ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ১১ মে ২০২৬ ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
ডিসির কোলেই ঈদ আনন্দ পেল পরিচয়হীন শিশুরা
নতুন টাকা, নতুন জামা, সুস্বাদু ফল—আর এক বিশ্বস্ত কোল
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Tuesday, 24 March, 2026, 11:17 AM

ডিসির কোলেই ঈদ আনন্দ পেল পরিচয়হীন শিশুরা

ডিসির কোলেই ঈদ আনন্দ পেল পরিচয়হীন শিশুরা

ঈদের আনন্দ কেমন হতে পারে, গতকাল শনিবার তার এক নিঃশব্দ অথচ গভীর ভাষা যেন ফুটে উঠল চট্টগ্রামের রউফাবাদ এলাকার সরকারী ছোটমনি নিবাসে। ঘরটি খুব বড় নয়। দেয়ালে রঙিন আঁকিবুঁকি, কোণে ছোট ছোট বিছানা, কোথাও খেলনা ছড়িয়ে আছে। এই সীমিত পরিসরেই গড়ে উঠেছে কয়েকটি জীবনের নতুন আশ্রয়। যাদের অনেকেরই নেই কোনো নামধাম জানা পরিবার, নেই ডাক দেওয়ার মতো ‘মা’ বা ‘বাবা’। তবু তারা বেঁচে আছে—কেউ কারও হাত ধরে, কেউ কারও দিকে তাকিয়ে।

এই শিশুদের মাঝেই ঈদের সকালে এসে দাঁড়ান সারাদেশে মানবিক ডিসি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা। জেলা প্রশাসকের আনুষ্ঠানিক পরিচয় যেন দরজার বাইরে রেখেই তিনি ভেতরে প্রবেশ করেন। হাতে উপহারের ব্যাগ, সঙ্গে নতুন জামা, সুস্বাদু ফল আর ঝকঝকে নতুন নোট।

শিশুরা প্রথমে একটু দূরত্ব রেখেই তাকিয়ে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। কেউ হাত বাড়ায়, কেউ আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। একসময় তাদের হাতে পৌঁছে যায় নতুন টাকা—ঈদের সালামি। ছোট ছোট আঙুলে ধরা সেই নতুন নোট যেন তাদের কাছে শুধু টাকা নয়, এক ধরনের স্বীকৃতি—তাদেরও ঈদ আছে। কিন্তু দিনের সবচেয়ে গভীর মুহূর্তটি তৈরি হয় অন্যভাবে।

একটি শিশু—অতি ছোট, কোলে নেওয়ার মতোই—তাকে তুলে নেন জেলা প্রশাসক। শিশুটি প্রথমে যেন চমকে ওঠে, তারপর ধীরে ধীরে স্থির হয়ে আসে। তার চোখ স্থির হয় সেই মানবিক জেলা প্রশাসকের মুখের দিকে, যে মুখে আছে অচেনা অথচ নিরাপদ এক মমতা। কিছুক্ষণ পর আরেকটি শিশুকেও তুলে নেন তিনি—ফেনীর সোনাগাজী মডেল থানার মানব পাচার মামলার আসামির কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া দুই মাস বয়সী ইয়াসীন। দুটি শিশুকে কুলে আগলে রাখার সেই দৃশ্য ঘরজুড়ে এক নীরব আবেগ ছড়িয়ে দেয়। এই দুই শিশুর গল্প আলাদা, কিন্তু বেদনার জায়গাটা এক।

ডিসির কোলেই ঈদ আনন্দ পেল পরিচয়হীন শিশুরা

ডিসির কোলেই ঈদ আনন্দ পেল পরিচয়হীন শিশুরা

মানব পাচার মামলার ভিকটিম ইসরাত জাহান রক্সির শিশু সন্তান ইশা আক্তারকে গত বছরের ১ জুন এখানে আনা হয়। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট জন্ম নেওয়া এই শিশুটি তার জন্মদাতার পরিচয় জানে না। আদালতের মাধ্যমে তাকে এখানে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, ইয়াসীন—মাত্র দুই মাস বয়সে উদ্ধার হয়ে এসেছে অনিশ্চিত এক অন্ধকার থেকে।
তাদের কেউ জানে না, ভবিষ্যতে কে তাদের নাম ধরে ডাকবে। কিন্তু সেই মুহূর্তে তারা দুজনেই ছিল এক নিরাপদ কোলের ভেতর—যেখানে কোনো প্রশ্ন নেই, আছে শুধু নিঃশর্ত স্নেহ।

ছোটমনি নিবাসের অফিস সহকারী নূর জাহান পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছিলেন। তাঁর কণ্ঠে তখনও আবেগ, “অনেকেই আসেন, কিন্তু এভাবে সময় দেন না। ঈদের দিন পরিবার ছেড়ে এখানে এসে শিশুদের কোলে নেওয়া—এটা আমরা আগে কখনো দেখি নাই।”

ঘরের অন্য পাশে তখন অন্য এক দৃশ্য। কয়েকজন শিশু নতুন জামা হাতে নিয়ে ব্যস্ত—কেউ খুলে দেখছে, কেউ পরার জন্য উদগ্রীব। টেবিলে সাজানো ফল, বাতাসে উৎসবের গন্ধ। কিন্তু এর মাঝেও কোথাও একটা নীরবতা রয়ে যায়—যে নীরবতা হয়তো প্রশ্ন করে, “আমার আপনজন কোথায়?”

চট্টগ্রামের এই ছোটমনি নিবাসে এখন ১৬ জন শিশু আছে। তাদের প্রত্যেকের জীবন শুরু হয়েছে অনিশ্চয়তায়, কিন্তু এখানে তারা শিখছে নতুন করে বাঁচতে। যত্নে, শৃঙ্খলায়, আর একটু একটু করে ভালোবাসায়।

ঈদের এই দিনে, নতুন টাকা বা জামার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সেই একটি দৃশ্য—একটি কোল, যেখানে কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না। যেখানে একজন প্রশাসক আর একজন শিশু—দুজনেই হয়ে ওঠে শুধু মানুষ।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status