|
পাবনায় হচ্ছে নতুন মেগা সংযোগ, বদলে যেতে পারে দেশের যোগাযোগ মানচিত্র
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() পাবনায় হচ্ছে নতুন মেগা সংযোগ, বদলে যেতে পারে দেশের যোগাযোগ মানচিত্র পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস গত ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে এই দুটি প্রকল্পের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর দফতরে বিষয়টি আলোচনায় আসে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট নিরসনে এই উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় একটি জাতীয় প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কী এই ওয়াই-প্যাটার্ন সেতু প্রস্তাবিত ওয়াই-প্যাটার্ন সেতু মূলত এমন একটি বহুমুখী সংযোগ কাঠামো— যা পাবনা, রাজবাড়ী ও মানিকগঞ্জ অঞ্চলের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলার ধারণা থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পদ্মা নদীঘেঁষা বিভিন্ন ফেরিঘাটের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যাতায়াতে নতুন গতি সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে আরিচা-দৌলতদিয়া, কাজিরহাটসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন ফেরির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে। বিশেষ করে ঈদ, উৎসব কিংবা কৃষি মৌসুমে এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এতে একদিকে সময় নষ্ট হয়, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সংসদে উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আধুনিক ও বিকল্প সড়ক সংযোগ এখন জাতীয় প্রয়োজন হয়ে উঠেছে। সেই বিবেচনায় ওয়াই-প্যাটার্ন সেতু কে একটি কৌশলগত যোগাযোগ অবকাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংসদ থেকে প্রশাসনিক পর্যায়ে দ্রুত অগ্রগতি জাতীয় সংসদে প্রস্তাব উত্থাপনের পরপরই বিষয়টি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় এগোতে শুরু করে। ১৩ মে সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে একটি ডিও চিঠি দেন। সেখানে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক যোগাযোগে এর প্রভাব তুলে ধরা হয়। পরদিন ১৪ মে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সচিবের কাছে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। সরকারি নথিপত্রে দেখা গেছে, এর পর থেকেই প্রকল্পটি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে পর্যালোচনার আওতায় আসে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, সম্ভাব্য রুট, ব্যয় এবং অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এখনও আনুষ্ঠানিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু হয়নি, তবে প্রশাসনিক পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, পাবনাসহ উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ নিরসনের লক্ষ্যেই ওয়াই-প্যাটার্ন সেতু ও দ্বিতীয় পদ্মা ব্যারেজের প্রস্তাব আমি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছি। বর্তমানে ফেরিনির্ভর যোগাযোগের কারণে মানুষকে দীর্ঘ সময় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য একটি আধুনিক ও টেকসই যোগাযোগ অবকাঠামো এখন সময়ের দাবি। তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত সেতুটি বাস্তবায়িত হলে শুধু পাবনা নয়, উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় পদ্মা ব্যারেজ নির্মিত হলে নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তিনি বলেন, বিষয়টি জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।’’ প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও যাচাই-বাছাই শেষে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দিকে এগোবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যৌথ তৎপরতা প্রকল্পটিকে এগিয়ে নিতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও তৎপরতা দেখা যায়। ১৮ মে বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ খৈয়াম এবং সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস যৌথভাবে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা বিভিন্ন পর্যায়ে তুলে ধরেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ সংকট, শিল্প ও কৃষিপণ্য পরিবহনের সমস্যা এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফল তুলে ধরা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে অনেকেই মনে করছেন, এই সেতু বাস্তবায়িত হলে পাবনা অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য, দুধ, মাছ, ওষুধশিল্প এবং ক্ষুদ্র শিল্পখাত দ্রুত পরিবহন সুবিধা পাবে। প্রধানমন্ত্রীর দফতরে উপস্থাপন ২৪ মে প্রকল্পটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে উপস্থাপন করা হয়। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের স্মারকে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পাবনাসহ উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ১৬ জেলার প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হতে পারেন। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি এখন কেবল একটি স্থানীয় দাবি হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটি জাতীয় যোগাযোগ নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে বিবেচনায় আসছে। দ্বিতীয় পদ্মা ব্যারেজ নিয়েও আলোচনা ‘ওয়াই-প্যাটার্ন সেতু’র পাশাপাশি দ্বিতীয় পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের প্রস্তাবও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির দিক বিবেচনায় দ্বিতীয় ব্যারেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন ব্যারেজ নির্মিত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ এবং কৃষিতে পানি সরবরাহ আরও কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে নদীভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অর্থনৈতিক গুরুত্ব কতটা যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প শুধু যাতায়াত সহজ করে না; এটি আঞ্চলিক অর্থনীতির গতিপথও বদলে দিতে পারে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ওয়াই-প্যাটার্ন সেতু’ বাস্তবায়িত হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে পারে— ফেরি নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, ঢাকা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াত সময় কমব, যমুনা ও পদ্মা সেতুর ওপর যানবাহনের চাপ কিছুটা হ্রাস পাবে, উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে বিকল্প যোগাযোগ পথ তৈরি হবে। এছাড়া শিল্প ও কৃষিপণ্য পরিবহন ব্যয় কমতে পারে, নতুন শিল্পাঞ্চল ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে পাবনা অঞ্চলে ওষুধশিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও দুগ্ধখাতের সম্প্রসারণে উন্নত যোগাযোগ বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। এ প্রসঙ্গে পাবনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পাবনাসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ যোগাযোগ সংকটে ভুগছেন। বিশেষ করে ফেরিনির্ভর যোগাযোগের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে ব্যাপক ভোগান্তি তৈরি হয়। প্রস্তাবিত ‘ওয়াই-প্যাটার্ন সেতু’ ও দ্বিতীয় পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি আরও বলেন, পাবনা ইতোমধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ওষুধশিল্প, দুধ, মাছ ও কৃষিপণ্য দ্রুত পরিবহনের জন্য আধুনিক সড়ক যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু পাবনা নয়, উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার অর্থনীতি নতুন গতি পাবে এবং বিনিয়োগও বাড়বে। সামনে কী যদিও প্রকল্প দুটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবু খুব অল্প সময়ের মধ্যে সংসদ, মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত বিষয়টির অগ্রগতি নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। তবে অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং অর্থায়নের উৎস নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি সেতু বা ব্যারেজ শুধু নির্মাণ প্রকল্প নয়— এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং জাতীয় যোগাযোগ কৌশলের সঙ্গেও যুক্ত। সবকিছু মিলিয়ে পাবনার ওয়াই-প্যাটার্ন সেতু ও দ্বিতীয় পদ্মা ব্যারেজ এখন কেবল একটি আঞ্চলিক দাবি নয়, বরং জাতীয় যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আলোচনায় উঠে আসা নতুন দুটি বড় সম্ভাবনার নাম। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
