|
ফিরছিলেন বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে, পথে পুলিশ মুঠোফোন খুলে তল্লাশি করল, আইন কী বলে?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() ফিরছিলেন বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে, পথে পুলিশ মুঠোফোন খুলে তল্লাশি করল, আইন কী বলে? সেই সময় পুলিশের একজন উপপরিদর্শক (এসআই) আবিরকে জিজ্ঞেস করেন, এত রাতে কোথা থেকে ফিরছেন? আবির আমন্ত্রণপত্র দেখিয়ে জানান, বিয়ের অনুষ্ঠানে ধানমন্ডিতে গিয়েছিলেন। এরপরও ওই এসআই আবিরের দেহ তল্লাশি করেন। এরপর আবিরের মুঠোফোন তল্লাশি করতে চান। এতে আপত্তি জানান আবির; তৎক্ষণাৎ বলেন, ফোনে আমার ব্যক্তিগত জিনিস থাকতে পারে। আপনাকে কেন দেব? জবাবে ওই এসআই জানান, নিরাপত্তার কারণে তিনি মুঠোফোন পরীক্ষা করে দেখবেন। সাম্প্রতিক সময়ে মাঝরাতে নিষিদ্ধ দলের লোকজন মিছিল করছে। তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ রয়েছে, মুঠোফোন তল্লাশি করতে হবে। আইনজীবী আবিরের সঙ্গে গত শনিবার (৬ জুন) এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তখন তিনি তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি সবিস্তার জানান। আরও বলেন, তিনি একা নন, চট্টগ্রামে তাঁর ফুফাতো ভাইও একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। চলতি পথে তাঁরও দেহ ও মুঠোফোন তল্লাশি করেছে পুলিশ। কিছুদিন ধরে বিভিন্ন মানুষের কাছে এমন তল্লাশির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশকিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তল্লাশির সময় মুঠোফোনে থাকা ব্যবহারকারীর ছবির গ্যালারি, হোয়াটসঅ্যাপের বার্তা, এমনকি ফেসবুকের পোস্টের মতো একান্ত ব্যক্তিগত জিনিস দেখছে পুলিশ। মুঠোফোনের পাশপাশি পুলিশের টহল দল দেহ ও গাড়ি তল্লাশি করছেন। অনেক সময় তল্লাশি চলাকালে মোজো (মোবাইল জার্নালিজম) সাংবাদিকদের উপস্থিতি থাকছে। তাঁরা ভিডিও করছেন। পরে সেসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সমালোচনা হচ্ছে, পুলিশ এভাবে যেকোনো ব্যক্তিকে তল্লাশি করতে পারে কি না। বিশেষ করে মুঠোফোন তল্লাশির মাধ্যমে পুলিশ সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করছে কি না? ক্যামেরার সামনে তল্লাশি, ভিডিও ফেসবুকে ফেসবুকে গত সপ্তাহে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ঘটনাটি রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের। মধ্যরাতে ক্যামেরার সামনে দুজনকে তল্লাশি করছিলেন পুলিশের এক কর্মকর্তা। তিনি প্রথমে একজনের মুঠোফোনে হোয়াটসঅ্যাপের বার্তা পরীক্ষা করেন। সেই মুঠোফোন হাতে নিয়েই আরেকজনের মুঠোফোন চেয়ে নেন। ওই ব্যক্তি পুলিশের কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেন, একটু কথা বলি। পুলিশ কর্মকর্তা সেই অনুরোধ উপেক্ষা করেন। মুঠোফোনে ওই ব্যক্তির ফেসবুক প্রোফাইলে ঢুকে বিভিন্ন সময় করা পোস্ট দেখতে শুরু করেন। দুজনের সঙ্গে এর মধ্যে কথাও বলছিলেন তিনি। হঠাৎ ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, দুজনেরই একই ইয়ে ফোন দিতেছে। সমস্যা তো আছে আপনাদের। তখন যাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে ছবি দেখা হচ্ছিল, তিনি বলে ওঠেন, না স্যার, আমি তো . (প্রতিষ্ঠানের নাম) চাকরি করি। তিনি আরও বলেন, স্যার, দেখেন আমাদের পিকনিকের ছবি। এ সময় ক্যামেরার পেছন থেকে কেউ একজন বলেন, ছাত্রদল করে। পরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন ব্যক্তিকে দেখিয়ে দেওয়া হয়। তখন পুলিশের ওই কর্মকর্তা তাঁর এক সহকর্মীকে ওই ব্যক্তিকে তল্লাশির জন্য ধরে আনার নির্দেশ দেন। মুঠোফোনে ফেসবুক, ফটো গ্যালারি তল্লাশি নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে আইনজীবী আবির বলেন, ‘মুঠোফোন নিয়ে আমার ফেসবুক খুলে দেখাতে বলেছিলেন ওই এসআই। তবে বেশ কিছুদিন ধরে আমার ফেসবুক আইডি নিষ্ক্রিয় রয়েছে। এটা জানার পর ওই এসআই আমাকে বলেন, “আপনার নিজের হাতে ফোনের ফটো গ্যালারি খুলে দেখান। আপনি নিষিদ্ধ দলের সঙ্গে যুক্ত কি না, দেখব। এভাবে বিনা পরোয়ানায় দেহ ও মুঠোফোন তল্লাশির মাধ্যমে পুলিশ নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘন করছে, বলেন এই আইনজীবী। আবির আরও বলেন, একজন নাগরিকের নিজের সুরক্ষা নিশ্চিতের বিষয় আছে। তল্লাশির নামে পকেটে কিংবা ব্যাগে অবৈধ কিছু পুলিশ দিয়ে না দেয়, সেটার দিকেও সতর্ক থাকতে হবে। আবির জানান, তল্লাশির পুরো ঘটনাটি তিনি মুঠোফোনে ভিডিও করতে চেয়েছিলেন। সেটা পুলিশের ওই এসআইকে বলেছিলেনও। কিন্তু পুলিশ তাঁকে ভিডিও করতে দেয়নি। এই আইনজীবী আরও বলেন, তাঁর ফুফাতো ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। থাকেন পাশের জোবরা গ্রামের একটি বাসায়। সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় দুই বন্ধুসহ ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফেরার পথে পুলিশ পথ আটকে তাঁদের দেহ তল্লাশি করে। মুঠোফোনেও তল্লাশি করা হয়। ক্যামেরার সামনে গাড়ি তল্লাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাসখানেক ধরে ভাইরাল এক ভিডিওতে দেখা গেছে, বাংলামোটরে এক ব্যক্তির গাড়ি মোবাইল সাংবাদিকদের (মোজো) ক্যামেরার সামনে তল্লাশি করা হচ্ছে। গাড়িতে থাকা ব্যাগ খুলে ওই ব্যক্তি পুলিশকে দেখাচ্ছিলেন। এ ছাড়া ক্যামেরার সামনে বায়তুল মোকাররমের সামনে এক যুবকের ব্যাগ খুলে তল্লাশির ঘটনাও রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ক্যামেরা হাতে থাকা ব্যক্তি ব্যাগ তল্লাশির বিষয়গুলো বর্ণনা করছিলেন। একজন পিকআপ ভ্যানের চালককে মামলা দেওয়া হয় মোজোর সামনে। আবার কোনো গাড়ি নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি গতিতে চললে তাদের জরিমানাও করতে দেখা গেছে ক্যামেরার সামনে। পূর্বাচলে জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে তে মোজোদের সামনে গাড়ি আটকে জরিমানা ও তল্লাশির ঘটনা হরহামেশা ঘটছে বলে ভুক্তভোগীরা জানান। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি গাড়ির মালিককে জরিমানা করার সময় তিনি বলছিলেন, পুলিশের বড় কর্মকর্তা তাঁর ছোট ভাই, তিনি কথা বলিয়ে দেবেন কি না। পুলিশ কর্মকর্তা তখন হাসিমুখে বলে যাচ্ছিলেন, ছোট একটা বিষয়ের জন্য কেন কথা বলাবেন, প্লিজ স্যার, সরি স্যার। শেষ পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য এক তরুণের গাড়ি থামিয়ে তাঁর কাগজপত্র পরীক্ষা করার সময় একপর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, টোটাল গাড়ি সার্চ করে দেখো, বিয়ার-টিয়ার আছে কি না। ক্যামেরার সামনেই চলছিল সব কথোপকথন। চলতি পথে নাগরিকদের দেহ, মুঠোফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা-পোস্ট পুলিশের তল্লাশি করে দেখাটা দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, মুঠোফোনের মাধ্যমে মানুষের নিত্যদিনের যোগাযোগ ঘটে। তথ্য সংরক্ষণ ও নানান ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য থাকে মুঠোফোনে। ফলে মুঠোফোন তল্লাশির নামে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অনুমোদন নেই সংবিধান ও প্রচলিত আইনে। রেজাউল করিম আরও বলেন, সংবিধানের ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না। ৪৩ ধারায় বলা হয়েছে, চিঠিপত্রের ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার থাকবে ব্যক্তির। এ ছাড়া জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ১২ ধারায় মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আর মযার্দার অধিকার সুরক্ষিত রাখার কথাও বলা হয়েছে। তল্লাশির কিছু নিয়ম থাকা উচিত। দেখা যাচ্ছে, ক্যামেরার সামনে তল্লাশি করা হচ্ছে। সেসব তল্লাশির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। একজন ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তাঁর ভিডিও ছড়িয়ে ব্যক্তিগত অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে, বলেন শিক্ষক রেজাউল করিম। তল্লাশির নামে লোকজনকে যানবাহন থেকে নামিয়ে তাঁদের মুঠোফোনের ছবি, মেসেজ ঘাঁটছে পুলিশ। গত বুধবার দুপুরে গাজীপুরের টঙ্গী সেতুর সামনে অপরাধ বিজ্ঞানের এই শিক্ষক আরও বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৪ ধারায় বলা হয়েছে, তদন্ত, অনুসন্ধান, বিচার বা অন্যান্য কারণে কোনো দলিল বা জিনিস নেওয়া প্রয়োজন মনে করলে তা আনতে পুলিশকে সমন নিয়ে যেতে হবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৫ ধারায় পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশির ক্ষমতা দেওয়া হলেও তার সুনির্দিষ্ট কারণ থাকতে এবং দ্রুত ম্যাজিস্ট্রেটকে তার কারণ জানাতে হবে। সাইবার সুরক্ষা আইনের ৩৪ ধারাতেও তল্লাশি চালাতে গেলে সুনির্দিষ্ট কারণ ট্রাইব্যুনালকে জানানোর কথা বলা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ২১ ধারায় বলা আছে, যদি কোনো ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এমন বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে যেকোনো প্রকাশ্য স্থানে অথবা চলাচলকারী যানবাহনে মাদকদ্রব্য অথবা বাজেয়াপ্ত বস্তু কিংবা কোনো অপরাধ প্রমাণের সহায়ক কোনো দলিল রয়েছে, তাহলে তিনি তা তল্লাশি করতে পারবেন। কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে আইনের অপব্যবহার হচ্ছে বলে মত প্রকাশ করেন রেজাউল করিম। কয়েকটি ধারা সংশোধনের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ থাকতে হবে যে ওই ব্যক্তি অপরাধ করেছেন—প্রচলিত আইনে এটার আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা উচিত। এ ছাড়া গাড়ি, দেহ, মুঠোফোন বা অন্য কিছু তল্লাশির ক্ষেত্রে আইনে ‘তল্লাশি’ শব্দটির ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের তল্লাশি, সেটাও আলাদাভাবে উল্লেখ থাকা উচিত। পুলিশ যা বলছে দেশজুড়ে গত ১ মে থেকে মাদকসেবী, মাদক ব্যবসায়ী, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী ধরতে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলছে। তবে অভিযানে এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি, কারও মুঠোফোন তল্লাশি করে ফেসবুক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ দেখতে হবে, জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন। পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মুঠোফোনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখার বিধান আছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোনো নাগরিকের মুঠোফোন পরীক্ষা করার প্রমাণ পেলে, ওই পুলিশের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি মানুষের মুঠোফোন তল্লাশি করছে পুলিশ। ছবিটি গতকাল শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে উত্তরার কামারপাড়া মোড় থেকে তোলা গাড়ি তল্লাশির বিষয়ে শাহাদাত হোসাইন বলেন, পুলিশের বডি ওর্ন ক্যামেরা (পোশাকে আটকে রাখা ছোট ক্যামেরা) থাকে। অভিযোগ প্রমাণের জন্য এই ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সেসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশ দেয় না। যেসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, তা ইউটিউবাররা করে ছেড়ে দেন। এটা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন বলে স্বীকার করেন শাহাদাত হোসাইন। তবে তিনি বলেন, পুলিশ এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সামাজিক সচেতনতা ছাড়া এটা রোধ করা সম্ভব নয়।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
