|
হেরে যাবে জেনেও কেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াত জোট?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() হেরে যাবে জেনেও কেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াত জোট? তাহলে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা জেনেও কেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। কেউ মনে করছেন, এটি সরকারের সঙ্গে সমঝোতার অংশ; কেউ দেখছেন রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার কৌশল হিসেবে। তবে জামায়াতের নেতাদের বক্তব্য, জয়-পরাজয় নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়াই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী দলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নজির বিরোধী দল থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ১৯৯১ সালে বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ওই নির্বাচনে দলটির প্রার্থী ছিলেন বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। সেবার বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। এরপর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীরাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে প্রায় ৩৫ বছর পর এবার বিরোধী জোটের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ‘জয়-পরাজয় বিষয় নয়’ হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা জেনেও কেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া—এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যজোটের সমন্বয়ক ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ গণমাধ্যমকে বলেন, “জয়-পরাজয় বিষয় নয়। আমরা আগে কখনও বিরোধী দলে ছিলাম না, এখন আছি। আমাদের যেহেতু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ আছে, তাই আমরা অংশ নিচ্ছি। এখানে গণতান্ত্রিক পন্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। পাশাপাশি সংস্কারের একটা বিষয়ও আছে। সংস্কার মানে এখানে পদ্ধতিগত সংস্কারও আসবে।” তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দল আগেও প্রার্থী দিয়েছে। বিরোধী দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে নির্বাচনের স্বচ্ছতাও বজায় থাকে।” রাষ্ট্রপতি পদে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মনোনয়ন প্রসঙ্গে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “আমরা একজন যোগ্য, পরিচ্ছন্ন এবং সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রার্থী করেছি। জামায়াত সবসময় উদারতা দেখিয়েছে। আমরা নারী সংরক্ষিত আসনে একজন শহীদের মাকে দিয়েছি। এছাড়াও আমাদের দুটি সংরক্ষিত আসন অন্য দুটি দলকে ছেড়ে দিয়েছি। আমরা বারবার প্রমাণ দিয়েছি, দলীয় সংকীর্ণতা নয়, উদারতাই একটি রাষ্ট্রকে সুন্দর করে গড়তে সাহায্য করে।” বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, “বিএনপি সেই জায়গায় শুধু সংকীর্ণতা দেখিয়েছে। তারা কেবল দলীয়করণেই ব্যস্ত। তাদের স্লোগান—সবার আগে বাংলাদেশ; অথচ কার্যকলাপে সবার আগে বিএনপি।” রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ফলাফলকে তারা মূল বিষয় হিসেবে দেখছেন না। ফলাফল যা-ই হোক, তাতে কিছু যায় আসে না; অংশগ্রহণই বড় বিষয়। গণতান্ত্রিক চর্চার ধারাবাহিকতা ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২১১টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিএনপি। জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৬৮টি আসন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত। তবে এটিকে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে দেখছেন কুড়িগ্রাম-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “কর্নেল অলি ছাড়াও বেশ কয়েকজন আমাদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী তালিকায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে তাকেই প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা গণতান্ত্রিক চর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এখানে অংশগ্রহণ করেছি।” তিনি আরও বলেন, “যেহেতু মোটামুটি ভালো গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন হয়েছে, আমরা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছি। সেই হিসেবে সব ধরনের গণতান্ত্রিক অধিকারেই আমরা অংশগ্রহণ করব।” বিরোধী দলের অংশগ্রহণকে ইতিবাচক দেখছে বিএনপি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিএনপির লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও সরকারদলীয় হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণকে আমি ব্যক্তিগতভাবে ইতিবাচকভাবে দেখছি। এটা গণতন্ত্রের জন্য ভালো একটা আচরণ।” তিনি বলেন, “বিরোধী দল ফেল করবে জেনেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা বা সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা জনগণকে একটি ক্লিয়ার মেসেজ দেয় যে সংসদে এবং সর্বত্রই গণতান্ত্রিক অধিকার বজায় রয়েছে।” তার মতে, এর মধ্য দিয়ে বিরোধী জোট যে ‘পুতুল বিরোধী দল’ নয়, সেই বার্তাও যাচ্ছে। তার ভাষ্য, তারা বিপ্লব করে, সার্বভৌমত্ব ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আজকের এই অবস্থানে এসেছে। তাদের এই অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে সর্বমহলে প্রশংসিত হবে। জয় নয়, রাজনৈতিক বার্তাই কি মূল লক্ষ্য? সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার শুধু সংসদ সদস্যদের। বর্তমান সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবু বিরোধী জোটের প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তকে শুধু জয়-পরাজের হিসাব দিয়ে দেখলে বিষয়টির রাজনৈতিক তাৎপর্যের পুরোটা ধরা পড়ে না। তিন দশকেরও বেশি সময় পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফিরছে। ফলে নির্বাচনে জয় পাওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও সংসদে বিরোধী দলের অবস্থান, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানানোর সুযোগ পাচ্ছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। উল্লেখ্য, গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
