|
আদালতে আয়নাবাজি: ভাইঝিকে মেয়ে সাজিয়ে আদালতে আনেন ফুফু, যেতে হয় কারাগারে
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() আদালতে আয়নাবাজি: ভাইঝিকে মেয়ে সাজিয়ে আদালতে আনেন ফুফু, যেতে হয় কারাগারে পুলিশ বলছে, আসামি শারমিন আক্তার একার বদলে আদালতে আত্মসমর্পণ করেছিলে ভাবনা আক্তার নামে এক নারী, যিনি একার ফুফাতো বোন। ফুফু লাইলী শাহনাজ খুশি গত ১২ মে আত্মসমর্পণ করে জামিনের জন্য নিজের মেয়ের বদলে ভাইঝি ভাবনাকে আদালতে নিয়ে আসেন। কিন্তু আদালত জামিন না দিলে কারাগারে যেতে হয় তাদের। বৃহস্পতিবার ২১ মে, আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে এমনটিই তুলে ধরেছেন তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার এসআই মাহবুবুল আলম। প্রাচীন পিলারের ব্যবসার প্রলোভন, ‘কুফরি-কালাম’ আর ‘শয়তানের নিশ্বাসের’ মাধ্যমে প্রতারণা করে ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এ বছরের ২৪ এপ্রিল উত্তরা পূর্ব থানায় মামলা করেন আজিজুল আলম নামে এক ব্যবসায়ী। মামলায় শারমিন আক্তার একা ও তার মা লাইলী শাহনাজ খুশিসহ একটি চক্রের ২৪ সদস্যকে আসামি করা হয়। এ মামলায় গত ১২ মে ভাইঝি ভাবনাকে নিসজের মেয়ে একা সাজিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে যান লাইলী শাহনাজ খুশি। কিন্তু আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এরপর তাদের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে ১৪ মে ছিল শুনানির দিন রাখা হয়। কিন্তু শুনানির দিন বাদীপক্ষের আইনজীবী আদালতে আবেদন করেন, কাঠগড়ায় থাকা আসামি প্রকৃতপক্ষে শারমিন আক্তার একা নয়। তার পরিবর্তে অন্য কোনো নারী আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। বাদীপক্ষের সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তিন দিনের মধ্যে প্রকৃত আসামি যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে বলে। এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে গত ১৮ মে ভাবনার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি শারমিন আক্তার একা নন। তার নাম আসলে ভাবনা আক্তার। তিন বছর আগে তার স্বামীর সঙ্গে ভাবনার বিচ্ছেদ হয়। মা ও পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে থাকেন ওয়ারীর করাতিটোলায়। ভাবনার আপন ফুফাতো বোন শারমিন আক্তার একা মামলার ৩ নম্বর আসামি। একার স্বামী মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির ১ নম্বর আসামি। একার মা অর্থাৎ ভাবনার ফুফু লাইলী শাহনাজ খুশি মামলার ১৪ নম্বর আসামি। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভাবনা মাঝেমধ্যে সোহেল ফকিরের পল্লবীর ডিওএইচএসের বাসায় আসা যাওয়া করতেন। ভাবনাকে তার ফুফু বলেছিলেন একার হয়ে আদালতে আত্মসর্মথন করে জামিন নিতে। এ ব্যাপারে ‘উকিলকে বলা হয়েছে’- এ কথাও বলা হয়। আসামি পরিবর্তনের পরিকল্পনা দেন একার স্বামী সোহেল ফকির। এরপর ভাবনা তার ফুফুর সঙ্গে আদালতে গিয়ে আত্মসমর্থন করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীর কাছে ভাবনা তার নাম শারমিন আক্তার একা বলে পরিচয় দেন। কিন্তু আসামিপক্ষের আইনজীবী পরে বলেন, বিষয়টি তিনি জানতেন না। এরপর ওই মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর আবেদন করেন সেই আইনজীবী। পুলিশ বলছে, কেন অন্যের হয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের জন্য এসেছিলেন, জিজ্ঞাসাবাদে সেই প্রশ্নের ‘সন্তোষজনক জবাব দেননি’ ভাবনা। প্রতারক চক্রটি ‘বিশাল ও চতুর’। প্রাথমিক তদন্তে আসামি ভাবনা ‘মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত’ বলে মনে হচ্ছে। মামলায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় ভাবনাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম। ঢাকার অ্যাডিশনাল চিপ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। এরপর বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালত ভাবনার জবানবন্দি নিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছে। তদন্তকর্তা মাহবুবুল আলম বলেন, “কয়েক মাস আগে একার সন্তান হয়েছে। ফুফু তাকে বুঝিয়ে একা সেজে আদালতে যেতে বলে। আদালতে গেলেই জামিন হয়ে যাবে, এমন কথা বলা হয়। কিন্তু আদালত কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।” মামলার পূর্বাপর প্রাচীন পিলারের ব্যবসার প্রলোভন দেখিয়ে, ‘কুফরি-কালাম’ আর ‘শয়তানের নিঃশ্বাসের’ মাধ্যমে ব্যবসায়ী আজিজুলের কাছ থেকে ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে একটি চক্রের বিরুদ্ধে এ মামলা চলছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ভয়-ভীতি দেখিয়ে চক্রটি ১৪-১৬ কোটি টাকার জমিও লিখে নিয়েছে। মামলার পর শাখাওয়াত হোসেন শিমুল, নাজমুল হাসান, এ আর রহমান ও আবু ইবনে বিন আব্বাস ওরফে তুষারকে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদের মধ্যে শিমুল ও নাজমুল জামিন পেয়েছেন। আজিজুল মামলায় অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তার বন্ধু মনিরের মাধ্যমে মিজান নামে একজন তার কাছে যায়। তার বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না জানতে চায়। আজিজুল বলেন, আছে। পরে মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির, নাজমুল হাসান ও কামাল তার অফিসে গিয়ে বলে, প্রাচীন পিলার বিদেশে বিক্রি করে বিদেশি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ‘বিলিয়ন বিলিয়ন’ টাকা আনবে, যার অর্ধেক আজিজুলকে দেবে। “সোহেলের লেবাস ও চটকদার কথাবার্তায় আজিজুল বিশ্বাস করেন। এরপর থেকে কারসাজি শুরু হয়। ‘কুফরি কালাম’ ও ‘শয়তানের নিশ্বাসের’ মাধ্যমে আজিজুলকে তারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেন। এরপর কোটি কোটি টাকা, স্বর্ণালংকার, জায়গা-জমি হাতিয়ে নেওয়া শুরু করেন প্রতারকরা।” এজাহারে বলা হয়, “কিছুদিন পর আবার জ্বিনের মা পরিচয়ে এক নারী তাকে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন দেন। তারপর থেকে নাজমুল ও সোহেল এবং অন্যদের মাধ্যমে আজিজুলের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নিতে থাকেন। তারা নগদ কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।” “পরবর্তীতে জ্বীনের বাদশা (রাসেল) পরিচয়ে তাকে ফোন করা বলা হয়, সোহেল ও নাজমুলকে পাঠানো হয়েছে। তাদের কাছে ৫ কোটি টাকা দে। যদি না দিস তাহলে ক্ষতি হবে।” এভাবে ২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ২০ কোটি ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। এ ছাড়া চক্রটি উত্তরখান এলাকায় ১৪ থেকে ১৬ কোটি টাকার ২৭ দশমিক ১৫ কাঠা জমি লিখে নেয় বলে অভিযোগ করেন আজিজুল। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
