|
জুতার ছাপের সূত্র ধরে যেভাবে বেরিয়ে এলো নারী চিকিৎসকের খুনী
নতুন সময় প্রতিনিধি
|
![]() জুতার ছাপের সূত্র ধরে যেভাবে বেরিয়ে এলো নারী চিকিৎসকের খুনী ওই হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্তে নেমে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয় নিহত সারাহ রোকসানা পিনুর স্বামী সোহেল রানাকে। পিনুর লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ বলেছিল, বাসার গ্রিল কেটে ভেতরে ঢুকে দুর্বৃত্তরা ওই নারীকে হত্যা করে এবং ঘরের জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। তবে জানালার যে অংশে গ্রিল কাটা হয়, সেই জানালার ভেতরের অংশের বারান্দায় একটি জুতার ছাপ পান সিআইডির সদস্যরা। এরপর বাসায় পাওয়া একজোড়া জুতার ছাপের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়। ওই জুতা ছিল সোহেল রানার। পিনুকে খুনের ঘটনায় তার বোন সারাহ সুলতানা পলি শুক্রবার অজ্ঞাতদের বিবাদী করে এ মামলা করেন। শনিবার ( ৮ জুলাই) সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণখান থানার এসআই হাবিবুর রহমান। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাৎ আসামিকে কারাগারে পাঠিয়ে সোমবার রিমান্ড শুনানির দিন রেখেছেন বলে জানান প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই আবু বক্কর সিদ্দিক। পিনুর স্বামী সোহেল রানা উত্তরা পশ্চিম থানার ৭ নম্বর সেক্টরে ডেভেলপার কোম্পানিতে সহকারি ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করেন। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে পিনু ছিল সবার ছোট। পিনুর ১৬ বছরের ছেলে সালেহীন ওহি মাদ্রাসায় ৮ম শ্রেণিতে পড়ে। ১০ বছরের মেয়ে হাসিন ওয়ামী পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। পিনুর বড় বোন পান্না বলেন, "সোহেলকে আমরা আগেই সন্দেহ করেছিলাম। আমার বোন ফোন করে বলত, ও পরকীয়া করে; চরিত্র খারাপ। ওর জ্বালায় বাসার কাজের মেয়ে টিকত না, পাশের বাসার ভাড়াটিয়াও বেশিদিন থাকতে পারতো না। বাইরের কেউ বাসায় যেতে পারত না। এমনকি পিনুর মেয়ের বান্ধবীর মাকেও সে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। তারা স্বামী-স্ত্রী বাসায় এসে বিষয়টি পিনুকে বলে গেছে।" তিনি বলেন, "দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে পিনু সংসারে টিকে ছিল। আমাদের ফোন করে বলত, আপা, আমি যদি খুন হই, তাহলে সোহেলকে ছাড়বে না। ওর সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করবে। ও ওর স্বামীকে ভালো করার অনেক চেষ্টা করেছে। “আমার বোনটা ডেন্টিস্ট। কিন্তু সোহেল ওকে চাকরি করতে দিতে না। ওই আমার বোনকে খুন করেছে, ওর সর্বোচ্চ সাজা চাই, মৃত্যুদণ্ড চাই।" মামলার বাদী সারাহ সুলতানা পলি বলেন, "পিনু আমাদের ফোন করে কান্না করে বলত, সোহেল আমাকে মেরে ফেলবে। ছাড়বে না। আমি খুন হলে তোমরা ওকে ছাড়বে না। ওর শাস্তি চাইবে। শুধু একথা বলত। বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে সংসারে পড়ে ছিল। “আগে একবার পিনুকে মারধর করে রক্তাক্ত করে বাসা থেকে বের করে দেয়। এ ঘটনায় পিনু থানায় জিডিও করেছে।" মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই হাবিবুর রহমান বলেন, "ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে নিহত নারীর স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খুনের কারণ এখনো শনাক্ত করতে পারিনি। জিজ্ঞাসাবাদ করলে খুনের কারণ জানা যাবে।" জুতার ছাপের মিল পাওয়াসহ ৯ কারণ দেখিয়ে সোহেল রানার রিমান্ড আবেদন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অন্যান্য কারণ হলো— >> মামলায় ঘটনার সময় বলা হয়েছে সকাল ১১টা ২০ মিনিট থেকে বিকাল ৩টা। যে জানালার গ্রিল কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়, সেটি অন্য একটি ছাদ লাগোয়া। ওই ছাদ বেশ প্রশস্ত ও খোলা এবং এর চারপাশে অনেক বহুতল ভবনের জানালা, বারান্দা ও রান্নাঘর দৃশ্যমান। ওই সময়ে দিনের আলো ছিল। আশপাশের বাড়িতে জিজ্ঞাসা করে জানা যায়, কেউ ওই সময়ে ঘটনাস্থলের জানালার পাশে কোনো ব্যক্তিকে গ্রিল কাটতে দেখেননি বা গ্রিল কাটার শব্দ পাননি। >> যে জানাটি কাটা হয়েছে, তার ভেতরের অংশের বারান্দায় একটি জুতার ছাপ পাওয়া যায় এবং নিহত নারীর বাসায় পাওয়া একজোড়া জুতার ছাপের সঙ্গে তার মিল খুঁজে পান সিআইডির সদস্যরা। ওই জুতা সোহেল রানা নিজের বলে স্বীকার করে। তবে জানালার গ্রিলের বাইরের অংশের ছাদে কোনো জুতা বা পায়ের ছাপ পাওয়া যায়নি। >> নিহতের মেয়ে হাসিন ওয়ামীর ভাষ্য, তার মা প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় বিছানা থেকে উঠে তার ইউনিফর্মের দিকে তাকাত এবং তারপর ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে আবার বিছানায় ঘুমাতে যেত। কিন্তু ঘটনার দিন তার মা বিছানা থেকে ওঠেনি। তার বাবা তাকে বলেছিল, তার মা পরে উঠে দরজা লাগিয়ে দেবে। সেদিন স্কুলে যাওয়ার আগে ওয়ামী তার মায়ের কোনো নাড়াচাড়া বা 'কথা বলতে শুনতে বা দেখতে পায়নি। >> ওয়ামী যখন স্কুল থেকে ফিরে বাবাকে ঘটনার কথা জানায় এবং তার বাবা কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরে চিকিৎসা দেওয়ার তৎপরতা দেখাননি, যা সন্দেহজনক। >> জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল রানা তার স্ত্রীর প্রতি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ২০ মিনিটের দিকে সোহেল রানা পিনুকে একা বাসায় রেখে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে অফিসে যায়। কেউ আনতে না যাওয়ায় বিকালে ওয়ামী বাসায় চলে আসে। বাসায় এসে দেখে ঘরের দরজা খোলা, তবে চাপানো। এজাহারে বলা হয়, ওয়ামী দেখতে পায় তার মা খাটের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। তার মুখের উপর বালিশ রাখা। মাকে ডাকাডাকি করে। কোনো শব্দ না পেয়ে মুখের উপর থেকে বালিশ সরিয়ে দেয়। মায়ের হাত-পা ঠান্ডা ও শ্বাস বন্ধ আছে বুঝতে পেরে বাসা থেকে স্কুলে যায়। প্রিন্সিপালের মোবাইল ফোন থেকে তার বাবাকে ঘটনা জানায়। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
