রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে চরম আকার ধারণ করেছে। খোদ চিকিৎসকরাই ডেঙ্গু আতঙ্কে সময় পার করছেন। এবারের ডেঙ্গুর ধরণ এতটাই ভয়ঙ্কর যে, শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বেশ কয়েকজন চিকিৎসকেরও ইতিমধ্যে মৃত্যু হয়েছে।
৩ জুলাই স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে রেডিওলজি এন্ড ইমেজিং বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. নিগার নাহিদ দিপু, রোববার (২২ জুলাই) রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান হবিগঞ্জের নবাগত সিভিল সার্জন ডা. শাহাদাত হোসেন হাজরা ও শুক্রবার মারা যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনারারি চিকিৎসক তানিয়া সুলতানা। সর্বশেষ শুক্রবার সন্ধ্যায় ডেঙ্গুতে মারা গেলেন মুক্তিযুদ্ধের কোম্পানি কমান্ডার ডা. উইলিয়াম ম্রং। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ওদিকে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই গত এক মাসে ১০ জন চিকিৎসক ও ২০ জন নার্সসহ মোট ৩০ জন ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির পরিচালক ডা. আমিন আহমেদ খান। এদের দুই চিকিৎসক এবং দুই নার্স হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
ডা. আমিন আহমেদ খান বলেন, ‘যে সব চিকিৎসক এবং নার্স ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের অধিকাংশই এখন ছুটিতে আছেন। কয়েকজন চিকিৎসক হাসপাতালে কাজ শুরু করেছেন।’ তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে আমরা নিজেরাও খুব চিন্তিত।
এদিকে কয়েকটি ক্যাম্পাসে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর আরো শত শত শিক্ষার্থী ডেঙ্গু আক্রান্ত বলে খবর পাওয়া গেছে। ‘স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ নামের এক ফেসবুক পেজের জরিপ থেকে জানা যায়, এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শতাধিক শিক্ষার্থী ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত। এ ঘটনায় ঢাবি শিক্ষার্থীরা জরুরি ভিত্তিতে ক্যাম্পাস বন্ধেরও দাবি জানায়।
এবারের ডেঙ্গু ছাড়িয়েছে অতীতের সকল রেকর্ড। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ১৮ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে বেশি ১০ হাজার ৫২৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে ডেঙ্গু রোগী ছিল ৫ হাজার ৫৫১জন, ২০০১ সালে দুই হাজার ৪৩০ জন, ২০০২ সালে ছয় হাজার ২৩২ জন, ২০০৩ সালে ৪৮৬, ২০০৪ সালে তিন হাজার ৪৩৪ জন, ২০০৫ সালে এক হাজার ৪৮ জন, ২০০৬ সালে দুই হাজার ২০০ জন, ২০০৭ সালে ৪৬৬ জন, ২০০৮ সালে এক হাজার ১৫৩ জন, ২০০৯ সালে ৪৭৪ জন, ২০১০ সালে ৪০৯ জন, ২০১১ সালে ১ হাজার ৩৫৯ জন, ২০১২ সালে ৬৭১ জন, ২০১৩ সালে এক হাজার ৭৪৯ জন, ২০১৪ সালে ৩৭৫ জন, ২০১৫ সালে তিন হাজার ১৬২ জন, ২০১৬ সালে ছয় হাজার ৬০ জন, ২০১৭ সালে দুই হাজার ৭৬৯ জন এবং গতবছর ২০১৮ সালে ১০ হাজার ১৪৮ জন।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, ‘২০১৮ সালে বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন ১০ হাজার ১৩৮ জন রোগী। সেটি ছিল এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। কিন্তু এ বছর সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে।
সতর্কতা: জ্বর হলেই অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। তা ছাড়া যেহেতু এবারের জ্বরে ফ্লুইড ঝরে যাচ্ছে শরীর থেকে তাই জ্বর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর ফ্লুইড জাতীয় খাবার খাওয়া উচিত।
এ ছাড়া ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে ডেঙ্গু মশা নিধন করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। ডেঙ্গু মশা থেকে বাঁচতে যার যার বাড়ির সামনে–পেছনে সব জায়গা পরিষ্কার রাখতে হবে। ময়লা–আবর্জনা যত্রতত্র ফেলা যাবে না। মনে রাখতে হবে জীবন আপনার এবং আপনাকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। কোনো সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ এগিয়ে না এলে সরকারের পক্ষে একা সমস্যা উত্তরণ কঠিন হয়। সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের ডেঙ্গু সমস্যা দূর হবে, এই প্রত্যাশা করি।