|
মিছিল-শোভাযাত্রা-র্যালি-লংমার্চ: রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো কখন, কীভাবে এলো?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() মিছিল-শোভাযাত্রা-র্যালি-লংমার্চ: রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো কখন, কীভাবে এলো? কিন্তু এসব কর্মসূচির শুরু কোথা থেকে? ‘মিছিল’ আর ‘শোভাযাত্রা’ কি একই বিষয়? ‘র্যালি’ কীভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হলো? আর ‘লংমার্চ’ নামটিই বা রাজনৈতিক অভিধানে কীভাবে ঢুকলো? ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এসব শব্দ ও কর্মসূচির শিকড় এক নয়। কোনোটি বহু শতাব্দী পুরোনো সামাজিক-ধর্মীয় প্রথা থেকে এসেছে, কোনোটি আধুনিক গণরাজনীতির বিকাশের সঙ্গে জনপ্রিয় হয়েছে। আর ‘লংমার্চ’ শব্দটি রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে বিংশ শতাব্দীতে। মিছিলের শুরু কোথায় বাংলা ‘মিছিল’ শব্দটির অর্থ হলো কোনও উদ্দেশ্যে বহু মানুষের একতাবদ্ধভাবে একদিকে যাত্রা করা বা শোভাযাত্রা। বাংলা অভিধানে শব্দটির উৎস হিসেবে আরবি ‘মিস্ল’ উল্লেখ করা হয়েছে। শব্দটির অর্থের বিবর্তনও লক্ষণীয়—একই ধরনের চিন্তা বা উদ্দেশ্যসম্পন্ন মানুষের দল থেকে ধীরে ধীরে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে চলার অর্থে ‘মিছিল’ শব্দটির ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ ‘মিছিল’ নিজেই শুরুতে রাজনৈতিক শব্দ ছিল—এমনটি বলা ঠিক হবে না। মানুষ যখন কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, দাবি, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজন বা উৎসবকে সামনে রেখে দলবদ্ধভাবে চলেছে, তখন থেকেই এ ধরনের চলমান জনসমাগমের প্রচলন দেখা যায়। আধুনিক রাজনৈতিক মিছিলের বৈশিষ্ট্য হলো—এটি শুধু এক জায়গায় মানুষের জমায়েত নয়; বরং মানুষ একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও বার্তা নিয়ে প্রকাশ্য সড়কে একসঙ্গে এগিয়ে যায়। ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড, স্লোগান ও প্রতীকের মাধ্যমে নিজেদের দাবি বা রাজনৈতিক পরিচয়ও তুলে ধরে। ইউরোপের রাজনৈতিক ইতিহাসেও জনসমাগম ও শোভাযাত্রার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। লন্ডনে ১৭৮০ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে শত শত নাগরিক, রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনের শোভাযাত্রার নথি পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদদের গবেষণা বলছে, আঠারো শতকের শেষভাগে গণতান্ত্রিক সংস্কার আন্দোলনের বিকাশের সঙ্গে রাজনৈতিক মিছিল নতুন ধরনের গণরাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে শক্তিশালী হতে থাকে। রাজনীতি আসার আগে থেকেই শোভাযাত্রার প্রচলন ‘শোভাযাত্রা’ মূলত বহু মানুষের একসঙ্গে, সাধারণত কিছুটা আনুষ্ঠানিক বা উৎসবমুখর পরিবেশে যাত্রা করা। বাংলাদেশের সরকারি অভিধানেও ‘শোভাযাত্রা’র অর্থ দেওয়া হয়েছে—‘বহু লোকের সমারোহের সঙ্গে একত্রে যাত্রা বা গমন; মিছিল’। ইংরেজি ‘প্রসেশন’ (procession) শব্দটির ইতিহাস আরও পুরোনো। শব্দটি লাতিন ‘প্রসেসিও’ (processio) থেকে এসেছে, যার মূল অর্থ এগিয়ে যাওয়া বা সামনে অগ্রসর হওয়া। মধ্যযুগীয় ইউরোপে ধর্মীয় শোভাযাত্রা ছিল এর অন্যতম প্রচলিত ব্যবহার। পরে সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আয়োজনেও ‘প্রসেশন’ ব্যবহৃত হতে থাকে। তাই শোভাযাত্রাকে কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ধর্মীয় উৎসব, রাজকীয় অনুষ্ঠান, বিজয় উদ্যাপন, সামাজিক আয়োজন—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার ছিল। আধুনিক রাজনৈতিক দলগুলো সেই পুরোনো গণচলাচলের রীতিকে নিজেদের রাজনৈতিক বার্তা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশেও ‘শোভাযাত্রা’ শব্দটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। অনেক ক্ষেত্রে সমাবেশের আগে বা পরে শোভাযাত্রা বের করা হয়। আবার কোনও কোনও দল একই কর্মসূচিকে ‘মিছিল’ বা ‘র্যালি’ হিসেবেও অভিহিত করে। ফলে বাস্তবে শব্দগুলোর ব্যবহারের মধ্যে কিছুটা ওভারল্যাপ তৈরি হয়েছে। র্যালি কীভাবে রাজনৈতিক শব্দ হলো ‘র্যালি’ শব্দটির মূল ইংরেজি র্যালি (rally)। এর প্রাচীন অর্থের মধ্যে ছিল ছড়িয়ে পড়া মানুষকে আবার একত্র করা বা ঐক্যবদ্ধ করা। ফরাসি র্যালিয়ার (rallier) এবং পুরোনো ফরাসি র্যালিয়ার (ralier) থেকে ইংরেজি র্যালি (rally) শব্দটির উৎপত্তি। ‘মানুষকে কোনও কর্মের জন্য একত্র করা’ অর্থটি পরে বিকশিত হয়। বর্তমানে ইংরেজিতে পলিটিক্যাল র্যালি (political rally) বলতে সাধারণত কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বড় সংখ্যক মানুষের সমাবেশকে বোঝানো হয়। এখানে ‘মিছিল’-এর সঙ্গে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মিছিলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের চলমান অবস্থান—এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দলবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়া। আর র্যালি বা সমাবেশের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এক জায়গায় সমবেত হওয়া। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুটি প্রায়ই একসঙ্গে দেখা যায়। যেমন—প্রথমে নেতাকর্মীরা মিছিল বা র্যালি করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছালেন, এরপর সেখানে সমাবেশ হলো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মসূচির সংবাদেও ‘র্যালি ও সমাবেশ’ কিংবা ‘সমাবেশ শেষে র্যালি’—এ ধরনের ব্যবহার নিয়মিত দেখা যায়। তাহলে ‘লংমার্চ’ কোথা থেকে এলো ‘লংমার্চ’ শব্দটির রাজনৈতিক ইতিহাস সবচেয়ে স্পষ্টভাবে যুক্ত চীনের কমিউনিস্টদের ঐতিহাসিক লং মার্চের (Long March)-এর সঙ্গে। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির রেড আর্মি কুওমিনতাঙ বাহিনীর সামরিক চাপের মুখে তাদের ঘাঁটি থেকে দীর্ঘ পশ্চাদপসরণ করে। এই ঐতিহাসিক অভিযাত্রাই পরে ‘লং মার্চ’ (Long March) নামে পরিচিত হয়। মাও সেতুংসহ কমিউনিস্ট নেতৃত্বের একটি বড় অংশ এই অভিযাত্রার মধ্য দিয়ে নতুন ঘাঁটি ইয়ানানে পৌঁছায়। এটি ছিল নিছক রাজনৈতিক সভা বা প্রতিবাদ মিছিল নয়; বরং চীনের গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একটি দীর্ঘ সামরিক পশ্চাদপসরণ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ‘লং মার্চ’ (Long March) রাজনৈতিক সংগ্রাম, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এবং বড় লক্ষ্য অর্জনের প্রতীকী ধারণায় পরিণত হয়। সেখান থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে ‘লংমার্চ’ শব্দটি নতুন অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে—দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে কোনো নির্দিষ্ট দাবি বা রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে গণঅভিযাত্রা। বাংলাদেশে ‘লংমার্চ’-এর ঐতিহাসিক ব্যবহার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘লংমার্চ’ শব্দটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো ১৯৭৬ সালের ফারাক্কা লংমার্চ। মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে রাজশাহী থেকে ফারাক্কা অভিমুখে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে লংমার্চ শুরু হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ এতে অংশ নেন। সমকালীন বর্ণনা অনুযায়ী, লংমার্চটি রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট অভিমুখে এগোয়। এর লক্ষ্য ছিল ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের ওপর পড়া প্রভাবের প্রতিবাদ এবং গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি সামনে আনা। ১৯৭৬ সালের ১৪ মে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের একটি কূটনৈতিক তারবার্তাতেও ভাসানীর ‘লংমার্চ টু ফারাক্কা’ (Long March to Farakka)-এর প্রস্তুতি, রাজশাহীতে সমাবেশ এবং সেখান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে যাত্রার কথা নথিবদ্ধ হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে ‘লংমার্চ’ শব্দটির একটি নিজস্ব ঐতিহাসিক তাৎপর্য তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে কোনও রাজনৈতিক দল বা সংগঠন যখন দূরবর্তী কোনও গন্তব্যের দিকে দীর্ঘ পথের গণযাত্রাকে কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা করেছে, তখন ‘লংমার্চ’ শব্দটি তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কেন রাজনৈতিক দলগুলো এসব কর্মসূচি নেয় রাজনৈতিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য শুধু দাবি জানানো নয়; একই সঙ্গে জনসমর্থন প্রদর্শন, সংগঠনের শক্তি দেখানো, সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঊনবিংশ শতকে ব্রিটেনে রাজনৈতিক মিছিলের বিকাশ নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জনসমাগমের মাধ্যমে রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্থান দখল করা রাজনৈতিক আন্দোলনের সংগঠন ও শক্তি প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। মিছিলের পথও ইচ্ছামতো নির্ধারিত হতো না; আইন, পুলিশি নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অবস্থান—সবকিছুই এতে প্রভাব ফেলত। এই বৈশিষ্ট্য আজকের রাজনীতিতেও কমবেশি একই। কোনো কর্মসূচি সংসদ, সচিবালয়, দলীয় কার্যালয়, শহীদ মিনার, জাতীয় প্রেস ক্লাব কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সড়ককে কেন্দ্র করে হলে তার প্রতীকী রাজনৈতিক গুরুত্বও বেড়ে যায়। একই কর্মসূচির নাম কেন বদলে যায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মিছিলকে কখনও ‘র্যালি’, কখনও ‘শোভাযাত্রা’, আবার কখনও ‘পদযাত্রা’ বলা হয়। এর কারণ, এগুলোর ব্যবহার অনেকটাই রাজনৈতিক দলের নিজস্ব ভাষা ও কর্মসূচির ধরননির্ভর। কোনো দল ‘শোভাযাত্রা’ বললে সেখানে উৎসব বা আনুষ্ঠানিকতার আবহ থাকতে পারে। ‘মিছিল’ শব্দটি সাধারণত প্রতিবাদ, দাবি বা আন্দোলনের সঙ্গে বেশি যুক্ত। ‘র্যালি’ অপেক্ষাকৃত আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষা। আর ‘লংমার্চ’ নামটি ব্যবহার করলে কর্মসূচির দীর্ঘ পথ, গন্তব্য এবং আন্দোলনের দৃঢ়তা—এই তিনটি বিষয়কে সামনে আনা হয়। অর্থাৎ শব্দগুলোর মধ্যে কিছু অর্থগত পার্থক্য থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেগুলোর সীমানা সব সময় কঠোর নয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এর তাৎপর্য মিছিল, শোভাযাত্রা কিংবা লংমার্চ—সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে জনগণের দৃশ্যমান অংশগ্রহণ। সংসদ, সংবাদ সম্মেলন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরে রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি রাজনৈতিক দাবি ও জনমতের একটি দৃশ্যমান রূপ তৈরি করে। তবে ইতিহাস বলছে, এসব কর্মসূচি শুধু শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম নয়; এগুলো জনপরিসর ব্যবহারের অধিকার, রাজনৈতিক মত প্রকাশ এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কেরও অংশ। আঠারো ও উনিশ শতকের ইউরোপীয় গণআন্দোলন থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন—বিভিন্ন সময়ে রাস্তায় মানুষের সম্মিলিত উপস্থিতি রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়েছে। বাংলাদেশে তাই ‘মিছিল’, ‘শোভাযাত্রা’ কিংবা ‘লংমার্চ’ কেবল কয়েকটি কর্মসূচির নাম নয়; এগুলো দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘ বিবর্তনের অংশ। এর মধ্যে ‘মিছিল’ ও ‘শোভাযাত্রা’র শিকড় অনেক পুরোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চায়, ‘র্যালি’ আধুনিক গণরাজনীতির ভাষায়, আর ‘লংমার্চ’ বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে ধার করা একটি শক্তিশালী প্রতীক—যার বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় ১৯৭৬ সালের ফারাক্কা লংমার্চ।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন এবং দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখবে অতিথি ডট কম : লায়ন সাইফুল ইসলাম সোহেল
অত্যাধুনিক ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণায় বেক্সিমকো ফার্মা ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীদারত্ব
মিছিল-শোভাযাত্রা-র্যালি-লংমার্চ: রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো কখন, কীভাবে এলো?
চাইনিজ তাইপেকে উড়িয়ে দিলো বাংলাদেশের মেয়েরা
