ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বৃহস্পতিবার ২৫ জুন ২০২৬ ১১ আষাঢ় ১৪৩৩
দুলাভাই শালিকে ইরাকে বিক্রি করে দিয়েছে
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Saturday, 17 July, 2021, 6:25 PM

দুলাভাই শালিকে ইরাকে বিক্রি করে দিয়েছে

দুলাভাই শালিকে ইরাকে বিক্রি করে দিয়েছে

আসমাকে (ছদ্ম নাম) বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব দেন দুলাভাই রুহুল আমিন মুন্নু। আকর্ষণীয় বেতনের লোভে পড়ে রাজিও হয়ে যান আসমা। এর পর সব ঠিকঠাক হলে বিমানে করে তাকে পাঠানো হয় দুবাই। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইরাকে। দেশটিতে পৌঁছার পর আসমাকে জানানো হয়, ‘ক্রীতদাসী’ হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে তাকে। এখন তাদের কথামতো চলতে হবে। অবাধ্য হলেই শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। প্রচুর কাজ করালেও ঠিক মতো খেতে দেওয়া হতো না। দিনের পর দিন এভাবেই চলছিল। এর মধ্যে আসমা কোনো রকম একটি ফোন জোগাড় করে স্বজনদের কল দেন। জানান, তাকে দেশে ফিরিয়ে না নিলে মারা যাবেন তিনি।

ক্রীতদাসী হিসেবে আসমাকে বিদেশে বিক্রি করে দেওয়া চক্রের মূলহোতা মো. মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে মোস্তফা, যিনি আবার জাতীয় পার্টির (জাপা) কেন্দ্রীয় নেতা। এ ঘটনায় গত ৫ জুলাই মোস্তফা ও রুহুল আমিনকে আসামি করে রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা করেছে নির্যাতিতার পরিবার। ওই দিনই মামলার প্রধান আসামি মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৩। তবে এখনো পলাতক রয়েছে আসমার দুলাভাই রুহুল আমিন। র‌্যাব বলছে, মোস্তাফিজুর রহমান আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা।

নির্যাতিতার পরিবার জানায়, আসমার বাবার নিজের বাড়ি ছিল ঢাকার লালবাগ এলাকায়। বিয়ের পর স্বামী ও একমাত্র মেয়েকে (১১) নিয়ে নিজেদের বাড়িতেই থাকতেন ওই নারী। পারিবারিক একটি বড় বিপদে পড়ে বাড়িটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন আসমার বাবা। এর পর শুরু হয় অর্থনৈতিক লড়াই। ভাগ্য ফেরাতে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান আসমার স্বামী। এদিকে আসমাকেও তার বড় বোনের স্বামী রুহুল আমিন বিদেশে যাওয়ার জন্য বোঝাতে থাকেন। কিন্তু ইরাকের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যেতে রাজি না হওয়ায় তাকে বলা হয়- এ রকম ভিসা বছরে একটিও আসে না। ইরাকের এক মন্ত্রীর বাসায় তার ছোট বাচ্চাকে দেখাশোনা করতে হবে। প্রতি মাসে বেতন মিলবে চারশ ডলার। থাকা খাওয়া ফ্রি। দুলাভাইয়ের এমন প্রলোভনে একপর্যায়ে রাজি হয়ে যান আসমা।

এর পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কাকরাইলের আল নাহিয়ান ম্যানপাওয়ার সার্ভিসেসের অফিসে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার জাপা নেতা মোস্তাফিজুর রহমান।

মামলার এজহারে উল্লেখ করা হয়, আল নাহিয়ান ম্যানপাওয়ার সার্ভিসেস থেকে আসমাকে ইরাকের ভিসা দেওয়া হয়। এ জন্য তাদের দিতে হয় আড়াই লাখ টাকা। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাওয়ার পর আসমা বুঝতে পারেন তাকে ট্যুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হচ্ছে। তিনি কারণ জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান তাকে জানান, কোনো সমস্যা নেই। তিনি সবকিছু ম্যানেজ করবেন। তার কথায় ভরসা করে গত ২২ এপ্রিল এয়ার আরাবিয়ার একটি ফ্লাইটে আসমা দুবাই পৌঁছান। পরদিন স্থানীয় দালালরা তাকে ইরাকে নিয়ে যায়। দেশটিতে পৌঁছানোর পর আসমা বুঝতে পারেন তিনি বিপদে পড়েছেন।

ইরাকের মালিক আসমাকে জানান, তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তাই কাজ করতে হবে তার নির্দেশেই। ভালো কাজের কথা বলে নেওয়া হলেও আসমাকে সেখানে তিনটি বাড়ির সব কাজ করতে হয়। খাবারও দেওয়া হয় না ঠিক মতো। পান থেকে চুন খসলেই চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মামলার এজাহারে আসমার মা উল্লেখ করেন, ‘দেশে ফিরতে চাইলে আমার মেয়েকে জানানো হয়- তোমাকে আমাদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। মালিক তাকে কিনে নিয়েছে। আসমা এখন তাদের ক্রীতদাসী।’

আসমা চুরি করে ফোনে স্বজনদের সবকিছু জানান। এর পর পরিবারের লোকজন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বললে মোস্তাফিজুর রহমান ও রুহুল আমিন তাদের কোনো পাত্তা দেননি। উল্টো তারা জানিয়ে দেন, দুই বছরের আগে তাকে দেশে ফেরানো সম্ভব নয়। আসমার খালাতো ভাই আমাদের সময়কে বলেন, ‘আসমা ফোন করে জানিয়েছে, তাকে ফিরিয়ে আনা না হলে সে মারা যাবে। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। আসমা আপার ছোট মেয়ে রয়েছে। মায়ের কথা জানতে চাইলে আমরা কিছু বলতে পারি না তাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই আধুনিক সময়েও কাউকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়, সেটা ভাবাই যায় না।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তরা বলছেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকে নানা বিদ্রোহী গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ইরাক-সিরিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) পতন হলেও তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। কাজেই আসমা কোনোভাবে জঙ্গিদের হাতে পড়লে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের গোয়েন্দা প্রধান লে. কর্নেল মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃত মোস্তাফিজুর রহমানের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখছি। আর পলাতক রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তারে কাজ করছে র‌্যাব।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র অবশ্য জানায়, গ্রেপ্তারকৃত মোস্তাফিজুর রহমান জাপার কেন্দ্রীয় নেতা। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালেও তিনি গাজীপুরের কাপাসিয়ায় পোস্টার টাঙিয়ে প্রচার চালিয়েছিলেন। র‌্যাব জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত মোস্তাফিজুর রহমান এর আগেও এভাবে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মানবপাচারকারী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status