ই-পেপার সোমবার ● ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ● ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ● ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
কেউ মামলা করেনি, অজুহাতে পুলিশ কি দায়িত্ব এড়াতে পারে?
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Tuesday, 29 September, 2026, 4:56 PM

কেউ মামলা করেনি, অজুহাতে পুলিশ কি দায়িত্ব এড়াতে পারে?

কেউ মামলা করেনি, অজুহাতে পুলিশ কি দায়িত্ব এড়াতে পারে?

ঢাকার মিরপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে হামলার সময় পুলিশের উপস্থিতি ও পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

ক্ষতিগ্রস্ত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার থেকে স্থানীয় থানার দূরত্ব এক কিলোমিটারেরও কম। এমন পরিস্থিতিতে হামলার সময় পুলিশ কেন ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি এবং হামলা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি—এ প্রশ্ন সামনে এসেছে।

অন্যদিকে, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়, তিনি ‘ফেসবুক লাইভে এসে অভিযোগ করলেও থানায় মামলা কেন দায়ের করেননি?’

এর পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পাল্টা প্রশ্ন ওঠে—থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ না দিলে কিংবা মামলা না করলে পুলিশ কি অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে না?

তবে পরে ভুক্তভোগী মি. মুক্তাদিরের বক্তব্য থেকে জানা যায়, হামলার পর শনিবার রাতেই তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু মামলা নিতে দেরি হওয়ায় একপর্যায়ে ‘ক্লান্ত হয়ে’ তিনি বাসায় ফিরে যান।

পরদিন সকালে ক্ষতিগ্রস্ত স্টুডিওর ভিডিও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এর পর রোববার দুপুরে পুলিশ মামলা নেয়।

মামলা নিতে গড়িমসি করার অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। বাংলাদেশে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে পুলিশের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।

মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অনেক সময় ‘ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি বা কেউ মামলা করেনি’—এমন অজুহাত দেখিয়ে পুলিশকে নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা যায়।

বিশেষ করে কোনো অপরাধের সঙ্গে সমাজের প্রভাবশালী কেউ যুক্ত থাকলে এমন ঘটনা বেশি ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কিন্তু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ‘কেউ মামলা করেননি’—এমন অজুহাতে পুলিশ কি বসে থাকতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সামনে আসে বিদ্যমান আইনের বিধান।

আইনে কী আছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিপক্ষে সংঘটিত যেকোনো অপরাধকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশে এ বিষয়ে আলাদা আইন রয়েছে, যা ‘ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮’ বা সিআরপিসি নামে পরিচিত।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, “এ আইনে পুলিশের দায়িত্বের বিষয়ে বলা হয়েছে যে, তারা যদি ধর্তব্য বা আমলযোগ্য অপরাধের কোনো তথ্য পায়, তাহলে তাদের দায়িত্ব হবে দ্রুত সেটির বিষয়ে রেসপন্স করা।”

ধর্তব্য বা আমলযোগ্য অপরাধ বলতে এমন অপরাধকে বোঝানো হয়, যার তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারে।

এ ধরনের ক্ষেত্রে আদালতের কাছ থেকে আলাদা অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ পুলিশ বিনা পরোয়ানায় অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারে।

“খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, হামলা, ভাঙচুর – এসব ধরনের অপরাধগুলো ধর্তব্য বা আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়,” বলেন মি. মোরসেদ।

আইনে বলা হয়েছে, আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যাবে এবং অপরাধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করে পরিস্থিতি শান্ত করার ব্যবস্থা করবে।

“এক্ষেত্রে তারা অপরাধীদের গ্রেফতার করতে পারবে। সেইসঙ্গে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সেখানে যা যা ঘটেছে, সেগুলো লিপিবদ্ধ করাসহ তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন,” বলেন আইনজীবী মি. মোরসেদ।

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় বলা হয়েছে, অপরাধের ঘটনার তথ্য লিপিবদ্ধ করার পর সেটি তথ্য প্রদানকারীকে পড়ে শোনাতে হবে। এরপর তথ্য প্রদানকারীর স্বাক্ষর নিয়ে এজাহার বা মামলার নথি সংরক্ষণ করতে হবে।

“কিন্তু কোনো কারণে যদি তথ্য প্রদানকারী বা ঘটনায় ভুক্তভোগী তথ্য দিতে না চান বা আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ না করেন, সেক্ষেত্রে পুলিশ নিজেই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে অপরাধ ও অপরাধীদের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবেন,” বলেন মি. মোরসেদ।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো অজুহাতে এর ব্যত্যয় ঘটানো হলে সেটি আইনের লঙ্ঘন হবে।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদাও বলছেন, আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না।

তিনি বলেছেন, “(আইনের) ব্যত্যয় ঘটানোর সুযোগ নেই। অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলে পুলিশ যদি তথ্য পায়, তাহলে অবশ্যই সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

এক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলা হলে ভালো। না হলেও বসে থাকার সুযোগ নেই। পুলিশকে তার মত করে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।”

আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো কর্মকর্তা আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণ কী?
আইনে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও সাম্প্রতিক সময়ে আমলযোগ্য অনেক অপরাধের ঘটনায় পুলিশকে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকার অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গত দুই বছরে মব সৃষ্টি করে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় যেসব হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাবেক আইজিপি মি. হুদা বলছিলেন, “মূলতঃ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পুলিশকে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে ব্যবহার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানোর কারণে নৈতিক দিক থেকে পুরো বাহিনী দুর্বল অবস্থানে চলে গেছে।

এখনও সেটা পুরোপুরি রিকভার (পুনরুদ্ধার) করা সম্ভব হয়নি। ফলে পুলিশ এখনও ভয়ে আছে এবং মবের মত শক্তির বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পক্ষে কাজ করার অভিযোগও রয়েছে। এর পেছনে ভালো পদ-পদবি কিংবা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি উঠে আসে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, বিশেষ করে, মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিকের ঘটনায় স্থানীয় থানার যে ভূমিকা, সেটি নানান প্রশ্ন সামনে আনছে। সেখানে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের আঁতাতের বিষয়টি সামনে আসছে, আবার ক্ষেত্রবিশেষে এটাও মনে হচ্ছে যে, ভয় বা লাভ কিংবা দায়িত্ব এড়ানোর জন্যও তারা (পুলিশ) হয়তো নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় স্থানীয় থানার ভূমিকা নিয়ে পুলিশের ভেতর থেকেও প্রশ্ন উঠেছে।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেন, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাট প্রতিরোধ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

কেন পুলিশ সেই দায়িত্ব পালন করেনি, তা নিয়ে বাহিনীটির পক্ষ থেকে তদন্ত করা হয়।

রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শাহ আলী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এরপর তাকে প্রত্যাহার করা হয়।

তবে শুধু প্রত্যাহার করে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা।

তার মতে, পরিস্থিতির পরিবর্তনে সরকারের সদিচ্ছাও প্রয়োজন।

“সরকারকে আগে সদিচ্ছা দেখাতে হবে। তারা যদি পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয় এবং দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করে, নেতারা যদি পুলিশের ওপর ছড়ি ঘুরাতে না পারে এবং অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই ট্রিট করা হয়, তাহলে ধীরে ধীরে এ সমস্যা থাকবে না,” বলেন মি. হুদা।

সরকার কী বলছে?
পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

“আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে…এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নয়, বরং দলমত নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে,” রোববার বলেন মি. আহমদ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের গাফিলতি প্রমাণিত হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এরই ধারাবাহিকতায় মিরপুরে রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা ও লুটপাটের পর শাহআলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।

অন্যদিকে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও দাবি করছেন, বাহিনীর সদস্যরা আইন মেনেই স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, “অপরাধীদের বিষয়ে পুলিশের অবস্থান স্পষ্ট। কোনো দল বা মত দেখা হবে না, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে।

কোনো ধরনের দখল, বেআইনি বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কেউ করতে পারবে না। যারা এসব করবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। সূত্র: বিবিসি বাংলা



« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status