|
গরম খুন্তির ছ্যাঁকায় ক্ষতবিক্ষত ১১ বছরের তানিয়া, হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই
মোঃ মোবারক হোসেন, খাগড়াছড়ি
|
![]() গরম খুন্তির ছ্যাঁকায় ক্ষতবিক্ষত ১১ বছরের তানিয়া, হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তানিয়ার নির্যাতনের ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শিশুটির ওপর নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তানিয়া খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের করল্যাছড়ি গ্রামের দিনমজুর বেলাল হোসেনের মেয়ে। মা মারা যাওয়ার পর সংসারে অভাবের কারণে প্রায় দেড় বছর আগে মাদরাসার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তানিয়াকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠান তার বাবা। প্রতিবেশী তোফাজ্জল হোসেনের মাধ্যমে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল বলে জানিয়েছেন বেলাল হোসেন। তবে মেয়েকে ঢাকার কোথায় এবং কার বাসায় নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানতেন না বলে জানান তিনি। প্রথমে তানিয়াকে ফেনী শহরের ট্রাংক রোড বড় মসজিদসংলগ্ন একটি বাসায় এক নারীর কাছে রাখা হয়। পরে ওই নারী তাকে ঢাকায় তার বোনের বাসায় পাঠান বলে জানা গেছে। তানিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার মিরপুরের কাফরুল থানার পূর্ব শেওড়াপাড়ার একটি বাসায় তাকে রাখা হয়েছিল। ওই বাসার গৃহকর্তার নাম রাসেল এবং গৃহকর্ত্রীর নাম মোর্শেদা আক্তার ওরফে ছোটন বলে জানিয়েছে শিশুটি। রাসেলের মিরপুরে ল্যাপটপের দোকান রয়েছে এবং তার স্ত্রী একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন বলেও তানিয়া জানায়। তানিয়ার অভিযোগ, ওই বাসায় তাকে নিয়মিত নির্যাতন করা হতো। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা আক্তার ওরফে ছোটন এবং তার মেয়ে রাফাতুল তাকে মারধর করতেন বলেও অভিযোগ করেছে শিশুটি। দিনের বেশির ভাগ সময় তাকে টয়লেটে আটকে রাখা হতো বলেও দাবি তার। শিশুটির দাবি, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিদিনই তার ওপর এ ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছে। ঢাকায় যাওয়ার পর তাকে একবারও বাবার সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। ফলে এ সময়ে মেয়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার বিষয়ে কোনো ধারণাই ছিল না তার বাবার। তানিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন আগে তার মাথা ও থুতনিতে গুরুতর আঘাত করা হয়। পরে তাকে ঢাকা থেকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। খবর পেয়ে সেখান থেকে গত শুক্রবার রাত ৩টার দিকে তানিয়াকে খাগড়াছড়ি জেলা আধুনিক হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার বাবা। হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ায় বর্তমানে মেঝেতে রেখেই তার চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকরা জানান, দীর্ঘদিনের অপুষ্টি ও নির্যাতনের কারণে শিশুটির শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমনকি সে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়েও থাকতে পারছে না। মাথায় একাধিক সেলাই দেওয়া হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে পুরোনো ও নতুন আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলা আধুনিক হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, শিশুটির শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। দীর্ঘদিন অভুক্ত থাকা ও চরম নির্যাতনের কারণে তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “তার শারীরিক অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। তাকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি।” এদিকে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মিসবাহ উদ্দিন বলেন, ঘটনাটি ঢাকায় ঘটেছে। তাই খাগড়াছড়ি সদর থানায় এ বিষয়ে মামলা গ্রহণ বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে তানিয়ার ঘটনায় মামলা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। খাগড়াছড়িতে ঘটনাটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে চ্যানেল ওয়ানের খাগড়াছড়ি জেলা প্রতিনিধি দিদারুল আলম রাজুর মাধ্যমে। পরে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেন, তানিয়ার ওপর নির্যাতনের ঘটনায় মামলা করতে পরিবারকে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে এবং পরিবারের পক্ষ থেকেও কেউ বাদী হতে চাইছেন না। ফেসবুক পোস্টে দিদারুল আলম রাজু আরও লিখেছেন, অনেকেই তাকে মামলার বিষয়ে এগিয়ে আসার অনুরোধ করছেন। পাশাপাশি ঘটনাটি নিয়ে কেউ কেউ আর্থিক সমঝোতার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পরিবারের কেউ মামলা না করলে প্রয়োজনে তিনি নিজেই বাদী হয়ে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করবেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি ঢাকায় সংঘটিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ঢাকার থানা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় গুরুতর আহত শিশু তানিয়ার উন্নত চিকিৎসা, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
