|
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কীভাবে? সংস্কারের ভবিষ্যৎ কী?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কীভাবে? সংস্কারের ভবিষ্যৎ কী? জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে যে গণভোট হয়েছে, তাতে আসা জনগণের রায় কার্যকরের দাবিতে শনিবার বিক্ষোভ সমাবেশে করেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। সে দিন এক অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেছেন, জুলাই সনদ নিয়ে নয়, তা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক চলছে। এ বিতর্কে যে প্রশ্ন সামনে আসছে তা হল, জুলাই সনদ কীভাবে কার্যকর হবে? আসলেই কি সংবিধান সংস্কার হবে? জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়। অবসান ঘটে শেখ হাসিনার সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনের। দেশের হাল ধরার পর অন্তর্বর্তী সরকারের গণতান্ত্রিক উত্তরণে সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময় সংস্কারের আওতা বাড়িয়ে আরো পাঁচটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা, সংলাপ, বিতর্ক পেরিয়ে গত বছর ১৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হয়। এরপর নভেম্বরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, যে আদেশ অনুসারে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়। গেল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট হয়েছে, তাতে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটার সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। একই আদেশ অনুসারে সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে সংসদ নির্বাচনে ২০৯ আসনের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করা বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। অন্যদিকে দুই শপথ নিয়েছেন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের ৭৭ জন সদস্য। ফলে বিএনপি না চাইলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বা সংবিধান সংস্কার সম্ভব নয়। সংস্কারে প্রথমেই হোঁচট? অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এসব অধ্যাদেশ আইনে রূপ দিতে সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ১২ মার্চ জয়নুল আবেদীনকে সভাপতি করে ১৩ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। পরে ১৫ মার্চ আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবে সংসদে উত্থাপিত ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কমিটিতে পাঠানো হয়। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে গণভোট, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ২০টিকে এখনই আইনে রূপ না দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। আর ৯৮টি অধ্যাদেশে কোনো পরিবর্তন না এনে হুবহু এবং ১৫টি সংশোধন করে বিল আকারে তোলার সুপারিশ করে বৃহস্পতিবার সংসদে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এখনই যে ২০টি অধ্যাদেশ বিল আকারে তোলা হবে না সেগুলোর মধ্যে চারটি বাতিল ও হেফাজতের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ কমিটির এ প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বলেছিলেন, আগামী সোমবার থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা পর্যায়ক্রমে ১১৩টি বিল সংসদে উত্থাপন করবেন। নিয়ম অনুযায়ী, ৯ এপ্রিলের মধ্যে এসব বিল পাস করতে হবে। সে হিসেবে সংসদের হাতে থাকবে চারটি কার্যদিবস। যেসব অধ্যাদেশ ৯ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে অনুমোদন হবে না সেগুলোর কার্যকারিতা লোপ পাবে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ পুনরায় বসার পর ৩০ দিনের মধ্যে আইন না হলে অধ্যাদেশ ‘ল্যাপস’ হয়ে যায়। চারটি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে কমিটি বলেছে, এগুলো রহিতকরণ ও হেফাজতের জন্য সংসদে বিল আকারে তুলতে হবে। এগুলো হল- জাতীয় সংসদ সচিবালয় অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংশোধন অধ্যাদেশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগ ও সংসদ সচিবালয়ের অন্তর্বর্তী বা বিশেষ কাঠামো তৈরির লক্ষ্যেই এসব অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। বিচার বিভাগ সংস্কারে জুলাই সনদের প্রস্তাবে এ বিষয়গুলো রয়েছে। বিশেষ কমিটিতে থাকা বিরোধীদলীয় তিন সদস্য রাজশাহী-১ আসনের মো. মুজিবুর রহমান, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের মো. রফিকুল ইসলাম খান এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের জি এম নজরুল ইসলাম বিভিন্ন অধ্যাদেশ নিয়ে কমিটির সুপারিশে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত দিয়েছেন। তারা এসব অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত অবস্থায় বিল আকারে আনার দাবি করেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, দুদক সংশোধন অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার সংশোধন অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের মতো আইনগুলো অপরিবর্তিত অবস্থায় পাস করার পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেছেন। জুলাই সনদে দুর্নীতি দমন কমিশনকে সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান থেকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। বিরোধীদলীয় তিন সদস্য ‘নোট অব ডিসেন্টে’ বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ‘ল্যাপস’ হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পালনে ব্যর্থ হতে পারে এবং কমিশনের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবে। গুমবিরোধী আইনের ক্ষেত্রে তারা বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে সরকারি অনুমতির শর্ত কার্যকর নিরপেক্ষ তদন্তের পথে বাধা হতে পারে। বিএনপির নেতারা বলছেন, এসব অধ্যাদেশ জারির সময়ও দলের তরফে বিরোধিতা করা হয়েছিল। জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন গণমাধ্যমকে বলেন, “গণভোটের ব্যাপারে তো আলোচনা হচ্ছে গণভোটের ব্যাপারে তো বিরোধী দলে সরকারি দল আলোচনা করছে। “তবে জুলাই জাতীয় সনদ আদেশ, যেটি রাষ্ট্রপতির আদেশে হয়েছে, সেটি তো অধ্যাদেশ হয়নি। যেগুলো অধ্যাদেশ হয়েছে সেগুলার উপরে আমরা প্রতিবেদন দিয়েছি।” তিনি বলেন, “গণভোটের বিষয়টি এসেছে যখন ঐকমত্য কমিশনে (জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি) ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হল না। গণভোট এসেছে একটা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে, যে জন্য ইতোমধ্যে বিরোধী দলের প্রস্তাব মেনে মূলতবি আলোচনা শুরু হয়েছে।” গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে শনিবার ১১ দলীয় জোটের সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত অধ্যাদেশের মধ্যে যা যা সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, সেসব অধ্যাদেশ বিএনপি সরকারের খুব পছন্দ। “কিন্তু যেই অধ্যাদেশ জনগণের কাছে সরকারকে জবাবদিহিতে বাধ্য করে সেই অধ্যাদেশ বিএনপির খবুই অপছন্দ। এজন্য বিএনপি বাছাই করে সেসব অধ্যাদেশ বাতিল করার পথে হাঁটছে।” সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় বিষয়ে দুটি অধ্যাদেশ বাতিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ‘যাচাই-বাছাইয়ের নামে’ স্থগিতের সুপারিশে ‘ক্ষুব্ধ ও হতাশা’ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন। শুক্রবার এক বিবৃতিতে তিনি দুদক, পুলিশ কমিশন ও তথ্য অধিকারবিষয়কসহ ‘স্থগিতের সুপারিশপ্রাপ্ত’ বাকি অধ্যাদেশগুলোর বিষয়েও কথা বলেছেন। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে যাচাই-বাছাই করে অবিলম্বে অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গণভোট নিয়ে বিএনপির এ অবস্থান কেন? গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে বিল আকারে আনার বিপক্ষে সরকারি দল বিএনপি। শনিবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি উঠলেও তা নিয়ে আলোচনা হয়নি বলে কমিটির একজন সদস্য গণমাধ্যমকে বলেছেন। তবে দলটির স্থায়ী কমিটি ও বিভিন্ন স্তরের কয়েকজন নেতার কাছ থেকে দুই ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় কমিটির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “অন্তবর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের উপর বিএনপির সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল। গণভোট ও ছাত্রদের দলকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে তার ওপর সন্দেহ হয়। নির্বাচন বিলম্বিত করা বা নির্বাচন বানচালের একটি সন্দেহ ছিল বিএনপির। যে কারণে বিএনপি কৌশলগত অবস্থান নিয়ে গণভোটে সম্মতি দিয়েছিল।” ওই নেতা বলেন, “গণভোট করার প্রতিশ্রুতি ছিল মুহাম্মদ ইউনূসের। ওই সময় গণভোটের বিরোধিতা করলে বিএনপির অবস্থান মানুষ গ্রহণ করতো না। যে কারণে বিরোধিতার কোনো সুযোগ ছিলো না।” সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে থাকা বিএনপির সদস্য মাহবুব উদ্দিন খোকন গণমাধ্যমকে বলেন, “গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫ আমরা (সংসদের বিশেষ কমিটি) প্রস্তাব করিনি। গণভোট কার্যকর হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি। এখন এর কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেছে।” বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের এই সদস্য বলেন, “গণভোটের আর পরবর্তী কোনো কার্যক্রম থাকবে না। এটা করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।” মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, গণভোট নিয়ে আপত্তির বিষয় হচ্ছে, গণভোটের যে চারটি প্রশ্ন ছিল তা নিয়ে অন্তবর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আলাপ করেনি। জামায়াতকে ইংগিত করে তিনি বলে, “সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার কথা বলে তারা। সংবিধান সংশোধন করার কথা আছে, ছুঁড়ে ফেলার কথা তো নেই।” কুতর্ক? গণভোট অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়ায় তা ‘এখন তামাদি ও অকার্যকর’ বলে মনে করেন জাতীয় ঐক্যমত কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ দেন। এই আদেশের ভিত্তিতে গণভোট হয়েছে। “গণভোট তো হয়ে গেছে। এখন এটা তামাদি হয়ে গেছে।” ফলে গণভোট অধ্যাদেশ ‘অকার্যকর’ হয়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “একটি আইনি কথা আছে ‘ফ্যাকটাম ভ্যালেট’, যার অর্থ-যা করা হয়েছে তা বৈধ।” সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম বলেন, “সংবিধানের উর্ধ্বে উঠে জনগণের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে গণভোট হয়েছে। ১৯৯১ সালেও এমন উদাহরণের ঘটনা আছে। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টা হয়ে আবার পুরনো অবস্থাই ফিরে গেছেন, সেটা কি সংবিধান মেনে হয়েছিল? রাজনৈতিক দলগুলো রাজি হয়েছিল। “ফলে এখন যা চলছে, তা কুতর্ক। এগুলোর মাশুল জাতিকে দিতে হবে, আমাদের সবাইকে দিতে হবে।” সংস্কার না সংশোধন? জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা ঠিক করে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। আর সেসব সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়নের বিষয়ে জনগণের সম্মতি নিতে ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন হয় গণভোট। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ অনুযায়ী, বর্তমান সংসদের সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও ভূমিকা রাখার কথা। সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার বিষেয় ২৯ মার্চ বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান কার্যপ্রণালী-বিধির ৬২ বিধি অনুসারে সংসদে জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের নোটিস দেন। এছাড়া সোমবার স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার জন্য একটি মুলতবি প্রস্তাব আনেন। তবে সেই প্রস্তাবের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাব নিয়ে মঙ্গলবার সংসদে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সে দিন বিতর্কের এক পর্যায়ে সংবিধান সংশোধনে সংসদে থাকা সব দলের ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব আসে সরকারি দলের তরফে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রীর তরফে এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ হিসেবে বর্ণনা করেন। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে বিএনপির মুখ ছিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদের বিরুদ্ধে নয়, কিন্তু জুলাই আদেশ নিয়ে তাদের আপত্তি আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন। কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো সাংবিধানিক অস্তিত্ব নেই। ফলে সেই পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের প্রশ্নও ওঠে না। তার ভাষায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বৈধ আইন নয়; রাষ্ট্রপতি অতীতে আদেশ জারি করতে পারলেও ১৯৭৩ সালের পর সেই ক্ষমতা আর নেই। বুধবার বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাবে ‘প্রতিকার’ না পাওয়া এবং তাদের প্রস্তাব চাপা দিতে একই বিষয়ে আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব আনার অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে ‘ওয়াক আউট’ করে বিরোধী দল। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “সংস্কার আর সংশোধনী নিয়ে যখন কথা হয়, আমরা অবাক হই। সংবিধান সংশোধন করা সংসদের রুটিন কাজ। রুটিন কাজের জন্য জুলাই বিপ্লব হয়নি, গণভোট হয়নি। জুলাই বিপ্লব এবং গণভোট হয়েছে সংস্কারের জন্য। তাই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।” সংসদের সংবিধান সংস্কারের কোনো সুযোগ নেই বলেও তিনি মনে করেন। এর ব্যাখ্যায় জামায়াত নেতা আযাদ বলেন, “সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচারে কেউ হাতই দিতে পারবে না। অবশ্যই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। এতে করে সংবিধানও বাতিল হবে না। সংসদ বহাল রেখেই সংস্কার পরিষদ আহ্বান করতে হবে। ছয় মাস হচ্ছে এই পরিষদের মেয়াদ।” বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব বলছেন, রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপির দেওয়া ৩১ দফা ও জুলাই সনদ নিয়ে দলের প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক একটি চুক্তি আছে। এজন্য জুলাই সনদের বাস্তবায়নে আন্তরিকতা থাকবে সরকারের। বিএনপির তরফে এই প্রতিশ্রুতি ছিল নির্বাচনের আগেও। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে সংবিধান সংস্কার নিয়ে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিস্তারিত পরিবর্তনের কথা বলেছেন, তিনি এখন বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী। সে সময় তিনি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার মধ্যে ছিল ক্ষমতায় যেতে সক্ষম হলে সংবিধানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ যুক্ত করা; এক ব্যক্তির দশ বছরের বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকা, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ‘দুয়েকটি বিষয় ছাড়া’ ফ্লোর ক্রসিংয়ের সুযোগ উন্মুক্ত; ‘সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন’ এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ আনা। শনিবার এক আলোচনা সভায় বিএনপির এসব প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের বলেন, “বিএনপি তাদের ৩১ দফার মধ্যে সংস্কার কমিশন গঠন করে সংবিধানের যে আইনগুলোর কারণে ফ্যাসিবাদের জন্ম হয় সেগুলো সংশোধন করবে বলে ঘোষণা করেছে। “সংবিধান সংস্কারের কথা নাই (বলছেন), তাহলে আপনারা ৩১ দফায় লিখেছিলেন কীভাবে? তাহলে গণভোট চাইলেন কেন? ‘হ্যাঁ’ ভোটে জনগণকে আহ্বান জানালেন কেন? এসব দ্বিচারিতা। নিজেদের ওয়াদার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং জনগণের রায়কে অস্বীকার, অগ্রাহ্য ও অপমান করা।” নির্বাচনের পর সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং সংস্কার বাস্তবায়ন বিষয়ে বলেছিলেন, যেহেতু বাংলাদেশের আইনের কোথাও, বিশেষ করে সংবিধানের কোথাও এমন কোনো বিধান নেই, সে কারণে এটা সম্ভব নয়। তার ভাষায়, “কোনো দেশে এমন কোনো ঘটনা হয়েছে? এই আইনের বা আদেশের ব্যাপারে কোথাও কখনো কিছু লেখা হয় নাই। সংবিধানে এসব কথা কিছু বলা নাই। কোনো দেশের, কোনো সংবিধানে এসব কথা বলা নাই। “আপনি সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে প্রশ্ন করলেন মানে, আপনি প্রশ্ন করলেন লাফ দিয়ে চাঁদে যাওয়া যায় কিনা? বিশেষজ্ঞরা উত্তর দিল, হ্যাঁ আপনি অনেকদিন ধরে প্র্যাকটিস করেন। জোরে লাফ দিলে চাঁদে পৌঁছে যাবেন। আমাদের আলোচনাটা হচ্ছে এই।” আবার রাজপথ শনিবার সৌদি আরব থেকে ঢাকায় এসেই সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসহ অন্যান্য উপদেষ্টাদের রাজপথে কথা বলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সে দিনই সংবিধান সংস্কারে গণভোটের রায় কার্যকরের দাবিতে ঢাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ করে ১১ দলীয় জোট হুঁশিয়ার করে বলেছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপিতে ‘বাধ্য’ করা হবে। জোটের শরিক এনসিপির ছয়জন সদস্য রয়েছেন সংসদে। একই দিন গণভোটের রায় কার্যকরের দাবিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শুক্রবার বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়েছে জোটের আরেক শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, সংসদে তাদের সদস্য দুইজন। দলটি ২৪ এপ্রিল ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশের কর্মসূচিও দিয়েছে। মঙ্গলবার ৭ এপ্রিল ১১ দলের পরবর্তী বৈঠকে কর্মসূচি নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। জানতে চাইলে জোটের অন্যতম শীর্ষনেতা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, “জুলাই বিপ্লবের যে আকাঙক্ষা, সংস্কার বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের দাবির পক্ষে আমরা ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি, জনসংযোগ অব্যাহত রাখবো। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে সংঘবদ্ধ করবো। জুলাই বিপ্লব ও আকাক্ষার বাস্তবায়নে আমরা আপসহীন থাকবো।” এনসিপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে এনসিপি সক্রিয় থাকবে। এটা এনসিপির অগ্রাধিকার।” |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
