ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বুধবার ২২ এপ্রিল ২০২৬ ৯ বৈশাখ ১৪৩৩
ইলিশ ছোট হওয়ার নেপথ্যের কারণ কী
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Wednesday, 22 April, 2026, 10:35 AM

ইলিশ ছোট হওয়ার নেপথ্যের কারণ কী

ইলিশ ছোট হওয়ার নেপথ্যের কারণ কী

দেশে এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে ইলিশ আহরণ বাড়ার পর হঠাৎ ধস নেমেছে। গত দুই বছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন। সেই সঙ্গে দেশে ধরা পড়া ইলিশের আকার আগের চেয়ে আরও ছোট হয়েছে। মৎস্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইলিশের আকার ছোট হওয়ার পেছনে কোনো বাস্তুতান্ত্রিক পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব তাঁরা দেখছেন না। তাঁদের মতে, নিয়ন্ত্রণহীন ইলিশ আহরণ এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট হওয়াই সমস্যার মূল কারণ।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় ইলিশ ডিম ছাড়ার পর মার্চ-এপ্রিলে জাটকা ঝাঁকে ঝাঁকে সাগরের দিকে যেতে থাকে। এ সময় নদ-নদীতে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে এবং উপকূলীয় সাগরে আর্টিসানাল ট্রলারের (যেগুলো ৪০ মিটারের কম গভীরতায় মাছ ধরে) মাধ্যমে ব্যাপক হারে জাটকা নিধন করা হয়। এতে ইলিশ পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় না। পাশাপাশি দখল–দূষণের ফলে নদীর বাস্তুতন্ত্র নষ্ট এবং নাব্যতা সংকটের কারণেও ইলিশ ঠিকমতো বড় হচ্ছে না।

এ পরিস্থিতি নিয়ে জেলে, ব্যবসায়ী ও মৎস্যবিশেষজ্ঞরা ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, এখনই কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা না নেওয়া হলে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আহরণ কমছে, ধরা পড়ছে ছোট ইলিশ

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ কমেছিল ৪২ হাজার টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরিত হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার টন, যা পরের বছর কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে; আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও ২৯ হাজার টন কমে নেমে আসে ৫ লাখ টনে। ফলে দুই বছরের ব্যবধানে দেশে ইলিশের আহরণ কমেছে মোট ৭১ হাজার টন, যা অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন মৎস্যবিজ্ঞানীরা।

মৎস্য অধিদপ্তর ‘ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, সাত বছর আগে বাংলাদেশের ইলিশের ওজন ছিল ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ গ্রাম, যা এখন ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ গ্রামে নেমে এসেছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে ধরা পড়া ইলিশের গড় আকৃতি ছিল ১৪ দশমিক ৬৫ ইঞ্চি। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমেছে ১৩ দশমিক ৩৯ ইঞ্চিতে।
ইলিশ এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দ্রুত বড় হয়। একটি জাটকা এক বছর বাঁচলে সেটির আকৃতি ১১ দশমিক ৮১ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। একটি ইলিশ পাঁচ থেকে সাত বছর বেঁচে থাকলে ২২ দশমিক ৬৮ ইঞ্চি পর্যন্ত বড় হতে পারে।


ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে বলে মনে করেন মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান। তাঁর মতে, নদীতে পলি জমা, নাব্যতা–সংকট ও চর-ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি বৃষ্টির অনিয়ম, নদীর পানি দূষিত হওয়া—সব মিলিয়ে প্রজনন ও বেড়ে ওঠার পরিবেশ আগের মতো নেই।

অনিয়ন্ত্রিত ইলিশ আহরণ

প্রায় এক দশক ধরে দেশে ইলিশ আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছিল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ডফিশ’-এর ‘ইকোফিশ-অ্যাকটিভিটি’ প্রকল্পের যুক্ততাকে এ সাফল্যের পেছনের কারণ বলে মনে করছেন অনেকে। প্রকল্পের আওতায় বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও সুসংগঠিত কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়। এ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে নেতৃত্ব দেন প্রকল্পের দলনেতা ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. আবদুল ওহাব।

বর্তমানে বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক মৎস্যবিজ্ঞান ও মৎস্য চাষ বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল ওহাব ইলিশের সংকট প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, ইলিশের আহরণ কমে যাওয়ার পেছনে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ আহরণই বড় কারণ হতে পারে। তাঁর মতে, জাটকানিধন ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে এ সংকট আরও গভীর হতে পারে।


মৎস্যবিজ্ঞানীদের এই বক্তব্যের প্রতিফলন পাওয়া যায় উপকূলের জেলেদের অভিজ্ঞতায়ও। বঙ্গোপসাগর–তীরবর্তী বরগুনার তালতলী উপজেলার জেলে দুলাল হোসেন প্রায় ৩০ বছর ধরে সাগর ও নদীতে মাছ ধরছেন। তাঁর ভাষায়, ইলিশের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পরই ছাঁকনির মতো সূক্ষ্ম জাল দিয়ে সেগুলো ধরে ফেলা হয়।
দুলাল হোসেন বলেন, জাটকানিধন মূলত তিন ধাপে ঘটে। প্রথম ধাপে একেবারে ছোট বাচ্চা, যা স্থানীয়ভাবে ‘চাপিলা মাছ’ নামে বাজারে বিক্রি হয়, সেগুলো ধরা পড়ে। এ পর্যায় থেকে যেসব বাচ্চা রক্ষা পায়, সেগুলো পরে তুলনামূলক বড় ফাঁসের কারেন্ট জালে নির্বিচার ধরা হয়। এর পরও যেসব জাটকা বেঁচে সাগরের দিকে যেতে পারে, সেগুলোকে বড় ট্রলিং ট্রলার এবং কাঠের রূপান্তরিত ট্রলিং ট্রলারে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা হয়। এতে ইলিশ পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগই পাচ্ছে না।

চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা ছাড়াও নোয়াখালীর হাতিয়া, ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চল থেকে জেলেরা ছোট ইলিশ ধরে আনছেন। ২০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের মাছই বেশি

মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, ২৮ হাজার আর্টিসানাল ট্রলার (যেগুলো ৪০ মিটারের কম গভীরতায় মাছ ধরে) ও ২৬৮টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলার (৪০ মিটারের বেশি গভীরতায় যে ট্রলার মাছ ধরে) সমুদ্রে মাছ ধরে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারগুলো যখন গভীর সমুদ্রে মাছ পায় না, তখন সেগুলো ৪০ মিটার গভীরে থাকা জাটকা ইলিশ ধরে। অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ করা যায়নি।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই বছর ধরে বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম উপকূলে সমুদ্রগামী কাঠের কয়েক হাজার ট্রলারকে স্থানীয় প্রযুক্তিতে ‘ট্রলিং ট্রলারে’ রূপান্তর করা হয়েছে। এসব ট্রলারে ছোট ফাঁসের নিষিদ্ধ বেহুন্দি জাল ব্যবহার করে অগভীর সমুদ্রে নির্বিচার মাছ ধরা হচ্ছে, যা ইতিমধ্যে মৎস্যসম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আগের পরিবেশ আর নেই

মৎস্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুকূল প্রতিবেশব্যবস্থা না থাকলে মাছের আহরণ কমে যেতে পারে। যা মাছের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ইলিশের খাদ্যতালিকায় ২৭ প্রজাতির উদ্ভিদকণা (জুপ্ল্যাংকটন) ও ১২ প্রজাতির প্রাণিকণা (ফাইটোপ্ল্যাংটন) রয়েছে। এসব প্ল্যাংকটনের পরিমাণ মেঘনা নদীতে ৬৮ শতাংশ কমেছে। এর বড় কারণ নদীদূষণ।

গবেষণাটি করেছেন ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় ইলিশের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য প্ল্যাংকটন আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে, যার প্রভাব পড়ছে ইলিশের আকৃতিতেও।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগর থেকে মেঘনার মোহনা দিয়ে ইলিশের প্রবেশমুখগুলোতে ডুবোচরের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ইলিশ আসার পথ আটকে যাওয়ায় নদীতে আগের চেয়ে কম ইলিশ ধরা পড়ছে। বিশেষ করে বড় ইলিশগুলো উপকূলের কাছাকাছি ও নদীতে আসা কমিয়ে দিয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, নদ-নদীতে নাব্যতা–সংকটের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে অনেক মাছ সাগরে যেতে না পেরে পূর্ণ আকারে বেড়ে উঠতে পারছে না। গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সাড়ে ৬ ইঞ্চি আকারের ইলিশের ওজন প্রায় ৫০ গ্রাম; অথচ এই ছোট মাছের মধ্যেই ডিম তৈরি হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে সাগরে যেতে পারলে এগুলো আরও বড় হতে পারত।

মোল্লা এমদাদুল্যাহ জানান, ২০২০ সাল পর্যন্ত গভীর সমুদ্র থেকে বড় ইলিশ বেশি আহরণ করা হয়েছে। এখন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারগুলো অগভীর সাগরে এসে ছোট ফাঁসের জাল দিয়ে ছোট মাছ ধরছে।

করণীয় কী

ইলিশসহ দেশের প্রাকৃতিক উৎসের মাছের প্রজনন, বেড়ে ওঠা ও সুরক্ষায় করণীয় কী—এসব বিষয়ে মৎস্যবিজ্ঞানীরা বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।

বঙ্গোপসাগর পৃথিবীর অন্যতম উর্বর সামুদ্রিক অঞ্চল। যেখানে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার পুষ্টিসমৃদ্ধ জলের ধারা মিশেছে। এমন পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে মাছের প্রাচুর্য কমে যাওয়ার কথা নয় বলে মনে করেন মৎস্যবিজ্ঞানী আবদুল ওহাব। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণের বিষখালী, পায়রা ও বলেশ্বর নদ-নদী ঘিরে আমরা একটি নতুন অভয়াশ্রমের প্রস্তাব মৎস্য মন্ত্রণালয়ে দিয়েছিলাম। সেটি বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই তিন নদীর মোহনায় চর অপসারণ ও দেশের কোন নদীতে কী পরিমাণ দূষণ হচ্ছে, তার মাত্রা পরীক্ষা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

শুধু আইন বা ভয় দেখিয়ে জাটকা ধরা বন্ধ করা অসম্ভব উল্লেখ করে আবদুল ওহাব আরও বলেন, এ জন্য প্রয়োজন জেলেদের এই কাজে আন্তরিকভাবে সম্পৃক্ত করা। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার সময়ে যাতে জেলেরা আর্থিকভাবে দুর্দশায় না পড়েন, সে জন্য তাঁদের বিকল্প জীবিকা নিশ্চিতের পাশাপাশি ঋণের কিস্তি যাতে না দিতে হয়, সেই ব্যবস্থা করা।

ইকো ফিশের উদ্যোগে তাঁরা দেশের ৪২০ কিলোমিটার অভয়াশ্রমের জিওগ্রাফিক সার্ভে করেছিলেন উল্লেখ করে অধ্যাপক আবদুল ওহাব বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দিয়ে আমাদের পুরো নদীব্যবস্থার একটি বড় সার্ভে করা প্রয়োজন। দেখা প্রয়োজন কোথায় ডুবোচর আছে, কোথায় নাব্যতা–সংকট আছে, কোথায় দূষণের অবস্থা কেমন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারলে খুবই ভালো কাজ দিতে পারে।’ জাতীয় মাছ ইলিশের বায়োলজি ও কৌলিতত্ত্ব (জেনেটিকস) বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা করা দরকার বলে মনে করেন এই মৎস্যবিজ্ঞানী।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status