ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শুক্রবার ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ৪ বৈশাখ ১৪৩৩
অ্যাসিডের হিংস্রতা দমাতে পারেনি রত্না মণ্ডলকে
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Thursday, 16 April, 2026, 12:38 PM
সর্বশেষ আপডেট: Thursday, 16 April, 2026, 12:51 PM

অ্যাসিডের হিংস্রতা দমাতে পারেনি রত্না মণ্ডলকে

অ্যাসিডের হিংস্রতা দমাতে পারেনি রত্না মণ্ডলকে

১৫ বছর বয়সে অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হন রত্না মণ্ডল। সাহসের সঙ্গে নিজের জীবন পুনর্নির্মাণ করেন। এখন তার মতো সংগ্রাম করতে থাকা নারীদের জন্য লড়াই করছেন রত্না মণ্ডল।

নিজের জীবনকে বদলে দেওয়া সেই রাতের কথা এখনও মনে আছে রত্না মণ্ডলের। দুই দশকেরও বেশি সময় কেটে গেছে, তবুও তার ঘাড়ের ক্ষতগুলো মাঝেমধ্যে তাজা মনে হয়, এমনভাবে জ্বালা করে যেন গতকালই অ্যাসিড ছুঁড়ে মারা হয়েছিল। রত্না এই ক্ষতগুলো নিয়ে বাঁচতে শিখেছে, কিন্তু ক্ষতগুলোর কথা কখনও ভুলতে পারেনি। তিনি বলেন, 'আমার ক্ষতগুলো আমাকে ব্যথার নয়, বেঁচে থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এগুলো আমাকে মনে করিয়ে দেয় কেন আমি লড়াই করি।'

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা ঝিনাইদহের একটি শান্ত গ্রামে রত্না বেড়ে ওঠেন। আত্মীয়স্বজন, ভাই-বোন নিয়ে যৌথ হিন্দু পরিবার ছিল রত্নাদের। রত্না ছিলেন তিন ভাই-বোনের মধ্যে বড়, আদর, ভালোবাসা ও নিরাপদে বেড়ে ওঠছিলেন। মেয়ে হওয়ার কারণে তার বাবা-মা কখনও তাঁর সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করতেন না। তিনি বিভিন্ন কাজ করতেন, দায়িত্ব পালন করতেন এবং সংসার চালাতেও সাহায্য করতেন। আটপৌরে জীবন হলেও রত্না ছিলেন সন্তুষ্ট।

স্কুলে পড়ার সময়ই রত্নার সেই সুখ ভেঙে যায়। তার বাবা ছিলেন গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। এক শীতের রাতে দীর্ঘদিনের জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে অন্ধকারে রত্নার বাবার ওপর আক্রমণ হয়। 


এই আক্রমণের ফলে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং স্থায়ীভাবে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। রাতারাতি পরিবারের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। আর্থিক অনিশ্চয়তায় পরে যায় এবং পরিবারটি আত্মীয়স্বজনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যারা রত্নাদের আর্থিক দুরাবস্থার কথা মনে করিয়ে দিত।

রত্নাদের জন্য অপমান নিয়মিত ব্যাপার ছিল। কিশোরী রত্না তখনো পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু বাড়ির ভেতরের দুশ্চিন্তা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছিল। তারপর এল ১৯৯৯ সাল।

ওই বছরই তার দাদু মারা যান। আত্মীয়স্বজনরা শেষকৃত্য করতে তাদের বাড়িতে আসেন। ঘর ভর্তি মানুষ থাকায় রত্না বাইরের বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়ে। তার বয়স ছিল ১৫। মধ্যরাতের কিছু পরে অসহ্য যন্ত্রণায় তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। রত্নার ঘাড় এবং মুখ ঝলসে গিয়েছিল। অ্যাসিড ও পোড়া মাংসের গন্ধে বাতাসে ভরে গেল। সে চিৎকার করে উঠল, কিন্তু কেউ কিছুই করতে পারল না। পানি ঢালায় ব্যথা আরও বেড়ে গেল। কী ঘটেছে তা বোঝার আগেই রত্না অজ্ঞান হয়ে যায়। 

রত্নাকে ঝিনাইদহের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি ছয় মাস ব্যান্ডেজ জড়িয়ে কাটিয়েছিলেন, এমন চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, যা একজন কিশোরীর পক্ষে সহ্য করা কঠিন। যখন তিনি বাড়ি ফিরে আসেন, তখন তিনি সত্যটি জানতে পারেন। তাঁর বাবার জীবন ধ্বংস করে দেওয়া একই বিরোধের অংশ হিসেবে তার ওপর আক্রমণ করা হয়েছিল। 

কিন্তু নিষ্ঠুরতা সেখানেই শেষ হয়নি। গ্রামে গুঞ্জন ছড়িয়ে অ্যাসিড হামলার ঘটনাটিকে অন্য কিছুতে রূপান্তর করা হয়। গুজব ছড়িয়ে পড়ে রত্না একটি গোপন প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তিনি একজন পুরুষকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই আক্রমণটি সেই প্রতিশোধের জন্য করা হয়েছিল। অনেক মানুষের মনে অ্যাসিড আক্রমণকে 'প্রেমের সম্পর্কের করুণ পরিণতি' হিসেবে মেলানো হয়েছিল এবং গ্রামবাসীরা এটি বিশ্বাস করেছিল। রত্না এটিকে তার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি হিসেবে বর্ণনা করেন।

রত্না বলেন, তারা আমাকে আক্রমণ করেছে এটাই যথেষ্ট ছিল না। তারা আমার চরিত্রও কেড়ে নিয়েছে। আমার বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর। আমি ভালোবাসা বা সম্পর্ক কী তাও বুঝতে পারিনি।
লজ্জিত হয়ে সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। ভারতে চিকিৎসার খরচ বহন করার পর তার পরিবার আর্থিকভাবে সমস্যায় পড়ে। আত্মীয়স্বজনরা তাদের বোঝা মনে করত। দিনগুলো কষ্টে কাটছিল, ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হচ্ছিল।

এর মধ্যেই আশার একটা ছোট জানালা খুলে যায়। অ্যাসিড আক্রমণে আহতদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করা একটি জাতীয় সংবাদপত্র তাকে খুঁজে পায় এবং তার বাড়ির কাছে একটি ছোট মুদির দোকান স্থাপনে সহায়তা করে। এটি খুব সাধারণ ব্যবসা ছিল, কিন্তু রত্নার কাছে এর মানে ছিল আরও বড় কিছু স্বাধীনতা। সে অর্থ উপার্জন করতে শুরু করে এবং তার পরিবারের জন্য অবদান রাখতে শুরু করে।

রত্নার শিক্ষক ও বন্ধুরা তাকে আবারও স্কুলে যেতে অনুরোধ করে। রত্না প্রথমে তা প্রত্যাখ্যান করেছিল, এই ভেবে যে লোকেরা তার ক্ষতচিহ্নের দিকে তাকিয়ে থাকবে। তার শিক্ষকেরা বললেন, তুমি এর চেয়েও শক্তিশালী। এই কথাগুলো রত্নাকে তার জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল।

রত্না পুনরায় স্কুলে ফিরে গেল। সকালে দোকানে কাজ করত আর বিকেলে পড়াশোনা করত। ধীরে ধীরে, সে তার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল। স্কুল জীবন শেষে রত্না নিজের ও ভাইবোনদের উচ্চশিক্ষার জন্য পরিবারকে ঝিনাইদহ শহরে চলে যায়। 

সে কলেজে ভর্তি হয়, ছাত্রদের টিউশন করার চাকরি নেয় এবং নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যায়। অবশেষে সে তার স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি উভয়ই সম্পন্ন করে, যা একসময় অসম্ভব বলে মনে হত। সেই বছরগুলোতে অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন তার চিকিৎসা এবং থেরাপিতে সহায়তা করেছিল, যা তাঁর পরিবারের বোঝা অনেকটা লাঘব করেছিল। 

২০১৮ সালে রত্নার জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। তিনি ব্র্যাকের মানবাধিকার ও আইনগত সহায়তা পরিষেবা (এইচআরএলএস) প্রোগ্রামে যোগ দেন। তিনি আর কেবল একজন অ্যাসিডদগ্ধ নন, এখন একজন আইনজীবীও।

বর্তমানে রত্না খুলনার এইচআরএলএসের কর্মকর্তা হিসেবে পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ, অ্যাসিড আক্রমণ, যৌন হয়রানির মতো ঘটনার শিকার নারীদের নারীদের সহায়তা করছেন। তিনি ভুক্তভোগীদের আইনি প্রক্রিয়ায় দিকনির্দেশনা দেন, তাদের সহায়তা পেতে পাশে থাকেন এবং  সমাজ যাদের চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে তাদের পাশে দাঁড়ান।

রত্না বলেন, 'অনেক নারী ভেঙে পড়েন। তারা মনে করে সহিংসতা তাদের প্রাপ্য। তারা মনে করে কেউ তাদের পাশে দাঁড়াবে না। আমি তাদের বলি তোমরা একা না। তোমাদের সঙ্গে যা ঘটেছে তা তোমাদের দোষে নয়।'

রত্নার নিজের যাত্রা বেঁচে থাকাদের শক্তি দেয়। যখন তারা রত্নার ক্ষত দেখে, তারা প্রমাণ পায় যে সহিংসতার পরেও বেঁচে থাকা সম্ভব। রত্না নিজের পরিবারের জন্য যা করতে পেরেছেন তাতে সে গর্বিত। সে তার ভাইবোনদের উচ্চশিক্ষার্থে সাহায্য করেছে, তারা দুজনই এখন নিজেদের ক্যারিয়ার গড়েছে। একসময় ভেঙে পড়া রত্নার পরিবার এখন আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

রত্না বলেন, 'মানুষ আমাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল। তারা আমার ত্বকে দাগ রেখে গেছে, কিন্তু আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় নয়।' এমন কিছু মুহূর্ত ছিল যখন যন্ত্রণা রত্নাকে শেষ সীমানায় ঠেলে দিয়েছিল, যখন বেঁচে থাকার চেয়ে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়া সহজ মনে হয়েছিল। কিন্তু সে সাহস খুঁজে পেয়েছিল। সে এগিয়ে যেতে থাকে। আর এখন সে লড়াই করে যাতে অন্য নারীরা আশা না হারায়। 

রত্না বলেন, 'আমার মতো নারীদের হাল ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। আমরা পরিবর্তন আনতে পারি। আমাদের কষ্টই আমাদের গল্পের শেষ নয়। আমরা নতুন করে গল্প লিখতে পারি।' রত্নার স্বপ্ন খুবই সহজ। এমন একটি পৃথিবী যেখানে কোনো মেয়েই রত্নার মতো কষ্টের শিকার হবে না। এমন একটি পৃথিবী যেখানে অ্যাসিড দগ্ধ ব্যক্তিদের বিশ্বাস করবে, সমর্থন জানাবে এবং মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করবে। 

আদালত কক্ষ, থানা, জনাকীর্ণ বাড়ি যেখানে তর্ক-বিতর্ক হিংসাত্মক হয়ে ওঠে সেখানেই ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়িয়ে যান রত্না। তিনি শোনেন, পরামর্শ দেন, পথ দেখান এবং লড়াই করেন, কারণ রত্না জানেন কেউ পাশে না থাকলে কেমন লাগে।

রত্নার ক্ষতগুলোর মতো তার মানসিক শক্তিও স্থায়ী। রত্না বলেন, 'আমি ১৫ বছর বয়সে অ্যাসিড আক্রমণ থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম। এখন আমার বয়স ৩৭। আমি এখনও লড়াই করছি, কিন্তু এখন আমি অন্যদের জন্য লড়াই করছি।'

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status