প্রশ্ন ফাঁসে তদন্তের আওতায় জালিয়াতি করে চাকরি পাওয়া ব্যাংকাররা
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Saturday, 13 November, 2021, 10:43 AM
প্রশ্ন ফাঁসে তদন্তের আওতায় জালিয়াতি করে চাকরি পাওয়া ব্যাংকাররা
রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ব্যাংকের বাতিল হওয়া সমন্বিত নিয়োগ পরীক্ষাসহ গত তিন বছরে চারটি নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতিতে গ্রেপ্তারকৃত আটজন ছাড়াও ১৫ জন জড়িত আছেন। আরো অন্তত তিনজন ব্যাংকার আছেন এই চক্রে। তাঁরা কয়েক শ চাকরিপ্রার্থীর কাছে প্রশ্ন ও উত্তর বিক্রি করেছেন। প্রশ্ন ফাঁসের জালিয়াতিতে চাকরি পেয়েছেন এমন অনেকের ব্যাপারে তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
গ্রেপ্তার পাঁচ ব্যাংকারসহ আটজনকে জিজ্ঞাসাবাদে এমনই তদন্ত পেয়েছেন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তারা। আসামিদের মধ্যে তিন ব্যাংকারসহ ছয়জনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি করে সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মতো ব্যাংকে চাকরি পাওয়া ব্যক্তিদেরও তদন্তের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে জালিয়াতিতে জড়িতদের গ্রেপ্তারেও অভিযান চলছে।
ডিবি তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহাদত হোসেন সুমা বলেন, ‘৬ নভেম্বর ব্যাংকে নিয়োগ পরীক্ষার দিন সকালে স্থাপন করা বুথে আরো ১৫ জন চাকরিপ্রত্যাশীকে এমসিকিউ পদ্ধতির প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করিয়েছিলেন। তাঁদের নাম-ঠিকানা পাওয়া গেছে। এখন তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’
গত বুধবার পর্যন্ত তিন বাংকারসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। বুধবার রাতে জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার এমদাদুল হক খোকন, সোহেল রানা এবং ঢাকা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী আব্দুল্লাহ আল জাবের ওরফে জাহিদকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। আদালতের নির্দেশে জনতা ব্যাংকের গুলশান শাখার কর্মকর্তা শামসুল হক শ্যামল, আহছানউল্লার কর্মী রয়েল এবং পূবালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান মিলনকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার খোকন, সোহেল ও জাহিদের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
ডিবির সূত্র জানায়, জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা সোহেল নিজেই প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে চাকরি নেন। এরপর সহকর্মী শ্যামলের সঙ্গে চক্র গড়ে তোলেন। শ্যামলই পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তা মিলনকে অপকর্মে জড়ান। এভাবে গ্রেপ্তার পাঁচ ব্যাংকার ছাড়াও আরো তিন-চারজন ব্যাংকার জালিয়াতিতে জড়িয়েছেন। আরো কিছু ব্যাংকার আছেন, যাঁরা নিজেরা চাকরি পেয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের সংযুক্ত করে দিয়ে কমিশন পেয়েছেন। তাঁদেরও তদন্তের আওতায় আনা হবে।
তদন্তকারীরা বলছেন, জালিয়াতিতে জড়িতদের মধ্যে প্রশ্ন ফাঁস করে উত্তর তৈরি করা কয়েকজন ছাড়া বাকিরা একে অপরকে চেনেন না। ছদ্মনামে অনলাইনে কাটআউট পদ্ধতিতে কারবার করেছেন তাঁরা। টাকা পেলেই অনলাইনে প্রশ্ন দিয়েছেন। এরপর বুথে উত্তরগুলোকে মুখস্থ করানোর ব্যবস্থা করেছেন সহযোগীরা।
সূত্র মতে, উত্তর বিক্রেতা ব্যাংকার চক্রের হাতে প্রশ্ন দিয়েছেন আহছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির আইসিটি সেন্টারের টেকনিশিয়ান (হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার) মোক্তারুজ্জামান রয়েল। তিনি জিজ্ঞাসাবাদে ডিবিকে জানান, এ পর্যন্ত তিনটি প্রশ্ন ফাঁস করতে পেরেছেন। জনতা ব্যাংকের এইও পদে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস করায় জড়িত তিনি। রূপালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার নিয়োগের প্রশ্নও ফাঁস করেন। সর্বশেষ গত ৬ নভেম্বরের পাঁচ ব্যাংকের অফিসার (ক্যাশ) পদেরটিও পেয়েছেন তিনি। ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট পারভেজ মিয়া ও অফিস সহায়ক দেলোয়ার হোসেন তাঁর হাতে এগুলো দিয়েছেন।
আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে জানান, প্রশ্ন ফাঁসের পর ব্যাংকারসহ একটি সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তারা প্রশ্ন না দিয়ে চুক্তির বিনিময়ে ৮৫টি উত্তর দিয়েছে।
সূত্র জানায়, টেন্ডারের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা আহছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির তিন কর্মী ছাড়া আরো কেউ চক্রে জড়িত আছে কি না সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ মেলায় গত বৃহস্পতিবার রাতে ৬ নভেম্বরের রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ব্যাংকের সমন্বিত নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরীক্ষার পরবর্তী তারিখ ও সময়সূচি বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকের দুই পদের লিখিত পরীক্ষাও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।