ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বুধবার ৬ মে ২০২৬ ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩
জেনে নিন কেন খুলনা বিভাগে আগুনের হলকা
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Sunday, 21 April, 2024, 9:43 AM

জেনে নিন কেন খুলনা বিভাগে আগুনের হলকা

জেনে নিন কেন খুলনা বিভাগে আগুনের হলকা

সপ্তাহখানেক ধরেই খুলনা বিভাগের ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে এই বিভাগের যশোর ও চুয়াডাঙ্গায় এ মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করছে। প্রতিদিনই তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি করে বাড়ছে। এখন সেখানে বইছে আগুনের হলকা। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীত ও গ্রীষ্মে ভূমিকা রাখা মহাদেশীয় বায়ুপ্রবাহের প্রবেশদ্বার  যশোর ও চুয়াডাঙ্গার কাছাকাছি এলাকাগুলো। গরমের সময় ভারতের গুজরাট বা অন্যান্য এলাকায় সৃষ্টি হওয়া তপ্ত হাওয়া নানা পথ পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে ঢোকে মূলত এই দুই জেলা দিয়ে। ফলে ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এখানে গরম ও শীত তীব্র হয়।

শনিবার ২০ এপ্রিল যশোরে তাপমাত্রা আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আর চুয়াডাঙ্গায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

সপ্তাহখানেক ধরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায়। 

শুধু গরম নয়, শীতকালেও দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকে এ জেলায়। দেশে প্রচণ্ড শীত পড়ে এমন তিনটি স্থানের একটি চুয়াডাঙ্গা। প্রায় অভিন্ন অবস্থা পার্শ্ববর্তী যশোরের। আবহাওয়াবিদ ও ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, ভূপ্রাকৃতিক কিছু কারণেই এ ঘটনা ঘটে। সঙ্গে আছে ভৌগোলিক অবস্থান।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, উত্তর গোলার্ধ থেকে আসা শীতল বায়ু বাংলাদেশ বা এ অঞ্চলে সোজা হয়ে ঢুকতে পারে না। এ বায়ুর একটি অংশ কাশ্মীর, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের একাংশ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। গরমের দিনে দিল্লির তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে কমতে কমতে বাংলাদেশে আসতে থাকে। আবার শীতকালে দিল্লির অতি শীত ধীরে ধীরে কমতে কমতে বাংলাদেশে আসে। শীতের সময় এই উত্তরের হাওয়া বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশ চুয়াডাঙ্গা ও যশোর দিয়ে প্রবেশ করে।

বজলুর রশীদ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, শীত ও গ্রীষ্মে ভূমিকা রাখা মহাদেশীয় বায়ুপ্রবাহের প্রবেশদ্বার চুয়াডাঙ্গা এবং এর কাছাকাছি এলাকাগুলো। গরমের সময় ভারতের গুজরাট বা এসব এলাকায় সৃষ্টি হওয়া তপ্ত হাওয়া নানা পথ পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। আর তা আসে চুয়াডাঙ্গার প্রান্ত দিয়ে।

স্থানীয় ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে চুয়াডাঙ্গা ও যশোরে গরম ও শীত তীব্র– এমনটা ধারণা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা। তিনি বলেন, এ এলাকায় জলাভূমি অপেক্ষাকৃত কম। জলাভূমি বেশি থাকলে শীতকালে তা শীত ধারণ করে ঠান্ডা কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এ জনপদে তা হয় না। এ কারণে শীত দীর্ঘায়িত হয়। আবার গরমের সময় জলাভূমির স্বল্পতার জন্য আর্দ্রতা ধরে রাখা যায় না। ফলে গরম বাড়ে।

চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার হাটকালুগঞ্জে অবস্থিত প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়া পর্যবেক্ষক রাকিবুল হাসানের দাবি, কর্কটক্রান্তি রেখার খুব কাছাকাছি অবস্থানে আছে চুয়াডাঙ্গা। মূলত, ভৌগোলিক কারণেই এ জেলায় শীত মৌসুমে তীব্র শীত ও গরমকালে তীব্র গরম হয়।

যশোরে দুর্বিষহ জীবন
এদিকে প্রচণ্ড গরমে দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে যশোরের সাধারণ মানুষের জীবন। শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন চরম ভোগান্তিতে। প্রচণ্ড গরমে গলে গেছে শহরের বেশ কয়েকটি পিচঢালা সড়ক। এরই মধ্যে প্রখর রোদ উপেক্ষা করেই যাত্রী বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন রিকশাচালকরা। 

সূর্যের তাপ এতই বেশি, খোলা আকাশের নিচে হাঁটলেও গরম বাতাস লাগছে চোখেমুখে। যাত্রাপথে ছাতা মাথায় দিয়ে তাপ থেকে রক্ষা পেতে চেষ্টা করছেন অনেকেই। স্বস্তি পেতে শ্রমজীবী মানুষ রাস্তার পাশে জিরিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ হাতে-মুখে পানি দিয়ে ঠান্ডা হওয়ার চেষ্টা করছেন। আর শিশু-কিশোররা গরম থেকে রেহাই পেতে মাতছে জলকেলিতে।

রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন শওকত আলী। তিনি বলেন, তীব্র গরমের কারণে রিকশা চালাতে কষ্ট হচ্ছে। এত গরম, মাথা ঘুরাচ্ছে, কিন্তু রিকশা না চালালে তো সংসার চলবে না।

যশোর শহরের রিকশাচালক মফিজুর রহমান বলছেন, মানুষ বাইরে কম বের হচ্ছে। যারা বাইরে আসছে, গরমের সঙ্গে তাদেরও মেজাজ গরম থাকছে। মানুষের সঙ্গে ভালো করে কথা বলা যাচ্ছে না। এদিকে, গরমে পরিবহনে চলাচল করা যাত্রীরাও নিদারুণ কষ্টে যাতায়াত করছেন।

শহরের শংকরপুর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, বাসার ছাদের রিজার্ভ ট্যাঙ্কের পানি অনেক গরম হয়ে যাচ্ছে। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল পর্যন্ত পানিতে হাত দেওয়া যাচ্ছে না।  শহরে শরবত বিক্রেতা কালাম হোসেন জানান, গরম বাড়ায় তাঁর বিক্রি বেড়েছে। মানুষ পিপাসা মেটাতে ও একটু স্বস্তি নিতে ঠান্ডা লেবুর শরবত পান করছেন। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, এ তাপদাহ আরও কিছুদিন বিরাজ করবে। বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেশি হওয়ায় অস্বস্তি বাড়বে।

এদিকে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে পানি সংকটে পড়েছে শহরের বাসিন্দা। তারা বলছেন, টিউবওয়েল অকেজ হয়ে পড়ে আছে, পানি পাওয়া যাচ্ছে না। 

গ্রিন ওয়ার্ল্ড এনভায়রনমেন্ট ফাউন্ডেশন যশোরের নির্বাহী পরিচালক আশিক মাহমুদ সবুজ বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে যশোরে। পুকুর-জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিতভাবে গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপনের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাই দ্রুত জলাধার সংরক্ষণ বাস্তবায়ন আইন পাস না করলে ভবিষ্যতে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করবে।  

চুয়াডাঙ্গায় স্থবিরতা
কয়েক দিন ধরে চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে বয়ে চলা তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। তীব্র তাপদাহে এ জেলার খেটে খাওয়া মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। তীব্র গরম ও রোদের তাপের কারণে শ্রমিক, দিনমজুর, ভ্যান-রিকশাচালকরা কাজ করতে না পেরে অলস সময়ও পার করছেন। হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

জেলার দামুড়হুদায় হিট স্ট্রোকে জাকির হোসেন (৩০) নামের যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে  কৌশল নির্ধারণে আজ রোববার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক জরুরি সভা ডাকা হয়েছে।

আলমডাঙ্গা উপজেলায় তীব্র তাপে পানির স্তর কমে যাওয়ায় কিছু কিছু নলকূপে পানি মিলছে না। প্রচণ্ড গরমে আবাদি জমিতে ধান ও সবজি ক্ষেত শুকিয়ে যাচ্ছে। তীব্র গরমে চিটা পড়ে বিপুল ধান নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা কৃষকদের।

চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন সমকালকে বলেন, জেলায় অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বইছে। তিনি আরও বলেন, পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর ওপর দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা চলে গেছে। চুয়াডাঙ্গা পাশাপাশি হওয়ায় জেলাতে বেশি গরম পড়ছে। এ ছাড়া ঈশ্বরদীর পাশ দিয়ে দেশের বৃহত্তম পদ্মা নদী বয়ে গেছে। তবে চুয়াডাঙ্গায় উল্লেখযোগ্য তেমন নদী নেই, যা আছে তাও মৃতপ্রায়। বেশি নদী ও নদীতে পানি থাকলে এমন অবস্থা হতো না।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রাত ৮টা থেকে শনিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ডায়রিয়াজনিত ৪৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। প্রচণ্ড গরমের কারণে প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। 

জীবননগর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে ভূগর্ভের পানির স্তর নেমে গেছে। এর আগে দুই বিঘা ভুট্টা জমিতে মোটর দিয়ে সেচ দিতে ৩ ঘণ্টা সময় লাগত। এখন ওই জমিতে ৬ ঘণ্টা সময় লাগছে। খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হবে। 

আলমডাঙ্গার কালিদাসপুর ইউনিয়নের ডম্বলপুর গ্রামের কৃষক ফাহিম ফয়সাল জানান, মাঠে সাড়ে ৬ বিঘা আগাম বোরো ধান চাষ করে বিপাকে পড়েছেন তিনি। ধান পেকে গেছে এক সপ্তাহ আগেই। তাপদাহে তিনি শ্রমিক খুঁজে পাচ্ছেন না। এতে মাঠেই ঝরে পড়ছে ধান। বেশি টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি ব্যাপক লোকসানের সম্মুখীন হওয়ার শঙ্কাও প্রকাশ করেন। 

শহরের ফার্মপাড়ার রাজমিস্ত্রি রনি মিয়া বলেন, তিন দিন কাজ করছি না। এত গরমে কাজ করে মরব নাকি? আগে পানিটানি খেয়ে বেঁচে থাকি। তার পর কাজের চিন্তা করব। 

চুয়াডাঙ্গা শহরের নিউমার্কেট ও বড় বাজারের কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানুষজন চলাফেরা করছে একেবারই কম। নিউমার্কেটের গার্মেন্ট ব্যবসায়ী কাজল চক্রবর্তী বলেন,  মানুষ নেই, বেচাকেনা হবে কীভাবে? 

চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার বেলগাছি গ্রামের কৃষক রজব আলী বলেন, আমার ৫ বিঘা জমিতে পেঁপে চাষ আছে। প্রতিদিনই পানি দিতে হচ্ছে। তবে বাঁচাতে পারব বলে মনে হচ্ছে না।  বৃষ্টি খুব দরকার। 

চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক কিসিঞ্জার চাকমা বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা মানুষকে সচেতন করছি। স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ীও চলতে বলছি। এ বিষয়ে জেলা সদরসহ চারটি উপজেলাতেই প্রচারণা চলছে। অসহায় হতদরিদ্রদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। রোববার জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় পরবর্তী কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হবে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status