ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ৮ জুন ২০২৬ ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ছোট জাতের মেয়েকে বিয়ের অপরাধ!
লাকসামে ‘একঘরে’ করায় সংখ্যালঘু পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Saturday, 9 March, 2019, 2:47 PM

লাকসামে ‘একঘরে’ করায় সংখ্যালঘু  পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন

লাকসামে ‘একঘরে’ করায় সংখ্যালঘু পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন

লাকসামে ছোট জাতের মেয়েকে বিয়ের অপরাধে (!) একটি নিরীহ হিন্দু পরিবারকে স্থানীয় এক মোড়ল কর্তৃক ‘একঘরে’ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী সংখ্যালঘু পরিবারটি বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ঘটনাটি ঘটেছে, উপজেলার মুদাফরগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়নের শ্রীয়াং গ্রামে।


জানা গেছে, শ্রীয়াং দক্ষিণপাড়ার ধর বাড়ির তপন চন্দ্র ধরের ছেলে শুভ চন্দ্র ধর (২৪) ও একই গ্রামের মৃত বেনু মাধব দাসের মেয়ে রীনা রানী দাসের (২১) দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এইর প্রেক্ষিতে গত বছরের ১৯শে সেপ্টেম্বর শুভ এবং রীনা ঢাকার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিষ্ট্রেট ও নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তারা বাড়িতে ফিরে এলে গত জানুয়ারি মাসে কয়েকদফা শালিস বসিয়ে স্থানীয় মোড়ল শিবু কৃষ্ণ মজুমদার শুভ চন্দ্র ধরের পরিবারকে ‘একঘরে’ করার সিদ্ধান্ত দেয়। ওই গ্রামের বিশেশ্বর চন্দ্র আইচ এ কাজে মোড়ল শিবু কৃষ্ণকে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া, শুভ চন্দ্রের দাদা স্থানীয় মন্দিরের পূজারী হলধর চন্দ্র ধর (৯৮) ও চাচা একই মন্দিরে সহকারি পূজারী নিমাই চন্দ্র ধরকে (৪৫) মন্দীরে পূজা দিতে নিষেধাজ্ঞা দেন ওই মোড়ল। এতে শুভ চন্দ্র ধরের পিতা তপন চন্দ্র ধর, মাতা সবিতা রানী ধরসহ পরিবারের সদস্যরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।


এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্ঠান ঐক্য পরিষদের দ্বারস্থ হয়েছেন একছেলে ও ২ কণ্যা সন্তানের পিতা তপন চন্দ্র ধর। শুভ’র পিতা তপন চন্দ্র ধর বলেন, ‘আদালতের মাধ্যমে আমার প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে রীনা রানী দাসকে বিয়ে করেছে। তারা উভয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক। আমরা পারিবারিকভাবে এ বিয়ে মেনে নিলেও সমাজপতি মোড়ল শিবু কৃষ্ণ মজুমদার আমাদেরকে ‘একঘরে’ করে রেখেছেন। তিনি আমার ছেলে শুভ ও ছেলের বউ রীনাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে বলেছেন। তাছাড়া, ‘অপবিত্র’ আখ্যা দিয়ে আমার পিতা মন্দিরের পূজারী ও সভাপতি হলধর চন্দ্র ধরকে মন্দিরে পূজা দিতে নিষেধ করেছেন। আমার ছোট ভাই নিমাই চন্দ্র ধর মাঝেমধ্যে মন্দিরের সহকারী পূজারী হিসেবে ছিল। তাকেও পূজা দিতে নিষেধ করেছেন শিবু কৃষ্ণ মজুমদার। আমার ছেলে ছোট জাতের মেয়েকে বিয়ে করায় আমাদের পরিবারের সবাইকে ‘অপবিত্র’ আখ্যা দিয়েছে। সমাজচ্যুত করায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।’ তিনি আরো জানান, ‘বিদেশে মার খেয়ে দেশে এসে শ্রীয়াং বাজারে ছোট একটি চা দোকান দিয়ে কোনোমতে সংসার চালাই। পরিবারের খরপোষ চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। তার উপর সমাজচ্যুত করায় সামাজিক ও মানসিকভাবে বিমর্ষ হয়ে পড়েছি। আমরা গরিব বলেই প্রভাবশালীরা আমাদেরকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করছে।’
এ বিষয়ে অভিযুক্ত মোড়ল শিবু কৃষ্ণ মজুমদার বলেন, ‘শুভ চন্দ্র ধর ‘কায়স্ত’। ‘উঁচু বর্ণের’। আর রীনা রানী দাস ‘নিচু বর্ণের’। ওই মেয়েক ঘরে তোলায় তারা অপবিত্র হয়ে গেছে। এমন বিয়ে আমাদের ধর্মে বারণ আছে। ধর্মীয় রীতি-নীতি অনুযায়ী ঠাকুরের সিদ্ধান্ত মতে সমাজের কারো সাথে ওই পরিবারের চলাফেরা-পূজা অর্চনা, লেনদেন না করার জন্য বলেছি। এটা ঠাকুরের সিদ্ধান্ত।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়ার আরো বড় ঠাকুরের (পন্ডিত) কাছে যাওয়া হবে। প্রয়োজনে এর জন্য সিতাকুন্ড গিয়ে ঠাকুরের নিকট থেকে লিখিত আদেশ আনা হবে।’ শিবু কৃষ্ণ বলেন’ ‘আমরা দাস, মালিসহ নিচু জাতের লোকজনের হাতের খাবার খাই না। তাদের সাথে আমাদের সমাজ চলে না।’


এ ঘটনায় হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্ঠান ঐক্যপরিষদের মুদাফরগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়ন সভাপতি ডাঃ লিটন চন্দ্র ভৌমিক বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় আইনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে শুভ ও রীনা প্রথম শ্রেণির আদালতের মাধ্যমে একে অপরকে বিয়ে করেছে। কাউকে ‘একঘরে’ রাখার কোন এখতিয়ার সমাজপতিদের নেই। তপন চন্দ্র ধরের পরিবারকে ‘একঘরে’ করার বিষয়টি অমানবিক। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি প্রতিকারের চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যথায় আইনের আশ্রয় নেয়ার জন্য ওই পরিবারকে বলা হয়েছে।’


এলাকাবাসী জানায়, পিসাতো বোনকে বিয়ে করা হিন্দু ধর্মীয় রীতি বিরুদ্ধ হলেও ওই গ্রামের মোড়ল শিবু কৃষ্ণ মজুমদার তার পিসাতো বোন মায়া রাণীকে বিয়ে করে দিব্বি সংসার করছেন। এতে কোন দোষ হয়নি। তাছাড়া, শিবু কৃষ্ণের মেয়ে শিমা রাণী কথিত নিচু জাতের এক ধোপা ছেলেকে বিয়ে করেছেন। তিনি তার মেয়ের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া, যাতায়াত করেন নিয়মিত। এতেও কোন দোষ নেই। তপন চন্দ্র ধর গরিব হওয়ায় ধর্মের দোহাই দিয়ে তাকে হেনস্তা করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ- উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক পরিচয় দিয়ে শিবু কৃষ্ণ মজুমদার এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে, শিবু কৃষ্ণের অন্যতম সহযোগী বিশেশ্বর চন্দ্র আইচ চারিত্রিক সমস্যায় ১৯৯৬ সালে স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে চাকরি হারানোর অভিযোগ আছে।


এ বিষয়ে স্থানীয় মুদাফরগঞ্জ দক্ষিণ ইউপি চেয়ামর‌্যান আবদুর রশিদ সওদাগর বলেন, ‘কাউকে একঘরে করার বিধান নেই। আর এ ঘটনাটি আমার জানা নেই। বিস্তারিত জেনে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ অপরদিকে, ওই ওয়ার্ডের মেম্বার শহীদ উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বেশ কিছুদিন পরিষদের কাজে ব্যস্ত থাকায় ঘটনাটি আমার জানা হয়নি। বিস্তারিত জেনে ঘটনাটি মিমাংসা করা হবে।’


লাকসাম থানার ওসি মনোজ কুমার দে বলেন, কাউকে একঘরে করার মত অমানবিক কাজ আর হতে পারে না। এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status