|
শিশুটি খুবই দুষ্টু, স্কুলে যাকে-তাকে থুতু দিত বলে একটু শাসন করেছি
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() শিশুটি খুবই দুষ্টু, স্কুলে যাকে-তাকে থুতু দিত বলে একটু শাসন করেছি অথচ সেই নির্যাতনকারী স্কুলের ব্যবস্থাপক গ্রেপ্তারের পর পবিত্র কুমার বড়ুয়া পুলিশকে জানিয়েছেন যে, ওই শিক্ষার্থী খুবই দুষ্টু, খালি দুষ্টামি করত স্কুলে। এ ছাড়া স্কুলে যাকে-তাকে থুতু দিতো। তাই কন্ট্রোল করার জন্য তিনি ‘একটু শাসন’ করেছিলেন। এদিকে স্কুলে শিশু নির্যাতন, তা আবার কর্মকর্তা ও প্রধান শিক্ষিকার হাতে, সেই নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। একজন লিখেছেন, ‘একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে শিশুদের নিরাপত্তা, স্নেহ ও মানবিকতার পাঠ দেওয়ার কথা, সেই জায়গাতেই এক নিষ্পাপ শিশুকে গলা টিপে নির্যাতনের ভয়াবহ দৃশ্য পুরো জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আরও মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই পাশবিক নির্যাতনের সময় বিদ্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি, একজন নারী অধ্যক্ষ, নীরবে বসে সেই দৃশ্য হাসি দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে যেখানে প্রতিবাদ, সহানুভূতি ও সুরক্ষার প্রত্যাশা ছিল, সেখানে ছিল নিস্তব্ধতা, যা শিশুর ক্ষত আরও গভীর করেছে। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান বলেন, ভোরে মিরপুর এলাকার একটি বাসা থেকে থানার পুলিশ নির্যাতনকারী স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার বড়ুয়াকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি পল্টন থানা এলাকায় শারমিন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহানের স্বামী। অন্য আসামিকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। শিশু নির্যাতনের মামলায় রিমান্ডের আবেদন করে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠিয়েছেন, তবে রিমান্ড আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে ২৭ জানুয়ারি। তিনি আরও বলেন, গ্রেপ্তারের পর থানায় পবিত্র কুমার বড়ুয়া তেমন কিছু বলেননি। তবে শিশুকে কেন মারলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চার বছরের শিশু শিক্ষার্থী খুবই দুষ্টু, খালি দুষ্টামি করতো স্কুলে, যাকে-তাকে থুতু নিক্ষেপ করতো। তাই কন্ট্রোল করার জন্য একটু শাসন করেছি। স্কুলে ভর্তির সময় প্রধান শিক্ষককে বলা হয়েছিল যে, শিশুর মা-বাবা জানান তাদের সন্তান খুব জেদি, রেগে গেলে ছটফট করে থুতু দেয়। প্রধান শিক্ষক তখন হাসি দিয়ে বলেছেন, ‘শিশুরা তো চঞ্চল হবেই, দুষ্টুমি করবে, কোনো অসুবিধা নেই। তারা এমন শিশুদেরই ম্যানেজ করতে পারবেন।’ কিন্তু দুষ্টামি করার শিশুদের এভাবে গলায় টিপ দিয়ে, মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে নির্যাতন করে ম্যানেজ করা হলো- ভিডিও ফুটেজে শিশুর মা-বাবা এমন দৃশ্য দেখে হতভম্ব। গত ১৮ জানুয়ারি নয়াপল্টন এলাকার মসজিদ রোডে শারমিন একাডেমি নামের একটি স্কুলে এ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ভিডিওতে দেখা যায়, অফিসকক্ষে স্কুলের পোশাক পরা এক নারী শিশুকে নিয়ে প্রবেশ করেন। শিশুটিকে প্রথমে ওই নারী চড় দেন। এরপর শিশুর ওপর চড়াও হন আগে থেকেই অফিস কক্ষে থাকা একজন পুরুষ। পুরুষটি কখনো শিশুর গলা চেপে ধরছিল, কখনো মুখ চেপে ধরছিল। হাতে স্ট্যাপলার ছিল। শিশুটি কখনো কাঁদছিল, কখনো অস্থির হচ্ছিল। ওই নারী শিশুর হাত ধরে আটকে রাখছিল। একপর্যায়ে শিশুটি ওই নারীর শাড়িতে থুতু ফেললে পুরুষটি শিশুর মাথায় ঝাঁকি দেন। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, নারীটি শারমিন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান এবং পুরুষটি স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার। পুলিশ জানিয়েছে, তারা স্বামী-স্ত্রী। শিশু শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের ভিডিও দেখে অনেকেই মন্তব্য করেন, পবিত্র কুমার হায়নার মতো ছিলেন, আর তার স্ত্রী মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে নিপীড়ন লুকিয়েছেন। ঘটনার পর শিশুর মা-বাবা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শিশুটি বারবার বলছিল, গলায় পাড়া দেবে, ঘটনার বিষয় কাউকে বললে মুখ সেলাই করে দেবে। আমি আর স্কুলে যাব না।’ বাচ্চা এখনো ট্রমার মধ্যে। তারা ভয় পাচ্ছেন স্কুলে পাঠাতে। নানা বাড়িতে চলে গেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে গত বৃহস্পতিবার পল্টন থানায় মামলা দায়ের করা হয়। শিশুনির্যাতনের মামলায় গ্রেপ্তার হন স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার বড়ুয়া। শিশুর বাবা-মা আরও জানিয়েছেন, ১১টায় ক্লাস ও বেলা একটায় ছুটি হয়। সেই দিন মা স্কুলে গিয়েছিলেন এবং দেখলেন ছেলে বিষণ্ণ। প্রধান শিক্ষককে জানালে তিনি বলেন, শিশুটি শিক্ষকের গায়ে লাথি দিয়েছে, থুতু দিয়েছে। এজন্য হালকা করে চড় দিয়েছেন। বাড়ি ফিরে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে মা-বাবা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেন। পরদিন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে স্কুলে গেলে প্রধান শিক্ষক নির্যাতনের কথা স্বীকার করেন এবং ক্ষমা চান। কিন্তু একপর্যায়ে পবিত্র কুমার মারমুখী হয়ে ওঠেন এবং অভিযোগ করে হুমকি দেন। অনেকেই কমেন্ট বক্সে লিখেছেন, একটি শিশুর ওপর এমন নিষ্ঠুরতার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরও কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিল না? কেন মামলার জন্য অপেক্ষা করতে হলো? অপরাধ যখন চোখের সামনে, প্রমাণ সবার সামনে, তখন তাৎক্ষণিকভাবে স্কুলে গিয়ে দোষী ব্যক্তিকে আটক করা হলো না কেন? এই ঘটনা শুধু একটি শিশুর ওপর নির্যাতনের নয়, এটি সমাজের বিবেককেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা কি আদৌ নিশ্চিত? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কি এখনো নিরাপদ আশ্রয়? দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে এমন ঘটনা বারবার ঘটতে পারে, এ আশঙ্কা মানুষের কণ্ঠে, চোখে এবং হৃদয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
