|
রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে মিশরের স্বপ্ন ভেঙে শেষ আটে আর্জেন্টিনা
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে মিশরের স্বপ্ন ভেঙে শেষ আটে আর্জেন্টিনা আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার শেষ ষোলোর শ্বাসরুদ্ধরকর ম্যাচটি ৩-২ গোলে জিতেছে আর্জেন্টিনা। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা দলটি পরের ১৩ মিনিটে করেছে তিন গোল। ইয়াসির ইব্রাহিম ও মোস্তাফা জিকোর গোলে স্মরণীয় জয়ের খুব কাছে পৌছে গিয়েছিল মিশর। মেসির পেনাল্টি মিসের পর, আরও অনেক সুযোগ হাতছাড়ায় আর্জেন্টিনায় বিদায় সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য মনে হচ্ছিল। তবে মেসি যেন তা মানতে চাইলেন না। নিজেকে ও দলকে পুনরুজ্জীবিত করতে যা করণীয়, তাই করলেন মেসি। কঠিন সময়ে আরও একবার দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন তিনি। ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর গোলে অবদান রাখার পর সমতা টানলেন মেসি, আর যোগ করা সময়ের ব্যবধান গড়ে দিলেন এন্সো ফের্নান্দেস। পুরো ম্যাচে ৬০ শতাংশের বেশি সময় বল দখলে রেখে, গোলের জন্য ১৯ শট নিয়ে সাতটি লক্ষ্যে রাখতে পারে আর্জেন্টিনা। আর মিশরের পাঁচ শটের ওই গোলের দুটিই লক্ষ্যে ছিল। ম্যাচের প্রথম উল্লেখযোগ্য আক্রমণেই আর্জেন্টিনাকে হতভম্ব করে দেন ইব্রাহিম, পঞ্চদশ মিনিটে। ডান দিক থেকে ছয় গজ বক্সের মুখে দারুণ এক ক্রস বাড়ান মারওয়ান আতিয়া, এবং সঙ্গে লেগে থাকা লিসান্দ্রো মার্তিনেসের চ্যালেঞ্জ সামলে হেডে গোলটি করেন এই সেন্টার-ব্যাক। জায়গা থেকে নড়ার সুযোগ পাননি এমিলিয়ানো মার্তিসেস। চার মিনিট পরেই সমতা টানার নিশ্চিত সুযোগ আসে আর্জেন্টিনার সামনে। ডি-বক্সে নিকোলাস তালিয়াফিকো ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় তারা। কিন্তু দুর্বল স্পট কিকে হতাশা বাড়ান মেসি। আসরে টানা গোল করে চলেছেন, বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড (২০) নিজের করে নিয়েছেন- এমন সব দারুণ প্রাপ্তির মাঝে পেনাল্টি শটে দ্বিতীয়বার ব্যর্থ হলেন মেসি। গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ান গোলরক্ষকও তার স্পট কিক রুখে দিয়েছিলেন। বিশ্বকাপে এই নিয়ে আটটি পেনাল্টি নিয়ে চারবার ব্যর্থ হলেন মেসি। টানা আক্রমণে প্রথমার্ধের বাকি সময়ে আরও কয়েকটি দারুণ সুযোগ তৈরি করে আর্জেন্টিনা, কিন্তু বারবার ব্যর্থতাই তাদের সঙ্গী হয়। মেসির পেনাল্টি শট আটকানোর পর, ২৮তম মিনিটে আবার দারুণ ক্ষিপ্রতায় আলেক্সিস মাক আলিস্তেরের জোরাল হেড রুখে দেন মোস্তাফা শুবির। তিন মিনিট পর, আরেকবার গোলের সম্ভাবনা জাগান মেসি; কিন্তু এবার তার ফ্রি কিক দুর্ভাগ্যবশত পোস্টে লাগে। ৩৯তম মিনিটে শুবিরের মজবুত দেয়ালে ব্যর্থ হয় আর্জেন্টাইনদের আরেকটি প্রচেষ্টা। তালিয়াফিকোর বাড়ানো বল ফাঁকায় পেয়ে জোরাল নিচু শট নেন হুলিয়ান আলভারেস, নিশ্চিত গোলই মনে হচ্ছিল; কিন্তু অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে বল বাইরে পাঠান ২৬ বছর বয়সী গোলরক্ষক। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে প্রতিপক্ষের একটি ভুল পাস থেকে ডি-বক্সে বল পেয়ে যান মেসি, কিন্তু বল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি তিনি। কিছুক্ষণ পর ফের ডি-বক্সের মুখে প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জে বল হারান রেকর্ড আটবারের বর্ষসেরা ফুটবলার। অসাধারণ এক পাল্টা আক্রমণে ৫৮তম মিনিটে জালে বল পাঠান জিকো, হতাশায় নুইয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা দলের অনেক খেলোয়াড় ও সমর্থকরা। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে মিশরের গ্যালারি। তবে, মুহুর্তেই ঘটনা নাটকীয় মোড় নেয়; ওই আক্রমণের শুরুতে লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে ডিফেন্ডার আতিয়া ফাউল করলে ভিএআরের সাহায্যে গোল দেননি রেফারি। আট মিনিট পরেই, দুর্দান্ত এক গোলে আগের হতাশা মুছে যায় জিকোর। প্রতি-আক্রমণে গোলটিতে বড় ভূমিকা আছে সালাহর। মেসির কর্নার কিক ঠেকিয়ে, বল পায়ে দারুণ গতিতে ছুটে যান মিশরের সবচেয়ে বড় তারকা। প্রতিপক্ষের সীমানায় গিয়ে তিনি ডানে বল বাড়ান হাসানকে, তিনি বাঁ পাশ দিয়ে ছোটা জিকোকে দেখে ডি-বক্সে থ্রু পাস বাড়ান, আর নিখুঁত এক শটে মার্তিনেসকে পরাস্ত করেন লেফট-উইঙ্গার জিকো। অনেক সুযোগ নষ্টের পর, ৭৯তম মিনিটে ঘুরে দাঁড়ানোর উপলক্ষ পায় আর্জেন্টিনা। ডি-বক্সের বাঁ দিক থেকে মেসির মাপা ক্রস ছয় গজ বক্সের মুখে পেয়ে, হেডে ব্যবধান কমান ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে দ্বিতীয় গোলও আদায় করে নেয় তারা। ডি-বক্সে জটলার মধ্যে মিশর বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে, গন্জালো মন্তিয়েলের কাটব্যাক পেয়ে জোরাল শটে সমতা টানেন মেসি। আসরে এই নিয়ে আট গোল করলেন মেসি, গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এগিয়ে গেলেন আবার। একটি করে গোল কম কিলিয়ান এমবাপে ও আর্লিং হলান্ডের। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার মোট গোল হলো ২১টি। আর জাতীয় দলের হয়ে তার মোট গোল হলো ১২৫টি, ২০৪ ম্যাচে। সময় ফুরিয়ে আসছিল, ম্যাচ তখন অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর দিকে। তবে, অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পেরে যেন নতুন শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। একটু পর সুযোগ আসে আরেকটি, কিন্তু মেসির ছোট করে বাড়ানো বল গোলমুখে পেয়েও হেড লক্ষ্যে রাখতে পারেননি লাউতারো মার্তিনেস। তবে, যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে তাদের আর রুখতে পারেনি মিশর। ডান দিক থেকে আলভারেসের ক্রস ছয় গজ বক্সের বাইরে পেয়ে নিখুঁত হেডে দলকে উৎসবের উপলক্ষ এনে দেন চেলসি মিডফিল্ডার ফের্নান্দেস। জয়টা যে কতটা কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠেছিল, কতটা দুরূহ পথ পাড়ি দিয়ে মিলল, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে শেষ বাঁশি বাজার পর। কান্নায় ভেঙে পড়েন মেসি, যে কান্না তার থামছিলই না। দুই চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরছিল পানি। যে কান্না আনন্দের! ডাগআউটে কোচ লিওনেল স্কালোনির চোখ দিয়েও ঝরল আনন্দাশ্রু। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
