ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বুধবার ৮ জুলাই ২০২৬ ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩
কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, নেপথ্য কারণ কী?
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Wednesday, 8 July, 2026, 12:48 PM

কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, নেপথ্য কারণ কী?

কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, নেপথ্য কারণ কী?

দেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনাও। চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, জরুরি সেবা এবং অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কারণে গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ মানবাধিকারকর্মীদের।

তাদের মতে, বিশেষ করে রাতের বেলায় কারাগারে চিকিৎসকের উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য জরুরি জটিলতায় আক্রান্ত বন্দিদের চিকিৎসায় মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। 

ছয় মাসে ৬১ বন্দির মৃত্যু

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের কারাগারগুলোতে ৬১ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪২। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বন্দি মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

কারা অধিদফতরের তথ্যেও বন্দি মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী চিত্র উঠে এসেছে। অধিদফতরের হিসাবে, গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে ১৮৬ জন বন্দি মারা যান। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মারা গেছেন ১৯৭ জন। তবে আসক ও কারা অধিদফতরের পরিসংখ্যানে পার্থক্য রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও আওতাভেদে এ পার্থক্য হতে পারে।

চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স সংকট

মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অসুস্থ বন্দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত বাইরে পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা, চিকিৎসক সংকট, অ্যাম্বুলেন্সের অপ্রতুলতা এবং কারা হাসপাতালগুলোর সীমিত সক্ষমতার কারণে বন্দি মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নিতে ভাড়া করা যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পথেই রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে।

কারা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৪৬টি। কিন্তু কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। পাশাপাশি ডিপ্লোমা নার্সেরও বড় সংকট রয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক বন্দির জন্য নিয়মিত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

দেশে বর্তমানে ৬৮টি কারাগার রয়েছে। এর বিপরীতে অ্যাম্বুলেন্স আছে মাত্র ২৩টি। অর্থাৎ অধিকাংশ কারাগারের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স নেই। অসুস্থ বন্দিকে এক কারাগার থেকে অন্যত্র বা বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়ার সময় এই সংকট সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে ওঠে।

মানবাধিকারকর্মীদের পর্যবেক্ষণ

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন গণমাধ্যমকে  বলেন, কারাগারে চিকিৎসক সংকট দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে রাতের বেলায় চিকিৎসাসেবা অত্যন্ত অপ্রতুল। কোনও বন্দি গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠাতে দেরি হয়। এর সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স সংকট যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

তিনি বলেন, কারাগারে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীরও ঘাটতি আছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। আবার গ্রেফতারের সময় নির্যাতনের শিকার হওয়া কোনও ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানোর পর তার যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

নূর খান লিটনের মতে, কারাগারে অসুস্থ বন্দিদের জন্য জায়গা খুব সীমিত। অভিযোগ রয়েছে, টাকার বিনিময়ে সুস্থ ব্যক্তিরাও কখনও কখনও কারা চিকিৎসাকেন্দ্রের সুবিধা পান। এতে প্রকৃত অসুস্থ বন্দিরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে রাতের বেলায় জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের উপস্থিতি খুবই কম। অনেক জায়গায় নেই বললেই চলে।

তিনি বলেন, বন্দি মৃত্যুর ঘটনা কমাতে হলে কারাবিধি সংস্কার, কারা হাসপাতালের আধুনিকায়ন, রাতের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং গুরুতর রোগীকে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে বন্দিদের পুষ্টিকর খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করাও জরুরি।

কারা কর্তৃপক্ষ যা বলছে

কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন গণমাধ্যমকে  বলেন, কারা কর্তৃপক্ষ সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজন হলে বন্দিদের বাইরে হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, চিকিৎসক সংকট, নিয়মিত চিকিৎসক না থাকা এবং ডিপ্লোমা নার্সের ঘাটতি—এসব বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে সংকট কাটানোর চেষ্টা করছি। তবে চিকিৎসক নিয়োগ ও পদায়নের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হওয়ায় আমাদের তাদের ওপর নির্ভর করতে হয়।

আইজি প্রিজনস বলেন, দীর্ঘ চেষ্টার পর সম্প্রতি সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ার বাকি কাজ শেষ হলে তারা দ্রুত কারা চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হবেন। এটি কারা হাসপাতালগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে তিনি মনে করেন।

অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কথাও স্বীকার করেন কারা মহাপরিদর্শক। তিনি বলেন, বর্তমানে কারা অধিদফতরের ২৩টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতির পর আরও ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কিছু পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তি হলে অনুমোদনের পর ক্রয়প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে।

তিনি বলেন, ৪৪টি নতুন অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া গেলে কারাগারগুলোতে জরুরি রোগী পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের উন্নতি হবে।

সমাধানে কী প্রয়োজন

তবে মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, বছরের পর বছর ধরে চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কথা বলা হলেও কার্যকর সমাধান দৃশ্যমান হচ্ছে না। তাদের মতে, শুধু নতুন অ্যাম্বুলেন্স বা নার্স নিয়োগ নয়, কারাগারের চিকিৎসাব্যবস্থাকে একটি পূর্ণাঙ্গ জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

তাদের মতে, কারা হাসপাতালগুলোতে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসক উপস্থিতি, জরুরি রোগী স্থানান্তরের নির্দিষ্ট সময়সীমা, পর্যাপ্ত ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা, রোগী ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং গ্রেফতারের পর স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা গেলে বন্দি মৃত্যুর ঘটনা কমানো সম্ভব।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status