মার্জিয়া কান্তা, আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় কান্তা বিউটি পার্লার নামে দুটি পার্লারের উদ্যোক্তা ও মালিক। একই এলাকায় কুটির শিল্প পণ্য ব্যবসায়ী স্বামী শহিদুল ইসলাম সাগরের সঙ্গে আশুলিয়ার জামগড়ার ভাড়া বাসা থেকে ভ্রমণের কথা বলে বেরিয়ে উধাও হয়ে যান তিনি।
নরসিংদী জেলার বেলাব থানার বীর রাঘব এলাকার কৃষক সোহরাব হোসেন রতনের ৪ কন্যার মধ্যে দ্বিতীয় কন্যা কান্তাই ছিল তার শেষ বয়সের ভরসা। রতন জানান, ২০১৮ সালের ২২ আগস্ট পারিবারিক কলহের জেরে কান্তাকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেন সাগর। ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো শ্বশুরবাড়ি আসেন শহিদুল ইসলাম সাগর। জানান, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিটমাট হয়ে গেছে। কম দামে বিউটি পার্লারের পণ্য কেনার পাশাপাশি ভ্রমণ করতে ভারতে যাচ্ছেন জানিয়ে সেদিনই কান্তাকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ছাড়েন সাগর। আরও কয়েকজন স্বজন জানান, সাগর কান্তাকে নিয়ে ভারতে যাওয়ার কথা তাদেরও বলেছিলেন।
নরসিংদী থেকে কান্তাকে নিয়ে আশুলিয়ার জামগড়ায় ভাড়া বাসায় আসেন সাগর। ছোট বোন জানান, নরসিংদী থেকে আসার পর কান্তার সঙ্গে অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো ব্যবহার করেন সাগর।
২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জামগড়ার বাসা থেকে ভারত ভ্রমণের জন্য বেরিয়ে যান কান্তা ও সাগর। বাবা ও দুই বোন জানান, সেদিনই কান্তার সঙ্গে তাদের শেষ কথা হয়। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে কান্তা ও সাগর দুজনেরেই মোবাইল বন্ধ পেয়ে স্বজনরা ভাবতে থাকেন সীমান্ত অতিক্রম করার কারণে হয়তো তাদের সঙ্গে কথা বলা যাচ্ছে না।
এক সপ্তাহের কথা বলে বেড়াতে যাওয়া দম্পতির খোঁজ ৪ মাসেও না মেলায় ২০১৯ সালের ১০ জানুয়ারি সাগরের গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামের রৌমারীতে যান কান্তার বাবা ও বোন। সেখানে সাগরের স্বজনরা জানান, কান্তা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। পাশাপাশি সাগরকে কান্তার পরিবার গুম করেছে অভিযোগ তুলে কান্তার পরিবারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন তারা।
এ নিয়ে থানা পুলিশ মামলা নিতে অপারগতা জানালে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি আইনজীবীর পরামর্শে আদালতে মামলা করেন কান্তার বাবা। মামলায় সাগর ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে কান্তাকে নির্যাতন ও যৌতুক দাবির অভিযোগ তোলা হয়।
মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা বেলাব থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে সাগরের দুই ভাই রফিক ও পাবলোকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তবে কান্তা ও সাগর সম্পর্কে কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি তাদের কাছ থেকে।
এরপর নরসিংদী জেলা পুলিশ সুপার কান্তার বাবার করা মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দিয়ে তদন্ত করাতে পুলিশ সদর দফতরে চিঠি লিখেন। পুলিশ সদর দফতর পিবিআই নরসিংদী জেলাকে মামলার তদন্তের নির্দেশ দেয়। পরিদর্শক শফিকুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেয় নরসিংদী জেলা পিবিআই।
এদিকে চার মাস ধরে ভাড়া না পেয়ে দুই বিউটি পার্লার দোকানের মালিক ও বাসার বাড়িওয়ালা ফ্লোর ছেড়ে দিতে বলেন। বড় বোন রিতা পার্লারের মালামাল সরাতে গিয়ে কান্তার একটি পুরোনো ডায়েরি পান। যাতে সাগরের কয়েকটি মোবাইল নম্বর লেখা রয়েছে। বেশ কয়েক দিন চেষ্টার পর একটি নম্বরের সংযোগ মেলে। লাইনের অপর প্রান্তে সাগরের কণ্ঠস্বর। কান্তা ইয়াবা মাদকসহ ধরা খেয়ে ভারতের শিলিগুড়ি কারাগারে বন্দি। তাকে আনতে শিগগির ভারতে যাওয়ার কথা বলে নম্বরটি বন্ধ করে দেন সাগর।
মোবাইল কলের সূত্র ধরে ঠাকুরগাঁও থেকে সাগরকে ধরতে আশুলিয়া থানা পুলিশ, পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা এবং র্যাব-১ এ ধরনা দেয় কান্তার পরিবার। কিন্তু তাদের আবেদন কেউ কানে তোলেনি।
এদিকে মামলা ও দুই ভাইকে গ্রেফতারের খবর পেয়ে কান্তা উধাও হওয়ার ঠিক এক বছরের মাথায় হাইকোর্ট থেকে ৩ সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন নেন সাগর।
হাইকোর্টে সাগর দাবি করেন, কান্তার সঙ্গে তার ২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। তাই কান্তার খোঁজ জানার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। প্রমাণ হিসেবে আদালতে তালাকনামা উপস্থান করেন সাগর। তালাকনামায় সাগর দাবি করেন ২০১৭ সালের ১৮ আগস্ট কান্তা সাগরকে রাস্তা থেকে ধরে এনে সাগরের বাসাতেই তাকে আটক করে জোর করে বিয়ে করেন। কান্তা তার আগের বিয়ের খবর সাগরের কাছে পোপন করেছেন। সাগরের জীবন ধ্বংস করতে কান্তা আগের স্ত্রী ও সন্তানের খবর জানার পরও সাগরকে বিয়ে করেছেন।
তবে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে, কান্তার তৈরি পোশাক কর্মী থেকে বিউটি পার্লারের উদ্যোক্তা হওয়া এবং সাগরকে বিয়ে করার যে বিবরণ জানা গেছে তা রূপকথাকেও হার মানায়।
কান্তার বড় বোন রিতা জানান, ১৩ বছর বয়সে ভাগ্য বদলের আশায় আশুলিয়া আসেন মার্জিয়া কান্তা। মাত্র ১ হাজার ৮০০ টাকায় ফ্যান্টাসি কিংডমের উল্টোদিকের একটি তৈরি পোশাক করাখানা দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু।
বেশ কয়েক বছর ৩-৪টি কারখানায় কাজ করে টাকা জমিয়ে বিউটি পার্লারের ব্যবসা শুরু করেন কান্তা।
এই এলাকায় থাকার সময়ই কান্তার পিছু নেন সাগর। একপর্যায়ে ব্ল্যাকমেইল করে কান্তাকে বিয়ে করেন সাগর।
হাইকোর্টের দেওয়া ৩ সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন শেষে নিম্ন আদালতে হাজিরা দিতে গেলে বিচারক সাগরকে জামিন বাতিল করে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেন। মামলার দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে সাগরকে ৩ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। রিমান্ডেও সাগর দাবি করেন, ছাড়াছাড়ি হওয়ায় কান্তার খবর তিনি জানেন না। কান্তার সঙ্গে আরো অনেক লোকের সম্পর্ক আছে বলেও তদন্ত কর্মকর্তাকে বিভ্রান্ত করেন সাগর। এমনকি রিমান্ড শেষে সাগর জেল থেকে জামিনে বেরিয়েও আসেন। অন্যদিকে পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম বদলি হয়ে চলে যান গাজীপুর জেলায়।
কান্তা নিখোঁজ রহস্য উন্মেচনের নতুন দায়িত্ব পান পরিদর্শক মনিরুজ্জামান। আগের দুই তদন্ত কর্মকর্তার নিষ্ফল অনুসন্ধানের পর থেকেই শুরু করেন তিনি।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় কান্তা ও সাগরের মোবাইল নম্বর বিশ্লেষণ করে পরিদর্শক মনিরুজ্জামান দেখতে পান ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর এই দম্পতি শরীয়তপুর শহরে রাত কাটিয়েছেন। কাকতালীয়ভাবে ঠিক সেই সময় ওই এলাকার ওসি ছিলেন এ তদন্ত কর্মকর্তা।
২০১৯ সালের ১৯ মার্চ সূত্রের খোঁজে শরীয়তপুর যান পরিদর্শক মনিরুজ্জামান। শহরের হোটেলেগুলোর অতিথি নিবন্ধন খাতায় কান্তা ও সাগরের নাম খুঁজতে থাকেন তিনি।
একই রাস্তায় অবস্থিত হোটেল নূরের অতিথি নিবন্ধন খাতার ৪০ নম্বর পৃষ্ঠায় অপ্রত্যাশিত সূত্রের সন্ধান পায় পিবিআই। লাল জামা পরা চটপটে কান্তাকে খুব সহজেই স্মরণ করেন হোটেলের ম্যানেজার।
শরীয়তপুরের হোটেল নূর থেকে পাওয়া প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাগরের জামিন বাতিল করে ৭ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জিজ্ঞাসাবাদে সাগর দাবি করেন ভারতে যাওয়ার জন্যই তারা জামগড়া থেকে বের হয়েছিলেন। তার আগে কান্তা ও মামুনকে নিয়ে শরীয়তপুরে ঘুরতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ২২ সেপ্টেম্বর সকালে কান্তা ও মামুন তাকে না জানিয়েই চলে যান। কান্তার এই লাপাত্তা হওয়ার খবর, থানা পুলিশ কিংবা কান্তার পরিবারকে কেন জানাননি এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেননি সাগর। এ পর্যায়ে সাগর কান্তাকে ভারতে পাচার করেছেন বলে সন্দেহ হয় তদন্ত কর্মকর্তার মনে।
তদন্ত কর্মকর্তার মনে এমন সন্দেহ হলেও শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল, তা উঠে এসেছে সময় টিভির বিশেষ অনুষ্ঠান ‘সময়ের অসংগতি’-তে। কান্তা কোথায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সময়ের অসংগতি টিম ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। তুলে এনেছেন বিস্তারিত, যা প্রকাশ করা হয়েছে সময়ের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে।