ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বৃহস্পতিবার ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০ বৈশাখ ১৪৩৩
কক্সবাজার উপকূলে শত শত পরিবারে স্বজন হারানোর আর্তনাদ
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Thursday, 23 April, 2026, 4:16 PM

কক্সবাজার উপকূলে শত শত পরিবারে স্বজন হারানোর আর্তনাদ

কক্সবাজার উপকূলে শত শত পরিবারে স্বজন হারানোর আর্তনাদ

কক্সবাজার উপকূলে এখনও শত পরিবার শুধু একটি খবরের অপেক্ষায়, প্রিয়জন বেঁচে আছে কি না—সেই উত্তর জানার জন্য। উপকুল জুড়ে এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শত শত পরিবারে চলছে স্বজন হারানোর আর্তনাদ ও আহাজারী। রাত নামলেই টেকনাফের লেঙ্গুরবিল কিংবা গ্রামগুলোয় আর নামে না আগের মতো নীরবতা। বাতাসে ভেসে আসে কান্নার শব্দ। কারও স্বামী, কারও ছেলে, কারও ভাই সবাই যেন হারিয়ে গেছে হাজার কিলোমিটার দূরের আন্দামান সাগরের অন্ধকারে। প্রতিটি ঘর এখন একেকটি অপেক্ষার প্রহর গোনার জায়গা।

টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লেঙ্গুরবিল এলাকার ২৭ বছর বয়সী মোস্তাক আহমদের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ভারী নীরবতা। তিন বছর আগে বিয়ে করেছিলেন, আছে দেড় বছরের এক শিশুসন্তান। কৃষি কাজে কোনোমতে চলা সংসার ছেড়ে উন্নত জীবনের স্বপ্নে পা বাড়িয়েছিলেন তিনি। দালালের প্রলোভনে সেই যাত্রাই এখন পরিবারের কাছে এক অন্তহীন দুঃস্বপ্ন।

একইভাবে মোহাম্মদ আবছার, মোহাম্মদ জয়নাল ও আব্দুল হান্নান। তিনটি নাম, তিনটি স্বপ্ন, তিনটি পরিবারের কষ্টের অবগাহন। টেকনাফ সীমান্ত উপজেলার শাহপরীরদ্বীপের মিস্ত্রিপাড়ার এই তরুণরা সাগরপারেই বড় হয়েছেন। তবে দুর্ভাগা তারা। দালালের প্রলোভনে পড়ে হারিয়ে গেছেন সাগরতলে। আন্দামান সাগরে একটি ট্রলার ডুবে যাওয়ার খবরে তাদের পরিবারে এখন শুধুই কান্না আর দীর্ঘ অপেক্ষা। শুধু এই তিনজনই নন, সীমান্তবর্তী সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীরদ্বীপ এলাকার ৩০ জনেরও বেশি  যুবক এখনো নিখোঁজ। তারা সবাই দালালের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

দালালরা প্রথমে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করলেও পরে তা কমিয়ে ২ লাখ ৮০ হাজারে আনে। কিন্তু টাকা জোগাড়ের আগেই নিখোঁজ হয়ে যান মোস্তাক। শেষবার ফোনে বলেছিলেন শুধু, ‘দোয়া করো’। এরপর আর কোনো খবর নেই। কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মোস্তাকের স্ত্রী ইসমত আরা। পাশেই ভাইয়ের ছবি আঁকড়ে ধরে কান্না করেন বোন ছাদেকা।

বেলাল উদ্দিন পাড়ি জমিয়েছিলেন একই স্বপ্নে। ১২ দিন ধরে তার কোনো খোঁজ নেই। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আয়েশা বেগম দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বিলাপ করেন, সে বেঁচে আছে, না সাগরে ডুবে গেছে—আমি জানিনা। এই বাচ্চাদের নিয়ে কীভাবে বাঁচব ?

শুধু এই দুই পরিবার নয়, টেকনাফের উপকূলের শতাধিক পরিবার এখন একই অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর অপেক্ষার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। কেউ থানায় ছুটছেন, অনেকে সাগর সৈকতে গিয়ে অন্তহীন সাগরের দিগন্ত  পানে তাকিয়ে অশ্রু বিজর্সন করেন, বুক ফাটা বিলাপ করেন, কেউ জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন কিন্তু কোনো উত্তর নেই—প্রিয়জনেরা কোথায় ?
বেঁচে ফেরা কয়েকজনের বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই বিভীষিকাময় যাত্রার গল্প।

 গত ৪ এপ্রিল উখিয়ার ইনানী, টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ছোট নৌকায় করে শত শত মানুষকে তোলা হয় একটি বড় ট্রলারে। ট্রলারটির নাম ‘তানজিনা সুলতানা’। নারী, শিশু, রোহিঙ্গাসহ ২৮০ জন মানুষ গাদাগাদি করে উঠেছিলেন তাতে। গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। কিন্তু ছয় দিনের মাথায় ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে পৌঁছেই বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়। 

বেঁচে ফেরা রোহিঙ্গা যুবক রফিকুল ইসলাম জানান, সাগরে ভাসতে দেখে বাণিজ্যিক একটি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে ১৩ এপ্রিল বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করেন। তার ভাষ্য, ‘ট্রলারে অনেক মানুষ ছিল। দাঁড়ানোর জায়গাও ছিলনা। ঝড়ের আঘাতে হঠাৎ ট্রলারটা ডুবে যায়। আমরা সাগরে ভেসে ছিলাম।

আরেকজন রোহিঙ্গা যুবক ইমরান জানান, ক্যাম্পের জীবন থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই যাত্রা দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ভাসমান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করা হয়। একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের উদ্ধার করে ১৩ এপ্রিল কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি ও তিনজন রোহিঙ্গা। তবে ট্রলারে থাকা মানুষের সঠিক সংখ্যা বা তালিকা না থাকায় নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা নিয়েই সবচেয়ে বেশি শঙ্কা তৈরি হয়েছে।


ভুক্তভোগীদের পরিবারের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, এই ঘটনার পেছনে সক্রিয় একটি শক্তিশালী মানবপাচার চক্রের হাত রয়েছে। শাকের মাঝি, হায়দার আলী, আব্দুল আমিন, সৈয়দ উল্লাহ, মো. ইব্রাহীম, আজিজুল হক,  মাহমুদুল হক, মোস্তাক আহমদ, নুরুল কবির বাদশা, মো. রুবেল, মোহাম্মদ রাসেল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. হামিদ, মোহাম্মদ উল্লাহ, মোজাহের মিয়াসহ বেশ কয়েকজন দালাল দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

রোহিঙ্গা যুবক রফিকসহ স্থানীয় সূত্র মতে, শহর ও সীমান্ত এলাকার আরও বহু ব্যক্তি এই চক্রে সক্রিয়। উখিয়া ও টেকনাফের অন্তত সাতটি রুট দিয়ে নিয়মিত মানুষ পাচার করা হয়। ঘটনার পর বেশির ভাগ দালাল আত্মগোপনে রয়েছে। আর স্থানীয় প্রশাসনের তাদের ধরার কার্যক্রম লক্ষণীয় নয়।

এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই নৌকাডুবিতে নারী-শিশুসহ অন্তত ২৫০ জন নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের মতে, এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, সীমিত সুযোগ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের এক নির্মম প্রতিফলন।

বাংলাদেশ যখন নববর্ষের উৎসবে মুখর, তখন টেকনাফ উপকূলে অন্য এক বাস্তবতা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজার পৌরসভার সমিতি পাড়ার মো. ইব্রাহিম ৪ এপ্রিল ট্রলারে ওঠার আগে বড় ভাইয়ের কাছে ফোনে দোয়া চেয়েছিলেন। তারপর থেকে নিখোঁজ। একই এলাকার হারুন, নূর, শফির পরিবারও অপেক্ষায়। কবে ফিরবে তাদের প্রিয়জন। একইভাবে উখিয়া ও টেকনাফের অনেক স্কুলপড়য়া শিক্ষার্থীও নিখোঁজ রয়েছে। তারা সবাই শেষবার জানিয়েছিল, মালয়েশিয়া যাচ্ছে। কেউ পরিবারের সম্মতিতে। আবার কেউ অমতে বা গোপনে।

লেঙ্গুরবিল গ্রামের আয়েশা বেগম দিনের বেশিরভাগ সময় শূন্যতার দিকে তাকান। সাগর পাড়ে গিয়ে কান্নায় বুক ভাসান। ভাবেন, হয়তো কোনো ফোন আসবে। অথবা কোনো খবর। একটা খবর দিলেও হতো,,,সে বেঁচে আছে কি না। উখিয়া ও টেকনাফের উপকূলে এখন প্রতিটি বাড়ি এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্প যেন একটি করে অপেক্ষার ঘর। কেউ কেউ এখনো আশা ছাড়েনি। কেউ হয়তো মনে মনে বুঝে গেছেন, প্রিয়জনের ফেরার আর সম্ভাবনা নেই।

সামাজিক সংগঠন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আন্দামান সাগরের ঢেউগুলো শুধু একটি ট্রলার নয়। গিলে নিয়েছে শত শত মানুষের স্বপ্ন, পরিবারের ভবিষ্যৎ। আর পেছনে রেখে গেছে অপেক্ষা, কান্না আর এক গভীর নীরবতা।

 শীত মৌসুমের শান্ত সাগরে যা অনায়াসে পাড়ি দেওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থা করেন দালাল চক্র। এটি প্রকাশ্যে ঘটে। কিন্তু আমাদের প্রশাসন মানবপাচার কার্যক্রম প্রতিরোধ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। তারা শুধু ঘটনার পরে দায়সারা দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট। এতে কোনো প্রাণ রক্ষা পায়না। মানবপাচার ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমে রাষ্ট্রকে নিয়োজিত হতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। যেকোনো মূল্যে এ সলিল সমাধি বন্ধ করতে হবে।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা হয়েছে। 

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status