ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বৃহস্পতিবার ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ৯ বৈশাখ ১৪৩৩
ট্রাম্প কেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলেন: নেপথ্যের ৬ কারণ
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Wednesday, 8 April, 2026, 6:24 PM

ট্রাম্প কেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলেন: নেপথ্যের ৬ কারণ

ট্রাম্প কেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলেন: নেপথ্যের ৬ কারণ

১১ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ট্রাম্পের মুখোমুখি বসেন নেতানিয়াহু। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে একটি প্রেজেন্টেশন দেন নেতানিয়াহু। তিনি যুক্তি দেখান যে, ইরানে সরকার পরিবর্তনের উপযুক্ত সময় এখনই এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানই পারবে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির পতন ঘটাতে। তিনি একটি ভিডিও চিত্রও দেখান যেখানে ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকারের পতন হলে কারা দেশটির নেতৃত্ব দিতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার আগের আড়াই সপ্তাহে, হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে একের পর এক অত্যন্ত গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন অল্প কয়েকজন উপদেষ্টা। শিগগিরই প্রকাশিত হতে যাওয়া বই 'রিজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দ্য ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প'-এর জন্য সংগৃহীত তথ্যে ওই সময়ের অনেক অজানা বিষয় উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের মনের মিল এবং নিজের ঘনিষ্ঠ বলয়ের প্রায় সবার মৌন সম্মতি কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের পথে ঠেলে দিয়েছিল।

সেই সময়কার ঘটনাবলির প্রধান ৬টি তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো

১. সিচুয়েশন রুমে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ যুদ্ধ-পরিকল্পনা

১১ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি বসেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সাধারণত বিদেশি নেতাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার জন্য এই জায়গাটি খুব কমই ব্যবহৃত হয়। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে একটি প্রেজেন্টেশন দেন নেতানিয়াহু। তিনি যুক্তি দেখান যে, ইরানে সরকার পরিবর্তনের উপযুক্ত সময় এখনই এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানই পারবে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির পতন ঘটাতে। তিনি একটি ভিডিও চিত্রও দেখান যেখানে ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকারের পতন হলে কারা দেশটির নেতৃত্ব দিতে পারেন। এর মধ্যে ইরানের নির্বাসিত রেজা পাহলভির নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ও তার উপদেষ্টারা এই জয়কে নিশ্চিত হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাদের পরিকল্পনা ছিল—কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা এবং মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা আঘাত নূন্যতম পর্যায়ে রাখা। 

এমনকি ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ উসকে দিয়ে কাজ শেষ করতে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সহায়তা করবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি। এ সময় ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল ইতিবাচক। তিনি নেতানিয়াহুকে বলেন, 'এটি আমার কাছে সঠিক মনে হচ্ছে'।

২. ইসরায়েলি পরিকল্পনাকে 'প্রহসন' বলেছিল মার্কিন গোয়েন্দারা

নেতানিয়াহুর উপস্থাপিত তথ্যগুলো যাচাই করতে মার্কিন বিশ্লেষকরা রাতভর কাজ করেন। পরদিন সিচুয়েশন রুমের আরেকটি বৈঠকে তারা তাদের মূল্যায়ন তুলে ধরেন। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার প্রথম দুটি লক্ষ্য—সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে হত্যা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা ধ্বংস করা—অর্জন করা সম্ভব। তবে পরের দুটি লক্ষ্য—ইরানের ভেতরে জনবিস্ফোরণ ঘটানো এবং বর্তমান সরকারের বদলে একজন ধর্ম নিরপেক্ষ নেতাকে ক্ষমতায় বসানো— অবাস্তব।

সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ এই সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনাকে এক কথায় 'প্রহসনমূলক' বলে অভিহিত করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'অন্য কথায় বলতে গেলে, এটি পুরোটাই আজেবাজে কথা।'

ট্রাম্প এই মূল্যায়ন শুনলেও তা আমলে নেননি। ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা এবং তাদের সামরিক শক্তি ধ্বংস করার বিষয়ে তিনি আগ্রহী ছিলেন। 

৩. যুদ্ধের প্রধান এবং একমাত্র প্রতিবাদী কণ্ঠ ছিলেন জেডি ভ্যান্স

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে একমাত্র ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সই যুদ্ধের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেন। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তিনি এ ধরনের সামরিক হঠকারিতার বিরোধিতা করে আসছিলেন। তিনি সহকর্মীদের সাফ জানিয়ে দেন, ইরানের সঙ্গে সরকার পরিবর্তনের যুদ্ধ হবে একটি ভয়াবহ বিপর্যয়।

প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য উপদেষ্টাদের সামনে ভ্যান্স সতর্ক করে বলেন, এই সংঘাত আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা এবং অগণিত প্রাণহানির কারণ হতে পারে। এছাড়া এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোটে ফাটল ধরাবে এবং ভোটারদের কাছে একে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হবে। তিনি মার্কিন গোলাবারুদের স্বল্পতা এবং শাসনের অস্তিত্ব রক্ষায় ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য চরম ও অননুমেয় পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি নিয়েও কথা বলেন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কার কথা জানান তিনি।

ভ্যান্সের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ছিল কোনো ধরনের হামলা না করা। কিন্তু ট্রাম্প হামলা করবেনই বুঝতে পেরে তিনি একে সীমিত রাখার চেষ্টা করেন। তাতে ব্যর্থ হয়ে তিনি দ্রুত পরিস্থিতি শেষ করতে ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের পরামর্শ দেন। ২৬ ফেব্রুয়ারির শেষ বৈঠকে তিনি প্রেসিডেন্টকে সরাসরি বলেন, 'আপনি জানেন আমি এটাকে খারাপ পরিকল্পনা মনে করি, কিন্তু আপনি যদি এটি করতে চান, তবে আমি আপনার পাশেই আছি।'

৪. উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত উদ্বেগ থাকলেও ট্রাম্পের ওপরই সব ছেড়ে দেন

ট্রাম্পের উপদেষ্টামণ্ডলীর মধ্যে ভ্যান্স ছাড়া আর কেউই তাকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য চাপ দেননি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ছিলেন সবচেয়ে উৎসাহী। তিনি বলেন, 'আমাদের তো কোনো না কোনো সময় ইরানকে মোকাবিলা করতেই হবে, তাহলে এখনই নয় কেন?' পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকলেও ট্রাম্পকে সরাসরি বাধা দেননি। চিফ অফ স্টাফ সুসি ওয়াইলস মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মধ্যপ্রাচ্যে জড়িয়ে পড়া নিয়ে চিন্তিত থাকলেও ট্রাম্পের সামনে মুখ খোলেননি।

জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন অস্ত্র সংকট ও ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি নিয়ে বারবার সতর্ক করলেও কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ নিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি মনে করতেন, প্রেসিডেন্টকে কী করতে হবে তা বলা তার কাজ নয়। ফলে ট্রাম্প কেবল সেটুকুই শুনতেন, যা তিনি শুনতে চাইতেন।

৫. ভেনেজুয়েলার মতো সহজ যুদ্ধের স্বপ্ন দেখেছিলেন ট্রাম্প

ট্রাম্পের বিশ্বাস ছিল, ইরানের সঙ্গে সংঘাত হবে সংক্ষিপ্ত ও সিদ্ধান্তমূলক। তার এই আত্মবিশ্বাসের মূলে ছিল ভেনেজুয়েলা ও ইরানের ব্যাপারে আগের কিছু অভিজ্ঞতা। 

উপদেষ্টারা যখন সতর্ক করেন যে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে, ট্রাম্প তা উড়িয়ে দেন। তিনি ভাবেন পরিস্থিতির অবনতির আগেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে। যখন তাকে বলা হয় যে দীর্ঘদিনের ইউক্রেন ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে গেছে, ট্রাম্প সেই সতর্কবার্তাকে তুচ্ছ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অল্প দামের এবং নিখুঁত নিশানার বোমার অফুরন্ত সরবরাহ রয়েছে।

এমনকি যখন রক্ষণশীল বিশ্লেষক টাকার কার্লসন ব্যক্তিগতভাবে তাকে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি কীভাবে এত নিশ্চিত যে সব ঠিক হয়ে যাবে? ট্রাম্প উত্তর দেন, কারণ সবকিছু সবসময় ঠিকঠাকই থাকে।'

৬. ট্রাম্পের 'সহজাত প্রবৃত্তি' এবং দ্বিতীয় মেয়াদের পরিবর্তন

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্তটি কোনো গোয়েন্দা তথ্য বা উপদেষ্টাদের কৌশলগত ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি। এটি ছিল ট্রাম্পের সহজাত প্রবৃত্তির ফল। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের উপদেষ্টারা তাকে নিয়ন্ত্রণ বা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতেন, কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদের উপদেষ্টারা তাকে ইতিহাসের একজন মহানায়ক হিসেবে দেখেন।

২০২৪ সালের অভাবনীয় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন, আইনি লড়াই এবং হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে আসার পর ট্রাম্পের আশপাশের মানুষজন তার ভাগ্যের ওপর এক প্রকার অন্ধ বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রায় সবাই প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করেন।

ট্রাম্পের ইচ্ছা বাস্তবায়নে নিয়োজিত মানুষের ভিড়ে, এবং এর আগে প্রায় সবকিছু তার অনুকূলে যাওয়ায়, শেষ পর্যন্ত তার প্রবৃত্তি ও বাস্তব পদক্ষেপের মাঝখানে তেমন কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status