কিছুটা আশ্বাস পাই। তাঁর তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে। অবশেষে ২০২৫ সালের মার্চে সিদ্ধান্ত হয়, অস্ত্রোপচারের আগে ইবরার টিপুর কেমোথেরাপি শুরু হবে। ওই বছরের ২৬ মার্চ নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের কলম্বিয়া হাসপাতালে শুরু হয় তাঁর কেমোথেরাপি। টানা তিন দিন চিকিৎসা চলে। কিন্তু ভাগ্য যেন তখনো তাঁদের সহায় ছিল না। যে সময়ে টিপু কেমোথেরাপি নিচ্ছেন, একই সময়ই ফ্লাশিংয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি অন্তঃসত্ত্বা বিন্দুকণা। একদিকে ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন স্বামী, অন্যদিকে অনাগত সন্তানের অপেক্ষায় স্ত্রী। একই শহরের দুই হাসপাতালে চলছিল দুই ধরনের যুদ্ধ। বিন্দুকণা বলেন, এক হাসপাতালে টিপুর কেমোথেরাপি চলছে, অন্য হাসপাতালে আমি ভর্তি। সেই সময়টা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। তিন দিনের কেমোথেরাপি শেষে ইবরার টিপু বাসায় ফেরেন। একই দিন নবজাতক নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরেন বিন্দুকণাও। কিন্তু বাসায় ঢুকেই তিনি এমন এক দৃশ্য দেখেন, যা আজও ভুলতে পারেননি। ‘বাসায় এসে দেখি, টিপু সোফায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। কাউকে চিনতে পারছে না। তিন দিনের নবজাতককে নিয়ে আমি বাসায় ফিরেছি। বড় মেয়েটা নিজের মতো কিছু রান্না করার চেষ্টা করছে। এসব দেখে আমি দিশাহারা। দ্রুত ৯১১-এ ফোন দিই। পরে অ্যাম্বুলেন্স টিপুকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।’ বললেন বিন্দুকণা। কেমোথেরাপি শুরু হওয়ার সময় ইবরার টিপুর ওজন ছিল ৭৬ কেজি। কিন্তু চিকিৎসার ধকল তাঁকে ভীষণভাবে ভেঙে দেয়। হাসপাতালে টানা ১৮ দিন ভর্তি থাকার সময় তাঁর ওজন কমে যায় প্রায় ২৫ কেজি। নেমে আসে ৫১ কেজিতে। বিন্দুকণা জানান, ওই সময় পর্যন্ত সে আমাদের ছোট মেয়ের মুখও দেখেনি ইবরার। মাসখানেক পর প্রথমবারের মতো মেয়েকে কোলে নেয়। পাঁচ মাস ধরে চলে কেমোথেরাপি। এর পাশাপাশি দেওয়া হয় ইমিউনোথেরাপি। গত বছর থেকে প্রতি মাসে একটি করে ইমিউনোথেরাপি নিচ্ছেন টিপু। এ ছাড়া টার্গেটেড থেরাপি ও প্রোটন থেরাপিও নিতে হয়েছে তাঁকে। শুধু কেমোথেরাপিই নয়, অস্ত্রোপচারের কঠিন পথও পাড়ি দিতে হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইবরার টিপুর ১১ ঘণ্টা ধরে কিডনির ক্যানসারের জটিল অস্ত্রোপচার হয়। এর ঠিক এক মাস পর, ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে ফুসফুসের টিউমার অপসারণে সাত ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আরেকটি অস্ত্রোপচার করা হয়। এই পুরো সময় বিন্দুকণার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল একাকিত্ব। তিনি বলেন, নতুন একটা দেশ। আমি কাউকে সেভাবে চিনি না। যার ওপর ভরসা করে দেশটায় এসেছি, সেই মানুষটাই কঠিন রোগে আক্রান্ত। দুই সন্তান নিয়ে কী করব, কীভাবে সামলাব—কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শুধু আল্লাহকে বলতাম, আমাকে বাঁচিয়ে রেখো, যেন আমার মানুষটার পাশে থাকতে পারি। ইবরার টিপু ও বিন্দুকণা তাঁদের সন্তানদের নিয়ে নিউইয়র্কের কুইন্স ভিলেজে থাকেন। এ বছরের অক্টোবরে বড় মেয়ে অর্নির বয়স আট বছর হতে চলেছে। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যায় বিন্দুকণার সঙ্গে কথা বলার সময় গাড়ি চালাচ্ছিলেন ইবরার টিপু। বড় মেয়েকে স্কুলে রেখে স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। পরে একটি কফিশপে থেমে কথা বলেন। দুঃসহ দিনগুলোর কথা মনে করে ইবরার টিপু বলেন, ওপরে আল্লাহ আর পাশে বিন্দুকণা ছিল বলেই আজ কথা বলতে পারছি। চিকিৎসকদের আন্তরিকতার কথাও বলে শেষ করতে পারব না। জীবনের ওপর দিয়ে যে ঝড় গেছে, এখন ভাবলেও অবিশ্বাস্য লাগে তবে জীবনের কঠিন সময়ে কিছু মানুষের আচরণ ইবরার টিপু ও তাঁর পরিবারকে কষ্ট দিয়েছে। ইউএসএতে আমাদের পরিচিত অনেক মানুষ আছেন। সহযোগিতা তো দূরের কথা, কেউ একবারের জন্যও দেখতে আসেনি। বাংলাদেশ থেকে যেসব শিল্পীর সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, তারাও দেখা করেনি। এখন এসব নিয়ে আর ভাবি না।’ বললেন টিপু। কথা প্রসঙ্গে ইবরার টিপু বলেন, আমি শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন এই রোগ কাউকে না দেন। এটা কতটা কঠিন, সেটা কেবল আমরা জানি। একদিকে আমি হাসপাতালে কেমোথেরাপি নিচ্ছি, অন্যদিকে আরেক হাসপাতালে অন্তঃসত্ত্বা কণা ভর্তি। আমি চাইলেও তার পাশে থাকতে পারিনি। আবার বাসায় আমাদের ছোট্ট মেয়েটা একা ছিল। কীভাবে যে সময়টা কেটেছে, তা শুধু আল্লাহ জানেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর এখন সুস্থতার পথে ইবরার টিপু। বললেন, আলহামদুলিল্লাহ, আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি। ধীরে ধীরে ওজনও বাড়ছে। খেতে পারছি। বাসার স্টুডিওতে কাজ করি। গাড়ি চালিয়ে পরিবারকে নিয়ে ঘুরতে যাই। ![]() ইবরার টিপু ও বিন্দুকণা |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
