|
মক্কা চুক্তির পরও কেন ইসরায়েলের দ্বারে সৌদি?
নতুন সময় ডেস্ক
|
|
মক্কা চুক্তির পরও কেন ইসরায়েলের দ্বারে সৌদি? অথচ রিয়াদ এই তিনটিকেই পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সেন্টকম-মধ্যস্থতাকারী এক গোপন উপায়ের দিকে ঝুঁকছে। এই ধারাটি কোনো একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর অপরিপক্বতার চেয়ে রিয়াদ আসলে কী চায় সে সম্পর্কে বেশি আলোকপাত করে; এমন এক গোয়েন্দা সক্ষমতা যা তার আঞ্চলিক অংশীদাররা একক বা সম্মিলিতভাবে সরবরাহ করতে পারবে বলে তারা মনে করে না এবং যা তিনটি কাঠামোর কোনোটিকে প্রকাশ্যে সক্রিয় করার রাজনৈতিক ঝুঁকি না নিয়েই পাওয়া সম্ভব। এর একটি সাধারণ উত্তর হতে পারে, জেরুজালেম যা দিতে পারছে, আঙ্কারা এবং ইসলামাবাদ তা দিতে সক্ষম নয়। ইসরায়েলের এই সহযোগিতার হাত বাড়ানো মূলত ঠিক এই ধরনের সামুদ্রিক পরিবেশে তাদের প্রদর্শিত গোয়েন্দা ও আইএসআর অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা। ইসরায়েল ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হরমুজ প্রণালির চারপাশে ইরানি নৌঘাঁটির অবস্থানের ওপর একাধিক স্তরের গোয়েন্দা তথ্য তৈরি করে রেখেছে। মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক বা পাকিস্তান কেউই বিশেষ করে লোহিত সাগর-বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে তুলনামূলক সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারেনি। ফলে মক্কা চুক্তি বা এমএমডিএ অংশীদারের কাছ থেকে পাওয়া সাহায্য এবং ইসরায়েলের প্রস্তাবিত গোয়েন্দা তথ্যকে সমতুল্য মনে করাটা বাস্তবতার অতিরিক্ত মূল্যায়ন ছাড়া কিছুই নয়। এছাড়া আঙ্কারা এবং সেনাবাহিনীর এই সংঘাত থেকে দূরে থাকার একটি গাঠনিক বা কাঠামোগত কারণও রয়েছে; যা স্রেফ প্রাতিষ্ঠানিক অপরিপক্বতার চেয়েও স্পষ্ট। মক্কা চুক্তি যখন চূড়ান্ত হচ্ছিল, ঠিক তখনই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান তেহরান সফর করেন। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ক বজায় রাখে তুরস্ক। ফলে ইরান-সংলগ্ন কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে সুন্নি-নেতৃত্বাধীন অভিযান সক্রিয় করা এই দুই দেশের কোনো একটির পক্ষ নেওয়ার বদলে ভারসাম্য রক্ষার যে ঘোষিত নীতি, তার পরিপন্থী হতো। বিশেষ করে পাকিস্তানের জন্য অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে ইসলামাবাদের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং দেশটিতে ইসরায়েল ব্যাপকভাবে অপ্রিয়। সৌদি-ইসরায়েল গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের পরোক্ষ বা অপ্রমাণিত সমন্বয়ের আভাসও পাকিস্তানের সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে; দেশটি বর্তমানে মক্কা সচিবালয়েরও নেতৃত্বে রয়েছে। তাই দৃশ্যমানভাবে সম্পৃক্ত না থাকাটা কেবল বিচক্ষণতাই নয়; বরং ইসলামাবাদের জন্য এটি প্রায় বাধ্যতামূলক। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বয়স মাত্র ছয় সপ্তাহ। গত ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে এর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তিন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সৌদি আরবে একটি সচিবালয় স্থাপনে সম্মত হন। যার প্রথম তিন বছর একজন পাকিস্তানি মহাসচিব প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং এই জোটের আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয় ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’। এর বাস্তবায়ন পরিচালনার জন্য একটি কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন করা হয়। এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অগ্রগতি এতটুকুই। এই চুক্তি কোনো যৌথ কমান্ড, স্থায়ী বাহিনী বা নির্দিষ্ট কোনো হামলা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া পদ্ধতি নির্ধারণ করেনি এবং এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। সেই সাধারণ অপরিপক্বতার চেয়েও বাস্তব চিত্র হলো, তুরস্কের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, আঙ্কারা চুক্তিটি আগামী অক্টোবরে সংসদে তোলা হবে। এর অর্থ চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক সপ্তাহ পরও তুরস্কে এর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি নাও হতে পারে। সেই কর্মকর্তা যেভাবে বলেছেন, মানুষ বুঝতে চায় না, তবে আমরা যা প্রতিষ্ঠা করেছি তা কেবল একটি নিরাপত্তা জোট নয়, এটি আসলে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এটি কেবল রাজনৈতিক কোনো বিষয় নয়, বরং একটি প্রকৃত আইনি সীমাবদ্ধতা এবং আঙ্কারা সামরিকভাবে অগ্রসর হতে চাইলেও তারা তা করতে পারত; এমন প্রত্যাশাকে এটি সরাসরি খর্ব করে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, সংস্থার কাঠামো, কার্যপ্রণালী এবং নীতিসমূহ চূড়ান্ত করার জন্য এখনও গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, এই ব্যবস্থাকে পরিপক্ক বলে গণ্য করার আগে প্রতিষ্ঠাতা তিন দেশকে অবশ্যই মূলনীতি ও মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো নীতিমালা তৈরি শেষ করার পরই এর পরিবর্ধন; যেখানে মিসর, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং বাংলাদেশকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ভাবা হচ্ছে—প্রক্রিয়াটি শুরু হবে। মক্কা চুক্তিটি একটি আবদ্ধ ও কার্যকর ব্লক হিসেবে কাজ করার বদলে এখনও নতুন সদস্য সংগ্রহ করছে। এতে বোঝা যায় ব্যবস্থাটি কতটা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অন্য কথায়, মক্কা চুক্তি হলো একটি রাজনৈতিক ঘোষণা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক কাঠামো মাত্র; যা অন্তত একটি স্বাক্ষরকারী দেশের রাজধানীতে এখনও আইনে পরিণত হয়নি। এটি এখন পর্যন্ত দ্রুত যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার মতো কোনো স্থায়ী কার্যপ্রণালীসহ কার্যকর সামরিক জোট নয়। ন্যাটোর সঙ্গে তুলনা এখানে অত্যন্ত উপযোগী। কারণ এই তুলনাই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিকে খণ্ডন করে। ন্যাটোর রয়েছে ৭৫ বছরের সমন্বিত সামরিক কমান্ড, ধারা-৫ এর বিস্তারিত কার্যপ্রণালী এবং অভিযানের দীর্ঘ ইতিহাস। তা সত্ত্বেও, জোট হিসেবে ন্যাটো সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান লড়াইয়ে কোনো সমন্বিত যোদ্ধা বাহিনী হিসেবে প্রবেশ করেনি। বরং বহু সদস্য দেশ সংঘাত হ্রাসের ওপর জোর দিয়েছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একটি পরিপক্ক জোটও যদি তার সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্যের অনুরোধে স্বয়ংসক্রিয়ভাবে বড় কোনো যুদ্ধে যোগ না দেয়, তাহলে একটি ছয় সপ্তাহের পুরোনো চুক্তি; যার একটি দেশের রাজধানীতে এখনও অনুমোদন পাওয়া বাকি, তা থেকে হুথিদের ওপর সরাসরি হামলার আশা করা অযৌক্তিক। সম্মিলিত-প্রতিরক্ষা অনুচ্ছেদগুলো খুব কম সময়ই ফায়ার অ্যালার্মের মতো কাজ করে। এর জন্য আক্রান্ত দেশের অনুরোধ, সদস্যদের মধ্যে পরামর্শ এবং সহায়তার রূপ কী হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। তাছাড়া হুথিদের হামলাগুলো এমন এক সংজ্ঞাগত প্রশ্ন তোলে যার উত্তর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা জনসমক্ষে দেননি; কোনো অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষ অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলের ওপর অভিযান পরিচালনা করলে সেটি কি এই চুক্তির ভাষায় বর্ণিত ‘‘সশস্ত্র হামলা’’ বলে গণ্য হবে? • চুক্তি তাহলে কীসের জন্য? মক্কা চুক্তিকে একটি দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর ব্যবস্থার চেয়ে বরং গভীর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক থাকা তিনটি দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা ভালো। রিয়াদ, আঙ্কারা এবং পাকিস্তান কেবল কোনো একক বহিরাগত শক্তির ওপর একচ্ছত্র নির্ভরতার বাইরে গিয়ে আরও বেশি বিকল্প চায়; যা তৈরি হতে দিন বা সপ্তাহ নয়, বরং বছর লাগে। তবে এর কোনো কিছুই পরিস্থিতির দৃশ্যমান নেতিবাচক প্রভাবকে আড়াল করার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রাতিষ্ঠানিক ও সক্ষমতার ব্যাখ্যাগুলোকে মেনে নেওয়ার পরও আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের সাথে তিনটি পৃথক কাঠামো; দ্বিপাক্ষিক সৈন্য মোতায়েন, একটি সামুদ্রিক জোট এবং স্বয়ং মক্কা চুক্তি—অব্যবহৃত রেখে রিয়াদ যখন ইসরায়েলের দিকে হাত বাড়ায়, তখন তা তুরস্ক ও পাকিস্তানের ভাবমূর্তির কিছুটা ক্ষতি করেই। সংকটকালে যে নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি স্মরণ করা হয় না, তা আসলে কী কাজের; এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। এটিও মনে রাখা দরকার, এই পুরো বিষয়টি এমন কিছু সংবাদমাধ্যমের অপ্রমাণিত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যাদের উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের উষ্ণ সম্পর্কের সংকেত দেওয়ার নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে; রিয়াদ বা জেরুজালেম যদি এটি সরাসরি অস্বীকার করে, তাহলে মূল প্রশ্ন অনেকটাই বদলে যায়। মক্কা চুক্তির সঠিক পরীক্ষা এটি নয় যে চলতি সপ্তাহে তুরস্ক বা পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান উড়েছে কি না। পরীক্ষা হলো, তুরস্ক সংসদীয় অনুমোদন সম্পন্ন করে কি না, সচিবালয় এখন আলোচনাধীন সনদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি চূড়ান্ত করে কি না এবং ইস্তাম্বুল বৈঠকে নির্ধারিত প্রতিরক্ষা-শিল্প সহযোগিতা ও যৌথ মহড়ার এজেন্ডা তিন দেশ এগিয়ে নিয়ে যায় কি না। আগামী মাসগুলোতে দেখার বিষয় এগুলোই; চলতি সপ্তাহের নীরবতা নয়। সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর, জেরুজালেম পোস্ট, রয়টার্স। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
