|
সেই ট্রমা আজও বয়ে বেড়াই, নতুন প্ল্যাটফর্মে ২৪ ঘণ্টায় যৌন নিপীড়নের ৪৫ অভিজ্ঞতা
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() সেই ট্রমা আজও বয়ে বেড়াই, নতুন প্ল্যাটফর্মে ২৪ ঘণ্টায় যৌন নিপীড়নের ৪৫ অভিজ্ঞতা এই চিত্র উঠে এসেছে ‘আওয়াজ ডট বিডি’ https://awaz.bd/ নামের একটি নতুন প্ল্যাটফর্মে। প্ল্যাটফর্মটি গড়ে তোলা হয়েছে শিশু বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার ঘটনা তুলে ধরার জন্য। ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৪৫ জন তাঁদের শিশুবেলার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। মূলত ছেলেশিশুদের নিপীড়নের ঘটনাগুলো নিয়ে আসাই এ সাইটের লক্ষ্য ছিল। এতে মেয়েরাও তাঁদের ছোটবেলায় যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা লিখেছেন। প্ল্যাটফর্মটিতে ঢুকলে স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘আওয়াজ উঠাও’। সঙ্গে লেখা ‘আপনার নীরবতা অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়, আপনার তথ্য অপরাধ দমনে সহায়তা করে’। আরও লেখা হয়েছে, বাংলাদেশে, বিশেষত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়, শিশুদের নিপীড়নের প্রকৃত মাত্রা বোঝাতে মানুষের দেওয়া বেনামি তথ্য থেকে তৈরি পরিসংখ্যান। এখানে কোনো নাম, ছবি বা পরিচয় নেই। কোনো কুকি বা ট্র্যাকিং করা হয় না। আপনার কোনো তথ্য সংরক্ষিত থাকবে না। কেন এই প্ল্যাটফর্ম এই প্ল্যাটফর্ম তৈরির পেছনে প্রধানত কাজ করেছেন রাকিবুল হাসান (২৭) ও সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর (৪২)। রাকিবুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন। এখন অনলাইনে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। আর সালাহউদ্দীন কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করছেন, কাজ করছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। রাকিবুল হাসান গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ছেলেশিশু ধর্ষণ, বিশেষ করে মাদ্রাসায় শিশুধর্ষণের ঘটনাগুলো সামনে আসার পর এ রকম একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। অনুপ্রাণিত হয়েছেন ‘ঘুষ’ সাইট দেখে। ঘুষ সাইটটি যেভাবে মানুষের মধ্যে সাড়া ফেলেছে ও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় পৌঁছেছে, সেভাবে শিশু নিপীড়নের ঘটনাগুলো যেন সরকারকে নাড়া দেয়—সে উদ্দেশ্য নিয়েই প্ল্যাটফর্মটি করা হয়েছে। এটি কোনো হেল্প সেন্টার বা আইনি সহায়তা কেন্দ্র নয়। এটি সচেতনতা–বিষয়ক প্ল্যাটফর্ম। রাকিবুল হাসান জানান, তিনি কওমি মাদ্রাসায় পড়েছেন। ফলে মাদ্রাসার সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা আছে। তাঁরা চাইছেন, সরকার ও মাদ্রাসা বোর্ডগুলো যেন মাদ্রাসার শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়ন বন্ধে সক্রিয় হয়। আওয়াজ ডট বিডি যেন সরকারকে সক্রিয় হতে সামাজিক চাপ তৈরি করে। প্ল্যাটফর্ম চালুর পর অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছেন জানিয়ে রাকিবুল হাসান বলেন, প্ল্যাটফর্ম চালুর সময় তাঁরা শুধু মাদ্রাসায় ছেলেশিশু নিপীড়নের ঘটনাই তুলে আনার কথা ভেবেছিলেন; তবে প্ল্যাটফর্মটি সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নারী-পুরুষ সাড়া দিচ্ছেন। ভুক্তভোগীরা শিশু অবস্থায় ঘটা যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা বলছেন, অন্যদের সচেতন হতে পরামর্শ দিচ্ছেন। নিজ বাড়িতে স্বজনের কাছে বেশি শিকার প্ল্যাটফর্মে একজন পুরুষ তাঁর শিশুবেলার নিপীড়নের শিকার হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে বলেছেন, ‘আমার জীবনে এই ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। প্রথমে আপন চাচাতো ভাই আমাকে বলাৎকার করে আমাদের নিজের বাড়িতে। এমনও সময় গেছে, সে প্রতিদিন করত, প্রথম প্রথম আমি বুঝতাম না। পরে যখন বুঝ হয়, তখন নিজেই এটার মধ্যে জড়িয়ে পড়ি। আর সত্যি কথা বলতে, এই কাজগুলো শুধু মাদ্রাসায় হয় যে তা কিন্তু নয়, বরং আমার জানামতে, বর্তমানে অনেক লোকই এই ঘৃণ্য কাজের সাথে জড়িত।’ আরেক নারী পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় যৌন নিপীড়নের কথা তুলে ধরে লিখেছেন, ‘আমার এক মামাতো ভাই আমাকে পড়াতে বাসায় আসতেন, তিনি মাঝে মাঝে আমাদের সঙ্গে বাসার উঠানে বা বারান্দায় ক্রিকেটও খেলতেনএকদিন বাসায় আম্মু ছিল না, অন্য খেলার কথা বলে আমার রুমে নিয়েএখনো এসব কথা মনে হলে গা শিউরে ওঠে।’ ৪৫টি অভিযোগকে পরিসংখ্যানগতভাবে তুলে ধরা হয়েছ প্ল্যাটফর্মটিতে। ছেলে ও মেয়ে ভুক্তভোগীর পৃথক তথ্য দিয়ে জানানো হয়েছে, ভুক্তভোগীদের ৬৪ শতাংশ পুরুষ। ছেলেদের ক্ষেত্রে ৩২ শতাংশ পরিচিত, ২৬ শতাংশ বিশ্বস্ত পরিচিত, ১৬ শতাংশ নিকটাত্মীয়, ১০ শতাংশ দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ পরিচিত, ১৪ শতাংশ বিশ্বস্ত পরিচিত, ১৪ শতাংশ নিকটাত্মীয়, ৪৩ শতাংশ দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে ঘটেছে। এ ছাড়া অপরিচিত ও অন্যদের মাধ্যমেও ঘটেছে। প্রতি পাঁচজনের একজন পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে নিপীড়নের শিকার হয়েছে। নিপীড়নের ৫৬ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে বাড়িতে। এর মধ্যে ৫৪ শতাংশ নিজের বাড়িতে, ১৯ শতাংশ অভিযুক্তের বাড়িতে ও ১৫ শতাংশ নিজ আত্মীয়ের বাসায় ঘটেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিপীড়নের ভয়াবহতা একজন লিখেছেন, ‘তখন আমি দেশের নামকরা একটা কওমি মাদ্রাসায় পড়ি। আমাদের পাশের রুম ছিল বড় ছাত্রদের থাকার রুম।একদিন আমার অনেক জ্বর। আমি ঘুমিয়েছিলাম।’ এরপর তিনি নিপীড়নের ঘটনা বর্ণনা দিয়ে লেখেন, তাঁর স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়েছিল ওই বড় ছাত্র। ওই ব্যক্তি আরও লিখেছেন, ‘সকল আবাসিক প্রতিষ্ঠানে এসব বিষয়ে খুবই নজরদারি করা দরকার। নিষ্পাপ শৈশব কেন এসব অমানুষের কবলে পড়ে নষ্ট হবে। বাচ্চাদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে কেন একটা মাদ্রাসা–স্কুল চালু করার সাহস করবে।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘গ্রামের কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়তাম। হেড স্যারই প্রাইভেট পড়াতেন। পড়াশোনা ভালো হওয়ার জন্য রাতেও স্কুলে থাকতাম আমরা বেশ কয়েকজন। এ সময় বড় ক্লাসের এক ছেলের দ্বারা কয়েকবার নিগ্রহের শিকার হয়েছি। আজও সেই ট্রমা বয়ে বেড়াই।’ প্ল্যাটফর্মের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন ৩৬ শতাংশ। ধর্মীয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৫৬ শতাংশ কওমি মাদ্রাসায়, ১৯ শতাংশ স্কুলে নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া মসজিদ, আলিয়া মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখ রয়েছে। কেউ কেউ লিখেছেন, এভাবে শিশু অবস্থায় নিপীড়নের শিকার হওয়া নিপীড়ক করে তোলে। একজন পুরুষ লিখেছেন, ছোটবেলায় যখন আমি নানাবাড়িতে বড় হই, তখন নানাবাড়ির পাশে সম্পর্কে মামাতো ভাই আমাকে মাঝে মাঝে জঙ্গলে নিয়ে যেত। খারাপ কাজ করত। একটু বড় হওয়ার পরে স্কুলের বন্ধু, সেও সময় সুযোগে এ রকম খারাপ কাজ করত। সত্যি কথা বলতে, এটা এতটাই ভয়াবহ, এতটাই বীভৎস যে কল্পনার বাইরে! তাদের এই কাজগুলো দেখে পরবর্তী সময়ে আমিও এসব কাজে জড়িয়ে পড়েছিলাম। শিশুদের নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা করতে মা–বাবাকেও সচেতন থাকা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। এক নারী লিখেছেন, গা ঘিন ঘিন করছে। জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছে কয়েকটা জানোয়ার।খালাতো ভাই ছিল সর্বপ্রথমবার। খেলার নাম করে নানাবাড়িতে কী কী যেন করেছিল আর বলতে মানা করেছিল। মা–বাবা খুব বিরক্ত হতো আর রাগ করত আত্মীয়দের কাছে যেতে না চাইলে। মা–বাবা যদি একটু সচেতন হতো, জীবনটা অন্ধকার হয়ে যেত না। জাতীয় সংকট বিবেচনা করে ব্যবস্থা নিতে হবে শিশুরাই সব সংগঠনের আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, যৌন নির্যাতনের ধরন শিশুদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। বড় হওয়ার পর সেসব ঘটনা তাদের স্বাভাবিক জীবনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। ঘরে–বাইরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিশুকে খারাপ স্পর্শ, ভালো স্পর্শ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। কোনো ভয় ছাড়া শিশু যেন মা–বাবা বা শিক্ষকদের কাছে অভিযোগ জানাতে পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, শিশুদের প্রতি যৌন নিপীড়ন এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এটাকে জাতীয় সংকট বিবেচনা করে সরকারকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে নেতৃত্ব দিতে হবে।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
