ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া মহামারী প্রকোপের ক্ষেত্রে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আংশিক গাফিলতি থাকলেও এই দুই সিটি কর্পোরেশনকে এককভাবে দায়ী করা যায় না।
সোমবার হাইকোর্টে দাখিল করা বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশগুপ্ত এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, হলফনামা আকারে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
আগামীকাল বুধবার প্রতিবেদনটি বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে উপস্থাপন করা হবে। ২০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ১০টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।
এর আগে ১২ নভেম্বর ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নির্মূলে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতার কারণ এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটিকে তদন্তের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
আদেশে ঢাকা জেলা জজের নেতৃত্বে দুই সদস্যের কমিটিকে বিষয়টি তদন্ত করতে নির্দেশ দেন।
এই কমিটিকে ভবিষ্যতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে সুপারিশনামা তৈরি করতে বলা হয়।
কমিটিকে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের একজন করে শিক্ষক, আইসিডিডিআরবির একজন বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি, সরকারের প্ল্যান প্রটেকশন বিভাগের একজন এবং ইন্সটিটিউট অব পাবলিক হেলথের একজন প্রতিনিধিসহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে বলা হয়।
পরে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ মো. হেলাল চৌধুরী এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সোহরাব হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত দুই সদস্যের কমিটিকে এ অনুসন্ধান চালানোর দায়িত্ব দেয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর) ও সিডিসির তথ্যমতে, দেশে ডেঙ্গুজ্বরের অফিসিয়াল প্রাদুর্ভাব ছিল ২০০০ সালে।
ওই বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। তবে ডেঙ্গু মহামারী আকার ধারণ করে ২০১৯ সালে। সরকারি হিসাবে ওই বছর ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়।
প্রতিবেদনের মতামত অংশে বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং অনান্য প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ২০১৯ সালে ডেঙ্গু মহামারী প্রকোপের ক্ষেত্রে ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আংশিক গাফিলতি থাকলেও এককভাবে সিটি কর্পোরেশন দুটিকে দায়ী করা যায় না।
তাছাড়া কোনো ব্যক্তির একক গাফিলতিও অনুসন্ধান কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়নি।
প্রতিবেদনে ডেঙ্গু রোধে ১০টি সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম তদারকি করতে উচ্চপর্যায়ের (মন্ত্রণালয় পর্যায়ে) একটি তদারকি টিম বা মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে।
এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে দেশের ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় এবং সিটি কর্পোরেশনসহ পৌরসভাগুলোয় নিয়োজিত কর্মকর্তার সমন্বয়ে মশক নিধনের জন্য মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিটি অঞ্চল, ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রমে ব্যবহৃত কীটনাশক ও যন্ত্রপাতি মজুদ এবং সংরক্ষণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আলাদাভাবে গুদাম-অফিস নির্মাণ করা।
এর আগে গত বছরের ২৬ আগস্ট ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও এডিস মশার আবাসস্থল ধবংসে ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যাপকভাবে ওষুধ ছিটানো ও অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।
পরে ৬ নভেম্বর চলতি বছরে সারা দেশে ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত কতজন মারা গেছেন তার সংখ্যা জানতে চান হাইকোর্ট। ১১ নভেম্বরের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে এ তথ্য আদালতকে জানাতে বলা হয়।
মঙ্গলবার শুনানিতে প্রথমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মাইনুল হাসান আদালতকে জানান, ডেঙ্গুতে এ বছরের ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ১১২ জন মারা গেছেন।
ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক শুরু হলে গত বছরের ৪ জুলাই এক স্বপ্রণোদিত আদেশে ঢাকা সিটিতে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়াসহ এডিস মশা নির্মূল ও ধ্বংসে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট।
এরপর কয়েক দফায় এ বিষয়ে শুনানি হয় এবং নির্দেশনা দেন আদালত। আদালতের আদেশে জরুরি ভিত্তিতে বিদেশ থেকে ওষুধ এনে ডেঙ্গু নিধনে কাজ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।