ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বুধবার ২৪ জুন ২০২৬ ১০ আষাঢ় ১৪৩৩
নদীতে মিলছে মরদেহ, আড়ালে অপরাধের কোন ছক?
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Wednesday, 24 June, 2026, 12:45 PM

নদীতে মিলছে মরদেহ, আড়ালে অপরাধের কোন ছক?

নদীতে মিলছে মরদেহ, আড়ালে অপরাধের কোন ছক?

রাতের অন্ধকারে কোথাও একজন মানুষকে হত্যা করা হয়। এরপর হাত-পা বেঁধে, কখনও কোমরে বস্তা বেঁধে, কখনও মুখ বিকৃত হয়ে যাওয়ার আগেই মরদেহ ছুড়ে ফেলা হয় নদীতে। কয়েক দিন পর সেটি ভেসে ওঠে অন্য কোথাও—কোনও খেয়াঘাটের পাশে, শাখা নদীর জলে, কখনও কচুরিপানার ভেতরে। দেশের নদীগুলোতে একের পর এক পরিচয়হীন, অর্ধগলিত ও ক্লুলেস মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে— এগুলো কি কেবল বিচ্ছিন্ন মৃত্যু, নাকি হত্যার প্রমাণ গোপন করার জন্য নদীকে ক্রমেই ‘নিরাপদ ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ হিসেবে ব্যবহার করছে অপরাধীরা?

শনিবার (২০ জুন) নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে মেঘনা নদীর একটি শাখা, স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘মরা গাং’ থেকে পা বাঁধা ও কোমরে বস্তা বাঁধা অবস্থায় এক অজ্ঞাত ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতের বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। পুলিশের ধারণা, ছয় থেকে সাত দিন আগে তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে ময়নাতদন্তের পর।

একই দিন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে নলজুর নদী থেকে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাত এক নারীর ভাসমান মরদেহ। তার মৃত্যুর কারণও এখনও স্পষ্ট নয়। এর আগে ২৯ মে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার ফুলদী নদী থেকে উদ্ধার করা হয় এক তরুণীর মরদেহ। পরে তদন্তে রহস্য উদ্‌ঘাটন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটি জানায়, ওই তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় চার জনকে গ্রেফতার করা হয়।

তিনটি ঘটনা আলাদা হলেও আলামত অনেকটাই অভিন্ন। নৌ-পুলিশ সদর দফতরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মাত্র তিন মাসেই দেশের বিভিন্ন নদী থেকে ১৪৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১২ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেলেও ৩৪ জনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি। শনাক্ত হওয়া ১১২ জনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৮টি হত্যা মামলা হয়েছে।

আরও উদ্বেগজনক চিত্র মিলেছে পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানে। নৌ-পুলিশের হিসাবে, গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে নারী ও শিশুসহ ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৩৩৫টি হত্যা মামলা এবং নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনায় ২৫টি মামলা হয়েছে। বাকি মৃত্যুগুলোর পেছনে ছিল নৌদুর্ঘটনা, গোসল করতে গিয়ে ডুবে যাওয়া, মাছ ধরতে গিয়ে দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণ।

তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো—উদ্ধার হওয়া মরদেহের বড় একটি অংশের পরিচয়ই জানা যায় না। পাঁচ বছরে উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে ১ হাজার ৪২৫ জনের পরিচয় শনাক্ত হলেও ৬৩৯ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে এসব মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।

কেন নদীই বেছে নিচ্ছে অপরাধীরা?

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নদীতে মরদেহ ফেলে দেওয়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য একটাই—প্রমাণ গোপন করা এবং তদন্তকে জটিল করে তোলা। নৌ-পুলিশ প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের ঘটনায় করা হত্যা মামলাগুলোর তদন্তে ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, পরকীয়া, মাদক কারবার এবং সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্বের মতো কারণ সামনে এসেছে। তার দাবি, এসব হত্যা মামলার প্রায় ৬৫ শতাংশের রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে পেরেছে নৌ-পুলিশ।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, হত্যাকারীরা সচেতনভাবেই নদীকে বেছে নেয়। কারণ, পানিতে দীর্ঘ সময় থাকলে মরদেহে পচন ধরে, আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যায়, মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে পড়ে। এতে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়, একইসঙ্গে হত্যার ধরন বা আলামতও অনেক ক্ষেত্রে মুছে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, অপরাধীরা জানে—মরদেহ শনাক্ত করা না গেলে সেটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সেই সুযোগ নিয়েই গভীর রাতে বাস, ট্রাক বা অন্য কোনও যানবাহনে করে মরদেহ এনে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তার মতে, নদীর পাড়, সেতু, ঘাট বা নির্জন ডাম্পিং পয়েন্টগুলোতে নজরদারি দুর্বল থাকায় অপরাধীরা সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে।

পারিবারিক বা ব্যক্তিগত বিরোধই নয়, আছে ক্ষমতার রাজনীতিও

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, নদী বা জলাশয়ে লাশ ফেলে দেওয়ার পেছনে শুধু পারিবারিক দ্বন্দ্ব নয়, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আধিপত্য বিস্তার এবং অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইও বড় কারণ।

তার ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া, হত্যার প্রমাণ মুছে ফেলা এবং নিজেদের সম্পৃক্ততা আড়াল করতেই লাশ নদী বা জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়। কখনও ভাড়াটে খুনি দিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে মরদেহ গোপন করতে নদীকে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে নদীসংলগ্ন নির্জন এলাকায় মানুষের চলাচল কম থাকায় খুনিরা এই পথকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত হয় না। আবার কোথাও হত্যা করে অন্য এলাকায় লাশ ফেলে দেওয়ার ঘটনাও আছে। ফলে একটি অপরাধ কোথায় সংঘটিত হলো, লাশ কোথা থেকে কোথায় এলো—এসব নির্ণয় করা আরও জটিল হয়ে পড়ে।

তদন্তে সবচেয়ে বড় বাধা হলো শনাক্তকরণ

নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্তে সবচেয়ে বড় বাধা হয় শনাক্তকরণ। নৌ-পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক সময় মরদেহ ভেসে ওঠার আগেই তাতে পচন ধরে যায়। আঙুলের ছাপ মুছে যায়, মুখ বিকৃত হয়, শরীরে আঘাতের চিহ্ন অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। কখনও কখনও শুধু কঙ্কাল উদ্ধার হয়। ফলে ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ বা হত্যার আলামত পাওয়া গেলেও, ভিকটিমের পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় তদন্ত এগোয় না।

এই জটিলতার ফলও স্পষ্ট। গত পাঁচ বছরে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে ১২১টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ৫৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, আর ১৩২টি হত্যা মামলা এখনও তদন্তাধীন। আরও ২৬টি মামলা তদন্ত করছে অন্য সংস্থা। অনেক ক্ষেত্রেই নদী শুধু মরদেহ লুকানোর জায়গা নয়, বরং তদন্তকে অচল করে দেওয়ার একটি কৌশল হয়ে উঠছে।

সমন্বিত নজরদারির ঘাটতি

অধ্যাপক রেজাউল করিমের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত বাড়ালেই হবে না, দরকার সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা। যেখানে পুলিশ, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড, স্থানীয় প্রশাসন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং অপরাধ বিশ্লেষণ— সব কিছু একসঙ্গে কাজ করবে।

তার মতে, কোন নদী বা এলাকায় বেশি মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে, কোন সেতু বা ঘাট বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কোন অঞ্চল থেকে মরদেহ এনে ফেলা হতে পারে, কত সময় আগে মরদেহ পানিতে ফেলা হয়েছে, কী ধরনের মানুষ বেশি টার্গেট হচ্ছে— এসব তথ্য পদ্ধতিগতভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ এসব লাশ আকাশ থেকে পড়ে না, কোথাও না কোথাও থেকে এনে ফেলা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীতে মরদেহ উদ্ধারের এই প্রবণতা ঠেকাতে এখন আর শুধু ঘটনা পরবর্তী প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট নয়, দরকার প্রতিরোধমূলক নজরদারি। তাদের মতে, যেসব ব্রিজ, ঘাট, নদীপাড় বা নির্জন পয়েন্ট দিয়ে বেশি মরদেহ ফেলা হচ্ছে— সেগুলো আলাদা করে চিহ্নিত করে ম্যাপিং করতে হবে। নদীসংলগ্ন সড়ক, সেতু, ফেরিঘাট, ট্রলারঘাট ও নির্জন নদীপাড়ে সিসিটিভি, নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং রাতের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

একইসঙ্গে পুলিশ, নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সমন্বয় জোরদার করতে হবে। শুধু মরদেহ উদ্ধারের পর নয়, সন্দেহজনক নৌযান, রাতের চলাচল, ব্রিজ পয়েন্টের গতিবিধি—সব কিছুর ওপর যৌথ নজরদারি প্রয়োজন। অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তে ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ডিএনএ, ডিজিটাল ডাটাবেজ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডারের সমন্বয়ও জরুরি।

এ ছাড়া অপরাধের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করতে হবে। কোন ধরনের বিরোধ—পারিবারিক, রাজনৈতিক, মাদক, সম্পত্তি বা গ্যাং-সংক্রান্ত, সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে, তা বিশ্লেষণ ছাড়া কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব নয়।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status