ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ৩০ জুন ২০২৬ ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩
পাহাড়ের ডাক
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Tuesday, 28 April, 2020, 11:28 AM

পাহাড়ের ডাক

পাহাড়ের ডাক

‘আরে, মেয়েরা কিছুই পারে না’—এমন টিপ্পনী শুনতে শুনতে বড় হয়েছেন জয়নাব বিনতে হোসেন। সেই থেকেই জেদ চেপে গিয়েছিল সমাজে প্রচলিত এমন বৈষম্যের বিরুদ্ধে উদাহরণ হয়ে ওঠার। সেই জেদ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পছন্দের বিভাগে ভর্তি হওয়া। শুরু থেকেই ভালো করার ইচ্ছে ছিল। সেটা করে দেখিয়েছেন স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে। মেধায় নিজের সেরাটা দেখানোর পর জয়নাব ভাবলেন, দৈহিক শক্তির জায়গায়ও নিজেকে প্রমাণ করা উচিত।

পাহাড়ের মানুষদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে ছিল আগে থেকেই। মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে তাই চলে গিয়েছিলেন বান্দরবানের লামার দুর্গম এক পাহাড়ি স্কুলে। সেখানে যাওয়ার পথে, পাহাড়ে উঠতে বেশ কষ্ট হয়েছিল তাঁর। ভাবলেন, এদের নিয়ে কাজ করতে হলে পাহাড়ে চড়ার শারীরিক শক্তি ও সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এর পর থেকে সময় পেলেই দেশের পাহাড়গুলো চড়ে বেড়ান।

২০১৬ সালের নভেম্বরে জয়নাব হিমালয়ের সান্দাকফু গিয়েছিলেন গাড়ি চড়েই; তবে ফেরার সময় এক দিনের পথ ট্রেকিং করেছেন। সে-ই প্রথম তাঁর হিমালয়ে পা রাখা। হিমালয়ের বিশালতা ও সৌন্দর্যে অভিভূত হয়েছিলেন তিনি। একদম চূড়া থেকে মেঘ ছুঁয়ে আসার ইচ্ছা জাগল। সেই ইচ্ছাপূরণের পথেই এখনো নিজেকে চালিত রেখেছেন।

২০১৭ সাল থেকে শুরু হয় তাঁর হিমালয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রার প্রস্তুতি। সে বছরের সেপ্টেম্বরে যান হাম্পতাপাস পর্বতশৃঙ্গে। হিমাচল প্রদেশের ১৪ হাজার ১০০ ফুট উচ্চতার এই পর্বতে ছিল তাঁর চার দিনের ট্রেকিং। এখানে তিন রকমের ল্যান্ডস্লাইডের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। সবুজ অংশ, পাথুরে ভূমি আর বরফ। এই পাথুরে জায়গা থেকেই অক্সিজেনের স্বল্পতার শুরু। সেবারই প্রথম তাঁবুতে থাকার অভিজ্ঞতা হয় জয়নাবের। পড়েছিলেন তুষারঝড় আর তুমুল বৃষ্টির মুখে। এরই মধ্যে বরফ গলা নদী পার হওয়ার সাহস দেখিয়েছেন। হাম্পতাপাস থেকে ফিরে ফেসবুকে জয়নাব একটি গ্রুপ খোলেন ‘অল্টিচিউড হান্টার’ (www.facebook.com/groups/1345788 27201068)। পাহাড়প্রেমীদের এই গ্রুপের সদস্যসংখ্যা প্রায় ১১ হাজার।

গত বছরের জুনে ভারতের উত্তরাখণ্ডে হিমালয়ের রুপকুণ্ডু পর্বতশৃঙ্গে হাজির হন জয়নাব। সাড়ে ১৬ হাজার ফুট উচ্চতার এই পর্বতে করেন পাঁচ দিনের ট্রেকিং। তাঁকে রাতের বেলা সামিট পুশ করতে হয় এবার। সামিট পুশ মানে চূড়ায় বরফ থাকে যেহেতু, দিনের বেলা সেটি বিপজ্জনক হয়ে থাকে; তাই সকালে শৃঙ্গে আরোহণ করা যায় না। এ কারণে রাতেই ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে শৃঙ্গে উঠে নেমে আসতে হয়। জয়নাব সামিট পুশ করতে বেরিয়েছিলেন রাত ৩টায়। এই শৃঙ্গের বিশেষত্ব—এর লাগোয়া একটা লেক রয়েছে। সেই লেকের কিনারে পড়ে আছে শত শত মানুষের খুলি! ধারণা করা হয়, হয়তো কখনো এখানে উঠতে আসা একদল অভিযাত্রী প্রাণ হারিয়েছিল বরফঝড়ে! জয়নাবের এই শৃঙ্গে ওঠার অভিজ্ঞতাটি তাই একই সঙ্গে ছিল রোমাঞ্চকর ও আতঙ্ক-জাগানিয়া। তিনি জানান, ‘মাথায় হেডল্যাম্প নিয়ে, কষ্টসাধ্য পথ পাড়ি দিয়ে চূড়ায় যখন দেশের পতাকা গেঁথেছি, সব ক্লান্তি নিমেষেই শেষ হয়ে গেছে।’

এরপর সেপ্টেম্বরের পাহাড় অভিযানটি ছিল জয়নাবের জন্য সবচেয়ে স্মরণীয় সফর। একেবারে একলা ছিলেন তখন। এবার হিমালয়ে যান লাদাখ অঞ্চল দিয়ে। প্রথম বাংলাদেশি নারী অভিযাত্রী হিসেবে আরোহণ করেন ২০ হাজার ১৮২ ফুট উচ্চতার স্টোক কাংরি পর্বতশৃঙ্গ। জয়নাব বলেন, ‘সেবার পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মোটরেবল পাস—খার্দুংলা পাসে বাইকে চড়েছি। শৃঙ্গ অভিযানের সময় গাইড আমার সঙ্গে প্রচণ্ড অসহযোগিতা করছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন, আমি যেন চূড়ায় না উঠেই ফিরে যাই। তবে তাঁকে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে টানা ১৯ ঘণ্টা ট্রেকিং করে সেই চূড়ায় উঠে তার পরই ফিরেছি।’ এরপর অক্টোবরে উত্তরাখণ্ডের ১৯ হাজার ১০০ ফুট উচ্চতার গঙ্গোত্রীর রুদ্রগাইরা শৃঙ্গে পা রাখার উদ্দেশ্যে বের হন জয়নাব। এই পর্বতচূড়া ছোঁয়ার অভিযানে টিমের সঙ্গে যোগ দিতে একটু দেরি হয়ে যায় তাঁর। তবে কথা ছিল, টিম একদিন তাঁর জন্য অপেক্ষা করবে। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অপেক্ষা করতে পারেনি টিম। এ কারণে সামিট করতে পারেননি জয়নাব। বেস ক্যাম্প থেকেই ফিরতে হয়েছিল তাঁকে।

এদিকে এ বছরের জানুয়ারিতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সুষুমিয়া পাহাড়ে তিন দিনের রক ক্লাইম্বিং কোর্স করেছেন জয়নাব। ৯০ ডিগ্রি খাড়া পাহাড়ে কেমন করে খাঁজ বেয়ে উঠতে হয়, এটি তারই প্রশিক্ষণ। এরপর এপ্রিলে গিয়েছেন নেপালের ল্যাং ট্যাং অভিযানে। হিমালয়ের এই শৃঙ্গের উচ্চতা ১৮ হাজার ৪০ ফুট। অভিযানটিতে চূড়ায় ওঠার ১০০ ফুট আগেই আচমকা ঝড়ের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। ফলে নেমে আসতে বাধ্য হন। ফেরার পথে বাংলাদেশের খ্যাতিমান পর্বতারোহী মীর শামসুল আলম বাবুর কাছে গ্লেসিয়ারে আরোহণের পাঠ নেন। ১৭-১৮ দিনের এই অভিযান আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও তাঁকে বেশ আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। মে মাসে ভারতের নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে এক মাসের বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স করেন। এই কোর্সের অংশ হিসেবে মাছাধার পিক সামিট করতে হয় তাঁকে। ১৭ হাজার ১০০ ফুট উচ্চতার এই শৃঙ্গে পৌঁছানোর পথ ছিল বেশ খাড়া। আগস্টে তিনি হাজির হন লাদাখের কাংইয়াত সে-২ শৃঙ্গে। প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য অবশ্য সামিটটি সম্পন্ন হয়নি।

জয়নাব জানান, ‘আগামী বছর আফ্রিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কিলিমাঞ্জারো, ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট টেলব্রস, আর লাতিন আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আর্জেন্টিনার ন্যাকাংকাগুয়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশের ৫০ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলা বিভাগের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এভারেস্টে উঠব। তার আগে সব ধরনের প্রস্তুতি সেরে ফেলব।’ তিনি আরো বলেন, “গণমাধ্যমে ‘শৃঙ্গ জয়’ শব্দবন্ধের ব্যবহার দেখি। আমরা যাঁরা পাহাড় নিয়ে থাকি, ‘জয়’ শব্দটা থেকে দূরে থাকতে ভালো লাগে আমাদের। কেননা পাহাড়কে আমরা জয় করি না; বরং পাহাড়ের সঙ্গে একটা অন্তরঙ্গতা তৈরি করতে যাই। পাহাড় আমাদের মানবিকতা শেখায়। তা ছাড়া পবর্তারোহণ পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন খেলাগুলোর একটি। সেখানে হারতে হয় জীবন দিয়ে। যেসব আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী ‘মেয়েরা কিছুই পারে না’ বলে চেঁচাতেন, তাঁদের মুখ অনেকটা বন্ধ করতে পেরেছি বলে একধরনের আনন্দ হয় আমার।”

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেওয়া জয়নাব এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিনা বেতনে ছুটি নিয়েছেন পিএইচডি ও পর্বতারোহণের উদ্দেশ্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে সৈয়দ আকরম হোসেন ও ভীস্মদেব চৌধুরীর অধীনে ‘রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র’ বিষয়ে পিএইচডি শুরু করেছেন তিনি।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status