কিশোরগঞ্জে গত কয়েক দিনের তীব্র তাপদাহে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারছে না সাধারণ মানুষ। স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা করছে শহরের ফুটপাথের বিভিন্ন শরবতের দোকানে। গরম থেকে কিছুটা প্রশান্তি পেতে স্বল্প আয়ের মানুষসহ অন্যান্যরাও এসব শরবতে ঝুঁকে পড়ছে। ক্ষতিকর নানা উপাদান দিয়ে তৈরি মুখরোচক শরবত যে স্বাস্থ্যসম্মত নয়, তা বেশিরভাগ মানুষই জানে না। তাই যেখানে-সেখানে গড়ে ওঠা কিংবা ফুটপাথের দোকান থেকে শরবত পানের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন তারা।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা শহরের বড়বাজার তেরীপট্টিস্থ রাস্তায় আখের রস বিক্রি করছে। মেশিনে আখ পিষে রস বের করে গ্লাস ভরে দিচ্ছে ক্রেতাদের। পরম তৃপ্তি নিয়ে নিমিষে গলাধকরণ করছে রস। কেউ নিচ্ছে আরও এক গ্লাস। রসের জন্য দোকানের চারপাশে অপেক্ষা করছেন আরও অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা শহরের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ রস বিক্রেতারা প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আখের রস বিক্রি করেন। গরমের কারণে রসের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। যে পরিমাণ আখ নিয়ে আসেন, সব বিক্রি হয়ে যায়। প্রতি গ্লাস আখের রস ২০ টাকা করে বিক্রি করা হচ্ছে।
তীব্র গরমে জনজীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। খেটে খাওয়া মানুষ পড়েছে চরম বিপাকে। সন্ধ্যার পর তাপমাত্রা কিছুটা কমে এলে বাজার-ঘাটে লোকসমাগম বাড়ে। এ সময় পানির চাহিদা পূরণে আখের রস পান করতে দেখা যায় সাধারণ মানুষকে। বরফকুচি দিয়ে ঠান্ডা আখের রসে প্রশান্তি খোঁজে গরমে হাঁসফাঁস করতে থাকা সাধারণ মানুষ। আখের রস বিক্রেতা তাজুল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন ধরে বিক্রি বেড়েছে। তাপমাত্রা বেশি কিশোরগঞ্জ শহরে গরমের তীব্রতায় বেড়েছে শরবতের দোকান। বেড়েছে আখের রসের চাহিদা। প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টায় এক থেকে দেড়শ গ্লাস রস বিক্রি হচ্ছে। শ্রমজীবীরা গরমে রস বেশি পান করে থাকেন। অনেকে আবার বোতল করে রস বাড়ি নিয়ে যান। এ ছাড়া গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরবতের চাহিদা বাড়ায় কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন সড়কেও গড়ে উঠেছে ভ্রাম্যমাণ শরবতের দোকান। দিন দিন সেই সংখ্যা বাড়ছে। তৃষ্ণা মেটাতে এসব দোকানে বেশি ভিড় করছেন রিকশাচালক, দিনমজুর ও পথচারীরা।
বিক্রেতারা জানান, গত কয়েক দিনের তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এ সময় আখের রস, লেবুর শরবতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া রয়েছে ইসবগুলের ভুসি, অরেঞ্জ পাউডার, বেল, পেঁপে, মাল্টা, শাহিদানা ও উলটকম্বলের শরবত। তাপমাত্রা বেশি থাকায় আখের রস বেশি বিক্রি হচ্ছে। গুরুদয়াল কলেজের শিক্ষার্থী ফারিয়া জেরিন মৌ বলেন, গরমে শরীরে ঘাম ঝড়ছে। জ্যামের কারণে রিকশা থেকে হেঁটে এসেছি। হাঁটতে হাঁটতে লেবুর শরবত এবং এক গ্লাস আখের রস পান করেছি। রিকশাচালক মন্তাজ আলী বলেন, ‘গরমের কারণে শইল খালি ঘামে, গলা শুকায়া যায়তাছে। ঠিকমতো রিকশা চালাইতে পারতাছিনা। একবার ভাড়া মারলে অনেক সময় জিরাইতে হয় সকাল ৯টায় রিকশা নিয়ে বের হইছি। অহন পন্ত সাত গ্লাস শরবত খাইছি।’
শরবত বিক্রেতা শহিদুল ইসলাম বলেন, 'গরমের সঙ্গে সঙ্গে এখন শরবতের দোকানও বেড়েছে। আগে এই এলাকাতেই দুই-তিনটি দোকান ছিল। এখন অন্তত ১০ থেকে ১২টি দোকান আছে। গরম বাড়ার সঙ্গে মানুষের শরবত পানের চাহিদাও বেড়েছে। তাই দোকানও বেড়েছে। তবে বেচাকেনা কমেনি, বেচাকেনাও বেড়েছে।'
শরবতের দাম ও উপকারের বিষয়ে তিনি বলেন, 'আগে পাঁচ টাকা প্রতি গ্লাস লেবুর শরবত বিক্রি করেছি। এখন ১৫ টাকা রাখি। সবকিছুর দাম বেড়েছে। প্রতি জার পানি ৫০ টাকা করে কিনতে হয়। এ ছাড়া বরফ, লেবু, চিনি এসবের দামও আছে। দিনে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকার শরবত বিক্রি হয়। ফুটপাথে বসার জন্য চাঁদা ও অন্যান্য খরচ বাদে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা লাভ থাকে। তবে গতবারের তুলনায় এবার লাভ কম হচ্ছে। কারণ দোকানের সংখ্যা বেড়েছে।'
ফুটপাথের মুখরোচক শরবতের বিষয়ে করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রিয়াদ শাহেদ রনি বলেন, ‘পথেঘাটে খাবার না খাওয়া ভালো। রাস্তার পাশে এসব খাবার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুত হয়। এগুলো খেলে ডায়রিয়া, আমাশয় ও জন্ডিসের জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়াবে এ ধরনের শরবত বা পানীয়। তিনি আরও বলেন, ক্লান্ত হয়ে ফুটপাথের দোকান থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানীয় পান করলেন। কিছুদিন পর হঠাৎ খেয়াল করলেন, আপনার চোখ কিংবা প্রস্রাব হলুদ বর্ণের হয়ে গেল। সঙ্গে তীব্র বমি ও পেটে ব্যথা। এ খাবারগুলোতে বিশুদ্ধ পানিও ব্যবহার করা হয় না। আবার একই গ্লাসে অনেকে পান করেন। সাময়িক তৃপ্তি দিলেও এসব শরবত ও পানীয় এড়িয়ে চলা উচিত।’