|
মতিঝিল-সাভারে বোমা
আইইডির নেপথ্যে কারা, বিদেশি অর্থায়নের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দারা
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() আইইডির নেপথ্যে কারা, বিদেশি অর্থায়নের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দারা তবে কীভাবে, কোন মাধ্যমে এবং কত টাকা এসেছে সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলেনি। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটসহ একাধিক আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, পুরোনো উগ্রবাদী প্ল্যাটফর্মগুলো আবারও নতুনভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। আর তাদের সক্রিয়তা জানান দিতেই সাভার ও মতিঝিলে বোমা রাখা হয়েছে। বিশেষ করে জেএমবি, নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে বা সক্রিয়তা দেখানোর সামর্থ্য রয়েছে। তবে এই সংগঠনগুলোই এই দুই ঘটনার সঙ্গে জড়িত এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, আবার তাদের জড়িত হওয়ার সম্ভাবনাকে একবারে উড়িয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। গোয়েন্দারা এমনও তথ্য পাচ্ছেন যে, পুরোনো উগ্রবাদী সংগঠনগুলো থেকে কিছু সদস্য একত্রিত হয়ে নতুন একটি সংগঠন তৈরি করে থাকতে পারেন। আর এই নতুন সংগঠনের অস্তিত্ব জানান দিতেই ঘটনা দুটি ঘটানো হয়েছে। এই দুই ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সরকারের একাধিক সংস্থা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। এর মধ্যে একটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, পুরাতন কোনো সংগঠন নয়, বরং নতুন একটি উগ্রবাদী সংগঠনের ‘ফুট-প্রিন্ট’ পাওয়া যাচ্ছে এই দুই ঘটনার পেছনে। এই সংগঠনের নাম আগে শোনা যায়নি বা তাদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সম্প্রতি এই সংগঠনটি সংগঠিত হয়েছে। সংগঠিত হওয়ার পরই তারা আস্তে আস্তে নিজেদের গুছিয়ে মতিঝিল ও সাভারে বোমা রেখে নিজেদের অস্তিত্বের কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া ফার্মগেট মেট্রো রেল স্টেশন ও মিরপুর মেট্রো রেল স্টেশন এলাকায় যে আতঙ্ক ছড়ানো হয়েছে, সেটির পেছনেও এই সংগঠনের হাত থাকতে পারে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে উগ্রবাদ নিয়ে কাজ করা আরেকটি সংস্থার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, নতুন কোনো রিক্রুটমেন্টের মাধ্যমে নতুন কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের সৃষ্টি হয়েছে বলে তাদের কাছে তেমন কোনো তথ্য নেই। তবে পুরাতন সংগঠনের কিছু সদস্য মিলে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে থাকতে পারে। নতুন প্ল্যাটফর্ম হলেও এর ডিজাইন বা কাজের ধরন আগের সংগঠনগুলোর মতোই হওয়ার কথা বলে মনে করেন তিনি। অন্যদিকে মতিঝিল ও সাভারে বোমা পাওয়ার ঘটনা দুটি তদন্ত করছে ডিএমপির সিটিটিসি। সিটিটিসি সূত্রে জানা যায়, এই দুই ঘটনা একই সূত্রে গাথা। ঘটনা দুটি একই লোক কিংবা একই উগ্রবাদী সংগঠনের কাজ। তদন্তে এখন পর্যন্ত উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, এই দুই ঘটনার সঙ্গে ৪ থেকে ৫ জন উগ্রবাদী জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। বোমা বানানো থেকে শুরু করে বোমা রাখা পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি এই ৪-৫ জনই সম্পন্ন করেছে। তাদের শনাক্তের কাজ চলছে এবং শনাক্ত করা গেলেই দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে। সিটিটিসি সূত্রে আরও জানা যায়, মতিঝিল ও সাভারে রাখা বোমাগুলো আইইডি হলেও খুব শক্তিশালী ছিল না। শুধুমাত্র বোমা বানাতে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। তবে তাদের পরিকল্পনা করতে এবং বোমা নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে তাদের আরও পর্যাপ্ত কিছু অর্থ খরচ হয়ে থাকতে পারে। আর এই বোমাগুলো অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন ভিডিও দেখে বানানো হতে পারে। বোমাগুলো যদি বিস্ফোরণ ঘটানো হতো, খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি না হলেও ঘটনাস্থলেই ৩-৪ জনের প্রাণহানি হতে পারতো এবং বোমার ভেতরে থাকা স্প্লিন্টারের কারণে আরও বেশ কিছু মানুষ আহত হতো। তবে এখন পর্যন্ত তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বোমাগুলো বিস্ফোরণ ঘটানোর কোনো উদ্দেশ্য তাদের ছিল না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই দুই ঘটনার তদন্তে সরাসরি জড়িত থাকা সিটিটিসির এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বোমাগুলো আইইডি হলেও খুব শক্তিশালী ছিল না। তাদের তদন্ত অনুযায়ী বোমাগুলোর কাঁচামাল ঢাকা থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে। বোমায় ব্যবহৃত কেমিক্যাল সম্ভবত তিনটি জায়গা থেকে সংগৃহীত হতে পারে, পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউন বা দোকান থেকে, কোনো মেডিকেল ল্যাবরেটরি থেকে ডাক্তার পরিচয় বা এই সংশ্লিষ্ট পেশার লোকের পরিচয়ে এবং পুরান ঢাকার কোনো একটি স্বর্ণের দোকান থেকে। তিনটি জায়গা থেকে বোমায় ব্যবহৃত কেমিক্যাল সংগ্রহ করা হয়েছে বলে তথ্য এলেও সেগুলো বর্তমানে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে বোমাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এখানে অতিরিক্ত মাত্রায় কোনো কেমিক্যালের ব্যবহার ছিল না। ঘটনা দুটির তদন্তে থাকা একাধিক সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুটি বোমা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে যাওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল উগ্রবাদীদের সক্রিয়তা জানান দেওয়া। কোনোভাবেই বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর সিদ্ধান্ত উগ্রবাদীরা নেয়নি। তারা যে মাঠে আছে এবং তাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান দেওয়ার জন্যই মতিঝিল ও সাভারে বোমা রাখা হয়েছে। সার্বিক তদন্তের বিষয়ে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, তাদের সন্দেহের তালিকায় বেশ কয়েকটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা রয়েছেন। এই দুটি বোমা রাখার মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেওয়া এবং দেশে একটা অরাজক পরিবেশ সৃষ্টি করা। তবে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল বলে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি; কারণ বিস্ফোরণ ঘটাতে চাইলে তারা খুব সহজেই তা করতে পারতো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খবর পাওয়ার খুব অল্প সময় আগেই বোমাগুলো রাখা হয়েছিল। আর বিস্ফোরণের উদ্দেশ্য থাকলে ভিড়ের মধ্য থেকে খুব সহজেই এই ধরনের আইইডি বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব ছিল। মতিঝিলের ঘটনা এবং মিরপুরের বোমা আতঙ্কের ক্ষেত্রে কোনো সিসিটিভি ফুটেজ না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, দুটি বিষয়কেই তারা গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দেখছেন। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় যে স্থানে বোমা রাখা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছিল, সেখানে কেন সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যাচ্ছে না, তা কোনো অপরাধমূলক পরিকল্পনার অংশ কি না, তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, উগ্রবাদী সংগঠনগুলো তাদের পুরোনো দাবি ও আদর্শকে নিয়ে যে সক্রিয়তা দেখানোর চেষ্টা করছে, তা ভবিষ্যতে মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। একটা সময় এসে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা করতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে যায়। তবে তারা এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে কাজ করছেন। এই দুই ঘটনায় নির্দিষ্ট কোনো সংগঠন বা ব্যক্তিকে এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। আনসারুল ইসলাম, জেএমবি থেকে শুরু করে নব্য জেএমবিসহ নানা সংগঠনের নাম তদন্তে উঠে এলেও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত বা সন্দেহ করা গেলেও তাদের বিরুদ্ধেও চূড়ান্ত তথ্য নেই। তবে সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে এর পেছনে যারা জড়িত তাদের প্রমাণসহ আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি জানান। এদিকে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মতিঝিল ও সাভারের ঘটনার পর রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে গত ১ আগস্ট পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন্স নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনায় ডিউটিরত ও থানা-পুলিশ লাইনসে রাখা পুলিশের যানবাহনের নিরাপত্তা বাড়ানো, নিয়মিত টহল জোরদার এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি ও বস্তু শনাক্তে বিশেষ সতর্ক থাকতে বলা হয়। যদিও পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, এটি কোনো নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নয়; সদস্যদের সর্বদা সতর্ক রাখতে দেওয়া নিয়মিত নির্দেশনারই অংশ। এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলামও বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বোমা-আতঙ্ক ও গুজব ছড়ানোর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সদস্যদের আরও সতর্ক থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিতেই ওই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো গোয়েন্দা তথ্য নেই বলেও তিনি জানিয়েছেন। তবে মতিঝিলের আইইডি উদ্ধারের ঘটনায় সিটিটিসির পাশাপাশি ডিবিও ছায়া তদন্ত করছে এবং জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর আগে ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতরে রাখা একটি আইইডি উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে সন্দেহজনক বস্তা এবং ফার্মগেট ও মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশনে সন্দেহজনক ব্যাগ উদ্ধারের ঘটনাও জনমনে আতঙ্ক তৈরি করে। যদিও পরবর্তী ঘটনাগুলোতে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। একই সময়ে মতিঝিলের আইইডি তদন্তে অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘটনাস্থলের কার্যকর সিসিটিভি ফুটেজ না পাওয়া। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ফুটেজের অভাবে আইইডি বহনকারী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের গতিবিধি শনাক্তে বেগ পেতে হচ্ছে, ফলে গোয়েন্দা তথ্য, আলামত ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের সমন্বয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত ২৪ জুলাই রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি ছাতার ভেতর থেকে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার করে ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল। নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। পরে ৩ আগস্ট সাভারের হেমায়েতপুর এলাকার একটি সড়কের পাশ থেকে আরও একটি আইইডিসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। সেটিও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, দুটি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র থাকতে পারে। সে কারণে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা একই সূত্র ধরে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
