ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বৃহস্পতিবার ২৫ জুন ২০২৬ ১১ আষাঢ় ১৪৩৩
বিবিসির অনুসন্ধান
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিসহ অনেক অভিবাসীকে ভুয়া সমকামী বানাচ্ছে ‘ল ফার্ম’
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Wednesday, 15 April, 2026, 3:39 PM
সর্বশেষ আপডেট: Wednesday, 15 April, 2026, 3:42 PM

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিসহ অনেক অভিবাসীকে ভুয়া সমকামী বানাচ্ছে ‘ল ফার্ম’

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিসহ অনেক অভিবাসীকে ভুয়া সমকামী বানাচ্ছে ‘ল ফার্ম’

যুক্তরাজ্যে বসবাসের অনুমতি বা ভিসা পাওয়ার জন্য অভিবাসীদের ‘ভুয়া সমকামী’ সাজার পরামর্শ দিচ্ছে এক শ্রেণির ‘ল ফার্ম’ বা আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। বিনিময়ে অভিবাসীদের কাছে থেকে তারা কয়েক হাজার করে পাউন্ড হাতিয়ে নিচ্ছে। বিবিসির অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

এই অভিবাসীদের বড় একটি অংশ পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নাগরিক। যুক্তরাজ্যে তারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। সেই আবেদনে দাবি করা হয়েছে, তারা সমকামী। নিজ দেশে ফিরে গেলে জীবন বিপন্ন হতে পারে। 

নিজের দেশে ফিরে গেলে যারা বিপদে পড়তে পারে; তাদের বসবাসের অনুমতির ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের আশ্রয়প্রক্রিয়া অনেকটাই সুরক্ষা দেয়। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অভিবাসীদের কাছে থেকে মোটা অঙ্কের ফি নেওয়া ‘ল ফার্ম’গুলো এই সুরক্ষা প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করছে।

জালিয়াতির শিকার অভিবাসীরা পড়াশোনা, কাজ বা ভ্রমণ ভিসায় যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। বর্তমানে তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে। গত বছর যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়ায়। তাদের মধ্যে ৩৫ শতাংশই এই তিন ধরনের ভিসায় প্রবেশ করেছিলেন। 

যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে তাদের ভুয়া জীবনবৃত্তান্ত বা কভার স্টোরি কীভাবে তৈরি করে দেওয়া হয় তা এক দীর্ঘ অনুসন্ধানের মাধ্যমে তুলে ধরেছে বিবিসি। এতে দেখা গেছে, আইনি পরামর্শকরাই অভিবাসীদের ভুয়া প্রমাণপত্র, সমর্থনসূচক চিঠি, ছবি ও মেডিকেল রিপোর্ট তৈরির পদ্ধতি শিখিয়ে দেন।

প্রাথমিক তথ্য ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিবিসির আন্ডারকভার সাংবাদিকরা অনুসন্ধানে নামেন। তারা কয়েকটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাছে গিয়ে নিজেদের পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেন। জানান, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর পরের ধাপগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ যেসব তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলো হলো:

১. একটি ল ফার্ম ভুয়া আশ্রয় আবেদন সাজাতে ৭ হাজার পাউন্ড (১০ লাখ টাকার বেশি) পর্যন্ত দাবি করেছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্বারা এই আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

২. ভুয়া আশ্রয়প্রার্থীরা সাধারণ চিকিৎসকদের কাছে গিয়ে নিজেকে হতাশাগ্রস্ত হিসেবে তুলে ধরেন। এর উদ্দেশ্য চিকিৎসা সনদ পাওয়া। এ ধরনের সনদ তাদের আশ্রয়ের আবেদনকে শক্তিশালী করে। এমনকি একজন আবেদনকারীকে ‘এইচআইভি পজিটিভ’ হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দিতেও দেখা গেছে।

৩. বিবিসির ছদ্মবেশী আবেদনকারীর বিশ্বস্ততা অর্জন করতে একজন পরামর্শক দাবি করেন, তিনি ১৭ বছর ধরে এ কাজ (ভুয়া আবেদন তৈরি) করছেন। আবেদনকারী যে সমকামী তা প্রমাণ করতে একজন সাক্ষী জোগাড় করে দেওয়ারও আশ্বাস দেন। এ ধরনের সাক্ষীরা মূলত, আবেদনকারীর সঙ্গে তাদের যৌন সম্পর্ক থাকার ভুয়া দাবি করেন। 

৪. একটি ল ফার্মে গিয়ে পাকিস্তানি পরিচয় দেওয়া ছদ্মবেশী সাংবাদিককে বলা হয়, তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে গেলে পাকিস্তানে থাকা তার স্ত্রীকেও যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে ‘লেসবিয়ান’ বা নারী সমকামী সাজিয়ে ভুয়া আবেদন করানো হবে।

৫. একটি ফার্মের সঙ্গে যুক্ত একজন আইনজীবী জানান, তিনি অনেককে সমকামী বা নাস্তিক সাজিয়ে সফলভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় পাইয়ে দিয়েছেন। এরপর ছদ্মবেশী সাংবাদিককে ১ হাজার ৫০০ পাউন্ডের বিনিময়ে ভুয়া আবেদন এবং আরও দুই থেকে তিন হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে ভুয়া প্রমাণপত্র তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

‘এখানে কেউ সমকামী নয়’
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে বিবিসির ছদ্মবেশী সাংবাদিকরা অনুসন্ধানে নামেন। ওই মাসের এক মঙ্গলবারে পূর্ব লন্ডনের বেকটনের কমিউনিটি সেন্টারে এক অনুষ্ঠানে জড়ো হয়েছিলেন ১৭৫ জনের বেশি ব্যক্তি। অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিল ‘ওরচেস্টার এলজিবিটি’ নামের সংগঠন। এই সংগঠনটি নিজেদের সমকামী আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তাকারী হিসেবে পরিচয় দেয়। 

সংগঠনটির ওয়েবসাইটে লেখা আছে, তারা কেবল প্রকৃত সমকামী আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তা দেয়। কিন্তু পূর্ব লন্ডনের ওই অনুষ্ঠানে গিয়ে জানা যায়, বাস্তবতা ভিন্ন। অংশগ্রহণকারী পুরুষদের কয়েকজন ছদ্মবেশী সাংবাদিককে জানান, তারা আসলে সমকামী নন। ফাহার নামের একজন বলেন, ‘এখানে আসা অধিকাংশ মানুষই সমকামী নয়।’ জিসান নামের আরেকজন বলেন, ‘এখানে কেউ সমকামী নয়। এমনকি ১ শতাংশও নয়।’

‘ওরচেস্টার এলজিবিটি’ নামের সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা মাজেদুল হাসান শাকিল নামের এক ব্যক্তি। তিনি বার্মিংহাম ও লন্ডনভিত্তিক ইমিগ্রেশন ল ফার্ম ‘ল অ্যান্ড জাস্টিস সলিসিটরস’-এর প্যারালিগ্যাল (আইনজীবীর সহকারী)। অনুসন্ধানের শুরুতে এক ফোনালাপে ছদ্মবেশী সাংবাদিককে মাজেদুল বলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে হলে অবশ্যই নির্যাতনের শিকার হতে হবে।’ ওই ফোনালাপ শেষের কয়েক ঘণ্টা পর তানিশা নামে একজনের কাছে থেকে কল পান ছদ্মবেশী সাংবাদিক। 

তানিশার সঙ্গে আলাপের সময় ছদ্মবেশী সাংবাদিক উর্দুতে কথা বলেন। এতে আশ্রয় প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে তানিশা অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সাংবাদিক যখন জানান তিনি আসলে সমকামী নন, তখন তানিশা বলেন, ‘এখানে কেউ আসল (প্রকৃত সমকামী) নন। বর্তমানে এখানে টিকে থাকার একটাই উপায় আছে। সবাই সে পদ্ধতি অবলম্বন করছে।’

তানিশাকে সাংবাদিকের ফোন নম্বর কে দিয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। তবে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইল পিকচার এবং নাম মিলিয়ে দেখা গেছে, তিনি ‘ওরচেস্টার এলজিবিটির’ একজন উপদেষ্টা। পুরো নাম তানিশা খান।

বাংলাদেশি আবেদনকারী কত?
ঠিক কতজন আশ্রয়প্রার্থী এভাবে ভুয়া আবেদন করছেন, সেটির সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা কঠিন। তবে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেক্সচুয়াল ওরিয়েন্টেশন বা যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার দৌড়ে পাকিস্তানি নাগরিকরা অনেক এগিয়ে। এরপরে আছেন বাংলাদেশিরা।

২০২৩ সালের সবশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ৩ হাজার ৪৩০টি এলজিবিটি আশ্রয় আবেদনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে নতুন আবেদনের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৪০০টি। আবেদনকারীদের ৪২ শতাংশই পাকিস্তানি নাগরিক। গত পাঁচ বছর ধরে তালিকায় শীর্ষে আছে দেশটি।

একই বছরে (২০২৩) বিভিন্ন কারণে যুক্তরাজ্যে মোট রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদনের তালিকায় পাকিস্তানের অবস্থান চতুর্থ (মাত্র ৬ শতাংশ)। কিন্তু যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে আবেদনের ক্ষেত্রে তালিকায় দেশটি শীর্ষে- ৫৭৮ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের নাগরিক ১৭৫ জন। এরপরে আছে যথাক্রমে নাইজেরিয়া (১০৩), ভারত (৩৯), উগান্ডা (৩৫) এবং অন্যান্য দেশের ৪৪৭ জন।

যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে আশ্রয় আবেদনের সাম্প্রতিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানবিদরা জানিয়েছেন, পড়াশোনা বা কাজের ভিসায় আসা পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং ভারতের নাগরিকদের মধ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার প্রবণতা ইদানিং বেড়েছে।

২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে করা রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই প্রাথমিক পর্যায়ে অনুমোদন পায়।

‘এটি একটি বিশাল সমস্যা’
ওরচেস্টার এলজিবিটি প্রতি মাসে সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থানে থাকা অভিবাসীরা যোগ দেন। তবে সমকামী সাজার জন্য আশ্রয়প্রার্থীরা কেবল এই একটি সংগঠনের সহায়তা নেয়, বিষয়টা এমন নয়। আরও অনেক কমিউনিটি গ্রুপ আছে।

লুটন শহরভিত্তিক ‘মুসলিম এলজিবিটি নেটওয়ার্ক’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত এজেল খান বলেন, ‘এটি একটি বিশাল সমস্যা। মানুষ আমার সংস্থাকে টাকা দিয়ে সুপারিশনামা বা লেটার অব রেকমেন্ডেশন কিনতে চায়। কিন্তু আমি কখনো তা নিই না। আমার সব কাজই স্বেচ্ছাসেবীমূলক।’

এজেল খান আরও বলেন, ‘অনেকে এসে আমাকে সরাসরি বলেছে- তারা সমকামী নয়। কিন্তু এ দেশে (যুক্তরাজ্য) থাকতে চায়।’

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যারা আশ্রয় পাওয়ার মতো সুরক্ষা ব্যবস্থার অপব্যবহার করবে তাদের কঠোরতম শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। প্রয়োজনে যুক্তরাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হবে।



পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status