‘আমি ঘুম থাইকা উইঠা কী শুনলাম? আমার পোলার দোকানডা পুইড়া ছাই হয়ে গেছে। জীবনে যা কামাই করছিল, সব শ্যাষ হইয়া গেল। আমরা এখন কেমনে চলব?’ গতকাল শনিবার আগুনে পুড়ে যাওয়া নিউ সুপার মার্কেটের পাশে ফুট ওভারব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে কেঁদে এ কথাগুলো বলছিলেন আলেয়া বেগম। মার্কেটটির তৃতীয় তলায় তাঁর ছেলে হারুনুর রশীদের দোকান। সকালে খবর পেয়েই পুরান ঢাকার রায়সাহেববাজার এলাকার বাড়ি থেকে তিনি ছুটে এসে দেখেন যে তিনতলা ভবনের মার্কেটটির তৃতীয় তলা থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। খবর কালের কণ্ঠ
ফুট ওভারব্রিজে রাখা একটি সিলিন্ডারের ওপর বসে ছিলেন আরাফাত নামের এক যুবক। মার্কেটটির তৃতীয় তলায় ১৭৬ নম্বর তামিম এন্টারপ্রাইজ নামের দোকানটি তাঁর ভাই তামিমের। সকাল ৯টার দিকে এসে তিনি দেখতে পান যে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পানি দিচ্ছেন ভেতরে। তিনি ভাইয়ের দোকানের প্যান্ট-শার্ট বের করার জন্য ভেতরে ঢুকে যান। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরই তাঁর দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। অসুস্থ হয়ে তিনি ফিরে আসেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘ঋণ করে এত মালপত্র উঠিয়েছিল আমার ভাই। সব শেষ, সব শেষ।’
রুমা আক্তার নামের এক নারী শোকে প্রায় অচেতন হয়ে পড়ছিলেন। তাঁকে আরেক নারী হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন। পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে রুমা জানান, মাত্র দেড় মাস আগে তিনি এই মার্কেটে ড্রিম লেডিস আন্ডারগার্মেন্ট শপ নামের একটি দোকান দিয়েছিলেন। আগুন থেকে অল্প কিছু মাল রক্ষা করতে পারলেও বাকি সব পুড়ে ছাই। ঋণ নিয়ে এবং কিছু টাকা ক্যাশ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি। তাঁর দোকানে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মাল ছিল।
রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকার নিউ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় গতকাল শনিবার ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে আগুন লাগে। তিন মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট সেখানে পৌঁছে। ততক্ষণে আগুন ছড়াতে থাকে। সবশেষে মোট ২৮টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়। দুর্ঘটনাস্থলে আসে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকরা। আগুন নেভাতে গিয়ে ধোঁয়ায় একের পর এক ফায়ারকর্মীকে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখা যায়। বেশি অসুস্থ হয়ে পড়া কর্মীদের পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। অন্যরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে আবারও অক্সিজেন সিলিন্ডার কাঁধে চাপিয়ে আগুন নেভাতে লেগে যান। সাড়ে তিন ঘণ্টার চেষ্টায় ৯টা ১০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে তবে বিকেল পর্যন্তও ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ছাদ ফুটো করেও পানি দেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ারের তিনজন কর্মকর্তা, ২১ জন ফাইটার, দুজন স্বেচ্ছাসেবক, দুজন আনসার সদস্য, স্কাউট একজন এবং বিমানবাহিনীর একজন সার্জেন্টসহ ৩০ জন অসুস্থ হয়েছেন। তবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, ব্যবসায়ীসহ ৩৭ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, পুরো মার্কেটটিতে এক হাজার ২০০-র মতো দোকান আছে। দ্বিতীয় তলায় এসি মার্কেট। তৃতীয় তলায় তিন শতাধিক দোকান ছিল। এখানে শার্ট ও প্যান্টের দোকানই বেশি। ঈদ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার গভীর রাত পর্যন্ত মালপত্র বিক্রি করে টাকা দোকানের ক্যাশবাক্সেই রেখেছিলেন বেশির ভাগ ব্যবসায়ী। শুক্রবার এবং গতকাল শনিবারের মালপত্র বিক্রির টাকা একসঙ্গে করে রবিবার ব্যাংকে জমা দেওয়ার চিন্তা ছিল তাঁদের। এর আগেই অগ্নিকাণ্ডে তাঁদের নগদ টাকাও শেষ।
সুলতান ফ্যাশনের মালিক মো. মাসুম মিয়া বলেন, ‘আমি ঈদ উপলক্ষে ২৭ লাখ টাকার মাল উঠিয়েছি। গত তিন দিনের বিক্রির সাত লাখ টাকা ছিল ক্যাশে। সব শেষ।’ ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, অন্তত ৫০ কোটি টাকার মালপত্র পুড়ে ছাই হয়েছে।
‘মার্কেটটির ফায়ার সেফটি সিস্টেম অত্যন্ত দুর্বল ছিল’
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. রেজাউল করিম গত রাতে জানান, সারারাত উদ্ধার কার্যক্রম চলবে। ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট সম্মিলিতভাবে সারারাত এখানে কাজ করবে। তিনি বলেন, মার্কেটটির ফায়ার সেফটি সিস্টেম অত্যন্ত দুর্বল ছিল। ব্যবসায়ীরা সিটি কর্পোরেশন থেকে একটি দোকান বরাদ্দ নিয়ে করিডোরে আরও দুই-তিনটি সাব দোকান দিয়েছিলেন। যার কারণে করিডোরগুলো খুবই সংকীর্ণ হয়ে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে কাপড়ের মাধ্যমে আগুন ছড়িয়েছে। এছাড়া মার্কেটের ফলস ছাদ, উপরে প্লাস্টিক আইটেম ও ব্যানার-পোস্টারের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এসব ব্যানার-পেস্টুনের বিষয়ে আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার। এগুলো পরিহার করার সময় এসেছে।
তিনি আরো বলেন, ‘আগুন এখনো পুরোপুরি নির্বাপণ করা যায়নি। মার্কেটের ভেতরের সবগুলো দোকানের সাটার আটকানো ছিল। যার ফলে দোকানের ভেতরের জামা-কাপড় বা ফেব্রিক্সগুলো এখন মোল্ডারিং অ্যাফেক্ট হচ্ছে। অর্থাৎ, তুষের আগুনের মতো কাপড়গুলো জ্বলছে। তাই আমরা প্রতিটি দোকানের সাটার খুলে খুলে পরীক্ষা করছি এবং পানি দিয়ে আগুন নির্বাপণ করছি।’
আগুনের সূত্রপাত নিয়ে যা বললেন ব্যবসায়ীরা : ভোররাতে সিটি করপোরেশনের লোকজন গাউছিয়া মার্কেট থেকে নিউ মার্কেট ও নিউ সুপার মার্কেটে যাওয়ার ফুট ওভারব্রিজ ভাঙতে আসেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা। নিউ সুপার মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের লোক রাত ৩টার দিকে ব্রিজ ভাঙার কাজ করছিলেন। ব্রিজের ওখানে আমাদের কারেন্টের লাইন আছে, সেটা তাঁরা খেয়াল করেননি। ওই লাইনের ওপর বুলডোজার চালানোর সময়ই আগুনের সূত্রপাত।’
নিউ সুপার মার্কেট বণিক সমিতির সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের জানিয়েছেন, তাঁরা সিটি করপোরেশনের লোকদের অনেকবার নিষেধ করেন এবং কাজ শুরু করলে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে নিতে বলেন, কিন্তু করপোরেশনের লোকজন কারো কথা না শুনে সিঁড়ি ভাঙা শুরু করেন। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই হঠাৎ মার্কেটের নিচতলা ও তিনতলায় বিকট শব্দ হয় এবং ধোঁয়া বের হতে থাকে।
যা বলল দক্ষিণ সিটি করপোরেশন : ফুট ওভারব্রিজের সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণে করপোরেশন থেকে নেওয়া উদ্যোগকে অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে মনে করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। গতকাল করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিউ মার্কেটের সঙ্গে সংযুক্ত পদচারী সেতুটি গত বছর ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। তখন সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে লোকজন চলাচল করছিল, যা অত্যন্ত অনিরাপদ। এ অবস্থায় দাপ্তরিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গত ১২ এপ্রিল সেই সেতুর সঙ্গে মার্কেটের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত রাতে (২টা থেকে ভোর ৫টা ১৫ মিনিটের মধ্যে) সেতুর সঙ্গে মার্কেটের দ্বিতীয় তলার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এদিকে ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে মার্কেটে আগুন লাগে বলে গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। সুতরাং অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের সময় থেকে আধাঘণ্টারও বেশি আগে শেষ হয় সেতুর সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ কার্যক্রম। তা ছাড়া সেতু বিচ্ছিন্নকরণের স্থান থেকে ৪০০ ফুটেরও বেশি দূরত্বে আগুন লেগেছে। সেতু বিচ্ছিন্নকরণে কোনো গ্যাস কাটার ব্যবহার করেনি। হুইল এক্সকাভেটর ব্যবহার করে সেতু বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ ছাড়া সেতুর সঙ্গে মার্কেটের সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণের আগেই সেতুর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।
সরেজমিনে গিয়ে যা জানা যায় : সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ফায়ার সার্ভিসের ২৮টি ইউনিট মার্কেটটির তৃতীয় তলায় পানি দিচ্ছে। এতে নিচে পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। তৃতীয় তলা থেকে আগুন দ্বিতীয় ও নিচতলায় ছড়াতে পারেনি। দোতলা ও নিচতলার ব্যবসায়ীদের মালপত্র না পুড়লেও পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোতলা ও নিচতলায় থাকা দোকানগুলো থেকে মালপত্র সরিয়ে নিতে দেখা যায় অনেককে।
সব বিষয় মাথায় নিয়ে তদন্ত করা হবে : সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে আমরা সব বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করব। এগুলো নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।’
মার্কেট করতে এসে বিপাকে : রায়েরবাগ এলাকা থেকে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শাহীন উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে এসেছিলেন নিউ মার্কেট ও গাউছিয়ায় ঈদের বাজার করতে। শাহীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সকালে টিভি দেখা হয়নি। জানতাম না যে আগুন লেগেছে। সব সময় ঈদের মার্কেট করি এখান থেকেই। তাই এবারও এসেছিলাম।’
দুপুরের পর থেকে গাউছিয়া মার্কেটের পাশের মার্কেটগুলোর দোকানিদের দোকানগুলো ধীরে ধীরে খুলতে দেখা যায়। তবে নিউ মার্কেটের ফুট ওভারব্রিজের ওপরে ও নিচে এবং পাশের ফুটপাতে যে জুতার দোকান, চুড়ি, কসমেটিকসসহ নানা ধরনের দোকান বন্ধ রাখতে দেখা যায়। ফুট ওভারব্রিজের নিচে জুতার দোকানগুলোতে কয়েকজন দুপুর ১২টার দিকে শুয়ে ছিলেন। সোহাগ নামের এক দোকানি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জানি না, দোকান খোলার পারমিশন পামু কি না। কী করুম, রোজার দিন শুইয়া সময় কাটাইতাছি।’
খাওয়ার পানি-শরবত নিয়ে পাশে : দুপুর ১২টার দিকে উদ্ধারকারী দল, সাংবাদিকসহ সবাই গরমে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। এ সময় আমিনুল নামের একজনকে ঠাণ্ডা পানির বোতল নিয়ে আসতে দেখা যায়। তিনি বলতে থাকেন, ‘যাঁদের পানি তেষ্টা পেয়েছে খেতে পারেন। পয়সা লাগবে না।’ জানতে চাইলে দরিদ্র শ্রেণির আমিনুল কালের কণ্ঠকে বলেন, “আমারে নিচে একজন ভদ্রলোক এই পানির বোতল দিয়া কইছে, ‘যার যা পানি লাগে আপনি দেন।’”
কিছুক্ষণ পর দেখা যায়, ফাহমিদা আক্তার পলি নামের এক কলেজছাত্রী একটি বড় বোতলে করে শরবত নিয়ে এসেছেন। তিনি আসেন গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্স কলেজের হল থেকে। তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময়ই অসুস্থ হয়ে পড়া এক ফায়ারফাইটারকে ফুট ওভারব্রিজের মাঝামাঝি জায়গায় নিয়ে আসেন সহকর্মীরা। ওই ছাত্রী তখন তাঁর আনা শরবত ওই সদস্যকে খাওয়ান।