তিন দিনের শ্রমিক আন্দোলন শেষ হয়েছে। রাজপথে আপাতত উত্তাপ কমেছে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের পোশাকশিল্পে যে অদৃশ্য ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, তার চিকিৎসা হবে কীভাবে? সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও উৎপাদন বিঘ্নের খবর বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছেছে। এর তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির হিসাব হয়তো করা যাবে। কিন্তু বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ক্ষতি কতটা, তার হিসাব মিলবে আগামী মৌসুমের ক্রয়াদেশে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের উদ্বেগের কেন্দ্রে এখন এই প্রশ্ন। কারণ বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এমনিতেই আন্তর্জাতিক বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে। তার ওপর শ্রমিক অসন্তোষ ও শিল্পাঞ্চলের অস্থিতিশীলতা নতুন করে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানিয়েছেন, গত আট মাসের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের তুলনায় বাংলাদেশে পোশাকের ক্রয়াদেশ প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ কমেছে। তার আশঙ্কা, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এর প্রভাব এখনই বোঝা না গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে ক্রয়াদেশ কমে যেতে পারে।
এখানেই বড় বিপদের ইঙ্গিত। ক্রয়াদেশ কমার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের মন্দা, উৎপাদন ব্যয় ও প্রতিযোগিতাসহ নানা কারণ রয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও শ্রমিক অসন্তোষের অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বিদেশি ক্রেতারা এখন শুধু পণ্যের দাম ও মান দেখেন না। কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা, শ্রমিক নিরাপত্তা, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং শিল্পাঞ্চলের স্থিতিশীলতাও বিবেচনায় নেন।
তাদের আশঙ্কা, কোনো দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে ক্রেতারা সেখানে উচ্চমূল্যের ও বেশি মুনাফার পণ্যের ক্রয়াদেশ দিতে আগ্রহ হারান। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বদলে স্বল্পমেয়াদি ক্রয়াদেশ দেন। এতে কারখানার পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও মুনাফা—সবকিছুতেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
শুধু আশঙ্কা নয়, এরই মধ্যে ক্রেতাদের আচরণে পরিবর্তনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকটি আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক প্রতিশ্রুতির তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্রয়াদেশ কমানোর কথা জানিয়েছে। কোনো কোনো ক্রেতা আগামী দুই মাসের ক্রয়াদেশও পুনর্বিবেচনা করছে।
আন্দোলনের প্রভাব শুধু নারায়ণগঞ্জে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের প্রায় ২০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ফতুল্লার বড় কয়েকটি কারখানায়ও উৎপাদন স্থগিতের খবর পাওয়া যায়।
অন্যদিকে শ্রমিকদের দাবি, দ্রব্যমূল্য ও বাড়িভাড়া যেভাবে বেড়েছে, তাতে বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন। ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি তাই তাদের কাছে জীবনধারণের প্রশ্ন। ফলে শ্রমিকদের দাবিকে উপেক্ষা করে স্থিতিশীলতা ফেরানোও কঠিন।
আন্দোলনের পেছনে বহিরাগত বা রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগের পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রকৃত সমস্যাগুলোও সামনে আনা জরুরি। শ্রমিক নেতাদের একাংশের বক্তব্য, আন্দোলনের অনেক কর্মসূচি প্রচলিত শ্রমিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের মজুরি, কর্মপরিবেশ ও বকেয়া পাওনার অভিযোগও রয়েছে। এ অবস্থায় প্রকৃত দাবি ও উসকানিমূলক তৎপরতার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ না করলে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।
শিল্পমালিকদের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করা, অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নির্ভরযোগ্য উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখা।
তিন দিনের আন্দোলন শেষ হলেও এর ক্ষত কত দিনে সারবে, তা নিশ্চিত নয়। শ্রমিকের পেটে ক্ষুধা রেখে শিল্প টেকানো যাবে না। আবার শিল্পের চাকা বন্ধ করে শ্রমিকের কর্মসংস্থানও রক্ষা করা সম্ভব নয়।
নারায়ণগঞ্জের পোশাকশিল্পের সামনে এখন তাই কঠিন বাস্তবতা—শুধু রাজপথ শান্ত করলেই হবে না, ফিরিয়ে আনতে হবে ক্রেতাদের আস্থাও। নইলে আজকের আন্দোলনের মূল্য আগামী দিনে দিতে হতে পারে ক্রয়াদেশ, বিনিয়োগ ও হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান হারিয়ে।