সেরা ফুটবলার থেকে কীভাবে শীর্ষ সন্ত্রাসী হলেন টিটন, হত্যা করলো কারা?
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Thursday, 30 April, 2026, 12:33 PM
সেরা ফুটবলার থেকে কীভাবে শীর্ষ সন্ত্রাসী হলেন টিটন, হত্যা করলো কারা?
রাজধানীতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের মরদেহ তার যশোরের বাড়িতে পৌঁছেছে। বুধবার রাত ৮টার দিকে শহরের কারবালার বাড়িতে মরদেহ পৌঁছালে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। রাতেই জানাজা শেষে শহরের কারবালা কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
নিহত টিটন যশোর শহরের কারবালা এলাকার কে এম ফকরউদ্দিনের ছেলে। ১১ ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ টিটন জামিনে মুক্তি পেয়ে হাজারীবাগের সুলতানগঞ্জে বসবাস করতেন। মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে নিউ মার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে বটতলায় টিটনকে গুলি করে হত্যা করে মোটরসাইকেল আরোহী দুই মুখোশধারী। এ ঘটনায় বুধবার মামলা করেছেন তার বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন। যশোর শহরের খড়কি আপনমোড় এলাকার বাসিন্দা জুটমিল কর্মকর্তা কে এম ফকরউদ্দিনের ছেলে খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন।
কে এই টিটন
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময়ে জনপ্রিয় ফুটবলার ছিলেন খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে যশোরের ওস্তাদখ্যাত কোচ ইমদাদুল হক সাচ্চুর তত্ত্বাবধানে জেলায় যে কয়েকজন ফুটবলার প্রতিনিধিত্ব করতেন, টিটন তাদের একজন। আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় ও নৈপুণ্য থাকায় চুয়াডাঙ্গা, খুলনা, ঢাকাতেও বিভিন্ন দলের হয়ে খেলতেন। খেলোয়াড় জীবনের জনপ্রিয়ের তুঙ্গে থাকাকালীন জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। পদ-পদবিতে না থাকলেও বিএনপির স্থানীয় কর্মী ছিলেন টিটন।
১৯৯৮ সালে যশোরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রতিপক্ষরা তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। কয়েক মাস জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পরে সুস্থ হয়ে জড়িয়ে পড়েন অপরাধজগতে। ১৯৯৯ সালে যশোরের কারবালায় জোড়া খুনের পর এলাকা ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। পরে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে অপরাধজগতে নিজের পরিচিতি বাড়াতে থাকেন। একাধিক হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্বও দেন। অস্ত্র ও সোনা চালানের ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তার নেতৃত্বে অস্ত্রের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা। ২০০৪ সালে টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট জামিনে মুক্তির পর থেকে আত্মগোপনে ছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে।
অপর একটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০১ সালের ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে টিটনের নাম ছিল ২ নম্বরে। সেই সময় সরকারের পক্ষ থেকে এই শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে দেশজুড়ে পোস্টার সাঁটানো হয়। টিটনের ভগ্নিপতি ছিলেন ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমন, যার ছত্রছায়ায় টিটন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। মোহাম্মদপুরের সন্ত্রাসী চক্র হারিছ-জোসেফ গ্রুপে যুক্ত ছিলেন। টিটনের তৎপরতা ছিল ধানমণ্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায়।
বুধবার রাতে যখন টিটনের মরদেহ খড়কির আপন মোড়ে পৌঁছায়, তখন প্রতিবেশী ও দীর্ঘদিনের খেলোয়াড়রা তার বাড়িতে ছুটে আসেন।
যশোরের সাবেক খেলোয়াড় ও রেফারি লাবু জোয়ার্দার বলেন, ‘টিটনের বাবার দুই স্ত্রী ছিলেন। দুই মায়ের ১২ সন্তানের মধ্যে টিটন প্রথম মায়ের সন্তান। ৯০ দশকের দিকে নাইমুর হাসান টিটন ও তার বড় ভাই রিপন দুজনেই যশোরের সেরা ফুটবলার ছিলেন। সাচ্চু ওস্তাদের নেতৃত্বে আমরা যারা ৯০ দশকে এই অঞ্চলে ফুটবলের নেতৃত্ব দিতাম; তাদের মধ্যে টিটন একজন। দুঃখজনক ঘটনা হলো নামকরা ফুটবলার থেকে সে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে। তার এই জগতে প্রবেশের একটা ট্র্যাজেডি রয়েছে। মূলত তার ওপর একাধিক রাজনৈতিক হামলা হওয়াতে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়েই এই জগতে পা বাড়ায়। ৯৯ সালের দিকে ঢাকাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে আর যশোরে আসেনি।’
স্থানীয় লোকজন জানান, এই প্রজন্মের অনেকেই টিটনকে চেনেন না। দীর্ঘদিন যশোরে না থাকাতে এই প্রজন্মের কেউ তার নামও শোনেননি। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিন থেকে চারবার যশোরের বাড়িতে আসেন। তিনি অবিবাহিত। বাড়িতে এসেও কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতেন না। তবে স্বজনরা টিটনের বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
অপরাধ জগতেই জীবনের সমাপ্তি
দীর্ঘ কয়েক দশকের অপরাধ অধ্যায়ের পর অবশেষে গুলিতেই এই সন্ত্রাসীর জীবনের সমাপ্তি ঘটলো। স ঘটনার বুধবার সকালে ঢাকার নিউ মার্কেট থানায় মামলা করেন বড়ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ৮-৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
টিটনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলার এজাহারে বলা হয়, বসিলা পশুর হাটের ইজারা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘ সময় কারাভোগের পর গত বছরের ১৩ আগস্ট টিটন জামিনে মুক্তি পান। এরপর মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অতীতে পরিবারের সম্মানহানি ও আর্থিক ক্ষতির জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন এবং সৎ পথে জীবন গড়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। কয়েকদিন আগে টিটন তার ভাইকে জানিয়েছিলেন, তিনি হাটের ইজারা সংক্রান্ত কাগজপত্র (শিডিউল) কিনেছেন এবং ব্যবসা করতে চান। ২৬ এপ্রিল টিটন তার ভাইকে জানান, বসিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলাল, বাদল, শাহজাহান ও রনির সঙ্গে তার বিরোধ চলছে। পরদিন ২৭ এপ্রিল জানান, বিরোধ মিটিয়ে একসঙ্গে কাজ করার জন্য তাকে একটি মিটিংয়ে ডাকা হয়েছে। এরপরই রাত ১১টার দিকে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, নিউমার্কেটের শাহনেওয়াজ হলের সামনে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় টিটনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বুধবার বিকেলে ঢাকা মেডিক্যা কলেজ মর্গ থেকে লাশ বুঝে নেন রিপন।
নিউ মার্কেট থানার ওসি মোহাম্মদ আইয়ুব জানান, টিটন হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বুধবার সকালে অজ্ঞাতনামা ৮-৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। এ ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মো. মাসুম খান বলেন, ‘টিটনের বিরুদ্ধে মামলা থাকতে পারে এই থানায়। তবে মামলার আপডেট জানা নেই।’