|
নীরব বিপ্লবের কলম সৈনিক
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() নীরব বিপ্লবের কলম সৈনিক মোজাহেদুল ইসলাম এক নিবেদিতপ্রাণ প্রযুক্তি সাংবাদিক, যিনি তাঁর কাজকে শুধু একটি পেশা হিসেবে দেখেন না—এটি তাঁর কাছে এক সেবামূলক সাধনা। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় তাঁর কলম যেন থেমে না যায়—কারণ নতুন প্রজন্মের সাংবাদিক, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য তিনি এক অবিনাশী আলোর দিশা। ১৯৯৯ সালে তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। ইংরেজি দৈনিক দ্য নিউ নেশন-এ তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে একটি আলাদা পাতা বের হতো, সেখানে তিনি সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ২০০২ সালে তাঁর সম্পাদনায় দৈনিক আজকের কাগজ প্রথম বাংলা ভাষায় ‘অনলাইন’ নামে একটি সাপ্তাহিক পাতা প্রকাশ শুরু করে। ২০০৩ সালে সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন ‘ই-বিজ’-এ। পরবর্তীতে নির্বাহী সম্পাদক, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। ২০০৬ সালে তিনি যোগ দেন দেশের ঐতিহ্যবাহী দৈনিক ইত্তেফাক-এ, তথ্যপ্রযুক্তি পাতার সম্পাদনার দায়িত্বে। পাশাপাশি প্রতিদিনের আইটি কর্নার, চাকরির খবর, শিক্ষা পাতা ও কর্পোরেট পাতা সম্পাদনার কাজও করেন। ২০০৯ সালে তিনি ইত্তেফাক-এর তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালের শেষের দিকে তিনি ইত্তেফাক ছেড়ে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম ইংরেজি দৈনিকের অনলাইন সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। মোজাহেদুল ইসলাম একজন তথ্যপ্রযুক্তি-বিষয়ক বই লেখকও। তাঁর লেখা বাংলা বইগুলো দেশে-বিদেশে আলোচিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও তাঁর বইগুলো সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দুই দশকের কাছাকাছি অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি নিজেকে এই জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রযুক্তির প্রতি তাঁর অফুরন্ত ভালোবাসা তাঁকে পরিণত করেছে সংবাদ জগতের এক নির্ভরযোগ্য মুখে। দেশি-বিদেশি প্রযুক্তি অঙ্গনের সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ জানতে সাংবাদিক থেকে শুরু করে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও খোঁজেন তাঁকে। ডিজিটাল রূপান্তর, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স এবং উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে জাতীয় আলোচনায় তাঁর কণ্ঠস্বর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, ন্যানোটেকনোলজি, জেনেটিকস, জলবায়ু পরিবর্তন ও টেলিকম অবকাঠামোর মতো গুরুতর বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণ অনস্বীকার্য। হৃদয় দিয়ে লেখা আর তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের অপূর্ব মিশেল পাওয়া যায় তাঁর প্রতিটি লেখায়—যা পাঠককে শুধু জানায় না, বরং অনুপ্রাণিতও করে। শিক্ষাজীবন ও লেখালেখির শুরু মোজাহেদুল ইসলাম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ২০০১ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনার সময়ই তিনি লেখালেখি শুরু করেন মাসিক কম্পিউটার বার্তাতে। তখন বাংলায় তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কোনো নিয়মিত প্রকাশনা ছিল না বললেই চলে। ঢাকার নিউ মার্কেটের ৩–৪টি দোকানে পাওয়া যেত কয়েকটি বিদেশি ইংরেজি বই ও জার্নাল। মানুষ ভাবত, কম্পিউটার মানেই গবেষণা। কেউ কল্পনাও করত না যে একদিন প্রতিদিনের কাজে এই যন্ত্রটি হয়ে উঠবে অপরিহার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বিষয়টি জানতেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য সহজ-সরল ভাষায় লেখা তেমন কেউ করতেন না। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খেলাধুলা ও যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই কম্পিউটারের বিপ্লবী ব্যবহার নিয়ে মানুষকে জানানোর তাগিদ থেকেই মোজাহেদুল ইসলাম লেখালেখি শুরু করেন। পাঠকেরা তাঁর লেখা পত্রিকায় পড়ে সাড়া দিতে শুরু করেন, দূর-দূরান্ত থেকেও যোগাযোগ করতেন। সেটাই হয়ে ওঠে তাঁর লেখালেখির মূল উৎসাহ। লেখকের ভাষ্যে:“তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় লক্ষ্যে পৌঁছানোর অন্যতম উপায়। সে সময় বাংলাভাষী মানুষদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি সহজ করে তোলা ছিল সময়ের দাবি।” তিনি মনে করেন, তথ্যপ্রযুক্তি শুধু উৎপাদনশীলতা বাড়ায়নি, বরং জীবনযাত্রাকে উন্নত করেছে, কাজকে করেছে সহজতর। ইন্টারনেট হয়েছে তথ্য আদান–প্রদানের এক যুগান্তকারী মাধ্যম। এটি কোনও অঞ্চল বা দেশের নিজস্ব সিস্টেম নয়, বরং একটি বিশ্বব্যবস্থা—এক গ্লোবাল সিস্টেম। পেশাগত সংযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়ন মোজাহেদুল ইসলাম বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটি (বিসিএস)-এর আজীবন সদস্য, পাশাপাশি ইন্টারনেট সোসাইটি (আইএসওসি), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নসহ বহু পেশাগত সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণে অংশ নিতে গেছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে—লন্ডনের থমসন রয়টার ফাউন্ডেশন থেকে ফেলোশিপ পেয়েছেন ফিন্যান্স ও বিজনেস সাংবাদিকতায়। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ডেটা-ড্রিভেন জার্নালিজম, ডিজিটাল মার্কেটিংসহ নানান বিষয়ে পেশাগত সার্টিফিকেশন। তাঁর লেখায় উঠে আসে ই-গভর্নমেন্ট, ডিজিটাল বিভাজন এবং বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল আইসিটি অবকাঠামোর বিশ্লেষণ। সম্মাননা ও অর্জন মোঃ মোজাহেদুল ইসলাম-এর সাংবাদিকতা শুধু পাঠকপ্রিয়তাই পায়নি, পেয়েছে মর্যাদাসম্পন্ন সম্মাননাও। ২০০৩ সালে ই-বিজ ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি) সারাদেশের ৬৪টি জেলায় কলেজ শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজন করে ‘ট্যালেন্ট সার্চ’ প্রোগ্রাম। এই কর্মসূচির সংবাদ পরিবেশনা ও ব্যাপক প্রচারণার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। সেই বছরের অবদানের জন্য তাঁকে ‘সেরা উদীয়মান সাংবাদিক ২০০৩’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়, সঙ্গে প্রদান করা হয় ৫০,০০০ টাকার পুরস্কার। ২০০৯ সালে আড্ডাঘর ডট কম থেকে পান “পাইওনিয়ার আইটি জার্নালিস্ট অফ বাংলাদেশ” খেতাব। ২০১০ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের শিশু শিল্প প্রতিযোগিতায় সংবাদ প্রচারে অবদানের জন্য তিনি অর্জন করেন ‘সেরা মিডিয়া সমন্বয়ক পুরস্কার’। ২০১২ সালে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) কর্তৃক তিনি পান ‘এক্সিলেন্স ইন টেকনোলজি রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড’। ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর, গ্রামীণফোন-এর ৫ কোটি গ্রাহকের মাইলফলক অর্জন উপলক্ষে টেলিকম সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে ‘স্পেশাল কন্ট্রিবিউশন মেডেল’ প্রদান করা হয়। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ আইসিটি সাংবাদিক ফোরাম (বিআইজেএফ) তাঁকে ১৫ বছর দীর্ঘ আইসিটি সাংবাদিকতার স্বীকৃতি হিসেবে ‘ফিফটিন ইয়ারস ইন আইসিটি জার্নালিজম’ পুরস্কার প্রদান করে। একই বছরে তিনি অর্জন করেন ‘ডেটা সেন্টার রিপোর্টিং এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০১৭’ এবং ‘আইটেল মোবাইল অ্যাওয়ার্ড ২০১৭’। ২০১৯ সালে আইপিভি৬ বিষয়ে অসাধারণ প্রতিবেদন করার জন্য তিনি পান ‘সেরা রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড’—বাংলাদেশ লোকাল ব্রডব্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন প্রদত্ত। ২০২০ সালে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় তাঁকে আইটি সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘আইসিটি জার্নালিস্ট অফ দ্য ইয়ার ২০২০’ পুরস্কারে ভূষিত করে। ২০২১ সালে ফাইভার বাংলাদেশ আয়োজন করে ‘ফ্রিল্যান্সারদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা’, সেখানে তিনি পান ‘সাংবাদিকতা পদক ২০২১’। ২০২২ সালে সিস্টেক পাবলিকেশনস লিমিটেড তাঁকে প্রদান করে ‘সেরা লেখক পুরস্কার’, যা তাঁর লেখক জীবনের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা। একই বছরে, তথ্য ও প্রযুক্তিতে অসামান্য অবদান এবং তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল রূপান্তরে উদ্বুদ্ধ করার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পান জাতীয় পর্যায়ে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার ২০২২’—একমাত্র সাংবাদিক হিসেবে বেসরকারি-ব্যক্তিগত শ্রেণিতে। এছাড়াও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে তিনি ‘প্রমিনেন্ট আইটি জার্নালিস্ট অ্যাওয়ার্ড ২০২২’ সহ আরও অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আলোচক, জুরি ও সংগঠক হিসেবে অবদান মোজাহেদুল ইসলাম শুধু কলমের সৈনিকই নন, তিনি জুরি ও বক্তা হিসেবেও দেশের ডিজিটাল অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। তিনি জাতীয় আইসিটি অ্যাওয়ার্ডের জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আলোচক হিসেবে অংশ নিয়েছেন “ই-কমার্সে ক্যারিয়ার” (২০২১), ১৮তম বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্নেন্স ফোরাম (২০২৩), এবং নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ (২০২২)-এ। তিনি সিটিও ফোরাম ইনোভেশন হ্যাকাথন ২০২২-এ ছিলেন সংগঠক ও আলোচক। রাউন্ডটেবিল আলোচনায় প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নেন “চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে আইসিটি অলিম্পিয়াড বাংলাদেশ-এর প্রয়োজনীয়তা” বিষয়ক আলোচনায়। তিনি আরও ছিলেন স্পিকার হিসেবে ক্যারিয়ার কন ২০২০ এবং এরা-টেক টক ২০১৮ অনুষ্ঠানে, যেখানে তিনি উদ্যোক্তা মনোভাব বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। জ্ঞানের উত্তরাধিকার ২০০৩ সাল থেকে মোঃ মোজাহেদুল ইসলাম সাংবাদিকতার পাশাপাশি প্রযুক্তিভিত্তিক বই রচনা শুরু করেন। তাঁর বইগুলো শুধু তথ্যভিত্তিক নয়—তরুণদের ক্যারিয়ার গড়ার চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে। অসংখ্য প্রশিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং উদ্যোক্তা তাঁর লেখা পড়ে দেশ-বিদেশে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে ডজনখানেক বই লিখেছেন, যা মূলত তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক। এসব বই বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের জন্যও এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্র্যাকটিক্যাল নেটওয়ার্কিং হ্যান্ডবুক,স্বপ্নের ক্যারিয়ার,৭ দিনে ওয়েব ডিজাইন: ড্রিমওয়েভার এমএক্স,ওয়েব ডেটাবেজ অ্যাপ্লিকেশন: মাইএসকিউএল-পিএইচপি,মাস্টারিং ই-কমার্স: জুমলা!, ওএস কমার্স, ভার্চুমার্ট, মেজেন্টো,উইন্ডোজ এক্সপি নেটওয়ার্কিং সহ প্রভৃতি।এছাড়া জ্ঞানকোষ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তাঁর জনপ্রিয় বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—সম্ভাবনার ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং,কম্পিউটার হার্ডওয়্যার।সিসটেক ও জ্ঞানকোষ প্রকাশনীর মাধ্যমে তাঁর এই অবদান লাখ লাখ পাঠকের জীবনকে ছুঁয়ে গেছে। সাংবাদিক নেতৃত্ব ২০০৭ সালে মোঃ মোজাহেদুল ইসলাম দেশের একমাত্র তথ্যপ্রযুক্তি সাংবাদিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ আইসিটি জার্নালিস্ট ফোরাম (বিআইজেএফ)’–এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর থেকেই কলম আর কণ্ঠে আইসিটি উন্নয়নের জন্য নেমে পড়েন—লিখেছেন, আলোচনা করেছেন, সভা-সেমিনারে মাতিয়েছেন, গোলটেবিল আলোচনায় তুলেছেন ভবিষ্যতের ছবি। ২০১৯ সালে তিনি সভাপতি হন এবং আইটি সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা রাখেন। এই ফোরামের কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন সরকারি-বেসরকারি নীতিনির্ধারক, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিকসহ সমাজের নানা স্তরের মানুষ। ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ঘোষণা করেন। তার পরের বছরই, ২০০৯ সালে, মোজাহেদুল ইসলামের নেতৃত্বে বিআইজেএফ জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত করে এক ঐতিহাসিক আলোচনা সভা—"ডিজিটাল বাংলাদেশের এক বছরে আমাদের অর্জন কী?" পেশাগত মান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) দেশব্যাপী সাংবাদিকদের নিয়ে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, হ্যান্ডবুক প্রকাশসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এই উদ্যোগে বিআইজেএফ-এর সম্পৃক্ততা প্রশংসনীয়। শুধু সাংবাদিক নয়—শিক্ষার্থীদের মাঝেও কোডিংয়ের ভয় দূর করতে কাজ করেছে বিআইজেএফ। ২০১২ সালের ৯-১৫ ডিসেম্বর বিশ্বের ১৬০টি দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ‘বেসিস আওয়ার অব কোড’ উদযাপন হয় বিআইজেএফ-এর উদ্যোগে। ২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল সরকারি তথ্যপ্রযুক্তি সেবা ক্রয় নিয়ে বিআইজেএফ ও পিআইবির যৌথ কর্মশালা এবং ২০২২ সালে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রশিক্ষণ—সবই তাদের সরব, সক্রিয় উপস্থিতির প্রমাণ। ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবসের আলোচনায় বক্তারা বলেন, ICT খাতে বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় জানানো হয়—২০১০ সালে যেখানে বরাদ্দ ছিল ৫০০ কোটি টাকারও কম, ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫,৭৭৩ কোটি টাকা! অথচ বরাদ্দই যথেষ্ট নয়—স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও চাই। এছাড়াও, বিআইজেএফ ৩ জুন ২০২৩ ‘ই-বর্জ্যের কার্বন ঝুঁকিতে বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল এবং ৬ মে ২০১৯ ‘দ্য ফিউচার অব ক্লাউড কম্পিউটিং’ কর্মশালার আয়োজন করে। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বুয়েটের প্রখ্যাত অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ। তথ্যপ্রযুক্তির একমাত্র অনুসন্ধানী সাংবাদিক ২০০১ সালে সরকার যখন ১৭ সদস্যের আইসিটি টাস্কফোর্স গঠন করে, তখন থেকেই শুরু হয় ডিজিটাল স্বপ্নের রূপরেখা। ই-গভর্ন্যান্স, ই-কমার্স, মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা—সবকিছুর রোডম্যাপ আঁকা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০২ সালে তৈরি হয় জাতীয় আইসিটি নীতিমালা। এমন এক উত্তাল ডিজিটাল জোয়ারে দাঁড়িয়ে, মোজাহেদুল ইসলাম একটি তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেন, যেখানে তিনি তুলে ধরেন—সরকারি সেবায় কম্পিউটার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা। এই রিপোর্ট আলোড়ন তোলে, সৃষ্টি করে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনার ঢেউ। ফলস্বরূপ ২০০৬ সালে আসে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন এবং আন্তর্জাতিক সাবমেরিন কেবল সংযোগ (সি-মি-উই-৪)। ২০০২ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে শুরু হওয়া ৮৩.১৬ কোটি টাকার বিশাল প্রকল্প "SICT" নিয়ে তিনি করেন গভীর অনুসন্ধান—যা পরে রূপরেখা হয়ে দাঁড়ায় আইসিটি খাতের জন্য। সরকারি ক্রয়ের যে বিশাল বাজেট—প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা (বা জাতীয় বাজেটের ৪০%)—তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই আসে ২০০৪ সালে অনলাইন টেন্ডারিং এবং ২০১১ সালে ই-জিপি। ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত এখানে হয়েছে ৭.৮৫ লাখ টেন্ডার—যার আর্থিক পরিমাণ ৮.২২ লাখ কোটি টাকা! এখানেই মোজাহেদুল ইসলামের পরিচয় হয়ে ওঠে অনন্য—তিনি একমাত্র সাংবাদিক যিনি কম্পিউটার কমিউনিকেশনে শিক্ষিত, এবং ৬১টি মন্ত্রণালয়ের আইটি ক্রয় ও প্রকল্পে দুর্নীতির অনুসন্ধান করেছেন।সরকারি জমির রেকর্ড ডিজিটাইজেশন,এমআরপি ও ই-পাসপোর্ট প্রকল্প,শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ল্যাপটপ বিতরণ,গ্যাস ট্রান্সমিশন অটোমেশন,স্বাস্থ্যখাত ও ইআরপি ডিজিটালাইজেশন,সরকারী ক্রয়ে ৫ জি,এমনকি রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের আইটি ব্যবস্থাপনা নিয়েও লিখেছেন তিনি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের “দেশীয় রাজস্ব সংগ্রহ জোরদারকরণ” প্রকল্প,সরকারি ইআরপি, পিওএস ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন—সবকিছুর ওপর তার অনুসন্ধান সরকারের জন্য আয়নার মতো, যাতে দেখা যায় দুর্নীতির ছায়া, বাজেট অপচয় আর জবাবদিহির ঘাটতি। তিনি শুধু দুর্নীতির খবর দেন না, দেখান—ভবিষ্যৎটা কেমন হতে পারে। তার কলমে আছে বজ্র, যা অন্ধকার ফুঁড়ে আলোর পথ দেখায়। আর্তমানবতার সেবায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মোজাহেদুল ইসলাম জনসেবার এক জীবন্ত প্রতীক। কোভিড-১৯ এর ভয়াবহ দিনে অক্সিজেন পৌঁছে দিয়েছেন রোগীদের কাছে, আবার বন্যাক্রান্ত এলাকায় ছুটে গেছেন বিপদে পড়া মানুষের পাশে। করোনার সময় অন্তত ৬ জন সাংবাদিককে অর্থসহায়তা দেন, এবং আরও অনেককে নানাভাবে সহায়তা করেন। প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট দুর্যোগ—সব সময়ই বিআইজেএফ-এর সদস্যরা ছিলেন মানুষের পাশে। ২০০৯ সালের এক শীতের রাতে, মোহাম্মদপুর এলাকায় রাত ১২টার সময় কম্বল বিতরণ করা হয় অসহায় মানুষদের মধ্যে। এখন পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ৫,৮০০-এর বেশি কম্বল! রোহিঙ্গা সংকটেও ছিলেন সক্রিয়—২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর তারা ত্রাণ সহায়তা দেয় কক্সবাজারে। আবার ২০১৯ সালে জামালপুরের বন্যায় সরিষাবাড়িতে ত্রাণ পৌঁছে দেন তারা, সবসময় নিঃশব্দে—কিন্তু আন্তরিকভাবে। সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদে সদা সোচ্চার বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন, গ্রেপ্তার, মিথ্যা হত্যা মামলা, ব্যাংক হিসাব জব্দ করাসহ নানা ধরনের হয়রানিসহ বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং পত্রিকা বন্ধ ও সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুত করে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ ও সাংবাদিক হয়রানির প্রতিবাদে বিবৃতি,সমাবেশ ও মানববন্ধনে সবসময় সক্রিয় মোজাহেদুল ইসলাম। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের (ডিএসএ) অধীনে গত পাঁচ বছরে অন্তত ৪৫১ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের প্রকাশিত রিপোর্টের কারণে। গ্রেপ্তার হয়েছেন অন্তত ৯৭ জন সাংবাদিক, যাদের মধ্যে ৫০ জনই স্থানীয় সাংবাদিক। অভিযুক্ত ৪৫১ জনের মধ্যে ২০৯ জন জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত এবং ১৯৭ জন স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিক—এ তথ্য উঠে এসেছে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর এক গবেষণায়। ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে, ঢাকার মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় তথ্য বিকৃতির অভিযোগে ‘অধিকার’ সম্পাদক আদিলুর রহমান খানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। একই বছরের ১১ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর ২০২১ সালের ১৭ মে, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তা এবং পরে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলায় গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানো হলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তেমনি ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৫০ বারেরও বেশি মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় অভিযুক্ত হলে বিভিন্ন দল ও সরকারি কর্মকর্তারা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানান। এসব ঘটনা সাংবাদিক নির্যাতনের যে নির্মম চিত্র তুলে ধরে, তার বিরুদ্ধে মোজাহেদুল ইসলাম সবসময় প্রতিবাদী ছিলেন। বাংলাদেশ আইসিটি জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি হিসেবে তিনি অসংখ্য প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং মানববন্ধনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। প্রযুক্তির পথচলায় এক স্বপ্নবান কলমযোদ্ধা মোজাহেদুল ইসলাম বলেন, “আইটি সাংবাদিকতা করতে গিয়েই বুঝতে পারি, এই খাতে সচেতনতা এখনো পর্যাপ্ত নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই লেখা শুরু করি। এখন সাংবাদিকতার গণ্ডি পেরিয়ে মৌলিক লেখার দিকে মনোযোগ দিচ্ছি। কয়েকটি বই লিখেছি, আরও কিছু লেখার পরিকল্পনা রয়েছে।” লেখালেখির প্রেরণা ও স্বীকৃতি প্রসঙ্গে মোজাহেদুল ইসলাম বলেন, “অ্যাওয়ার্ডগুলো আমাকে আরও ভালো কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। দিনশেষে এই অর্জন আসলে পাঠকদের ভালোবাসার ফল। তারা আমার বই পছন্দ করেছে বলেই কিনেছে।” তিনি আরও জানান, “২০০৩ সালে আমি বাংলা ভাষায় প্রথম বই লেখা শুরু করি। তখন দেখি, দেশে অসংখ্য শিক্ষিত বেকার তরুণ রয়েছে। আমার মনে হয়, তাদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা গেলে, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।” জীবনের পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে মোজাহেদুল ইসলামের স্বপ্ন খুবই স্পষ্ট। তিনি বলেন, “আমি আমার লেখার মাধ্যমে বাংলাদেশের আইসিটি ইন্ডাস্ট্রির কথা দেশ ও বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।” সাংবাদিকতা থেকে সাহিত্য, প্রতিবাদ থেকে প্রেরণা—মোজাহেদুল ইসলামের পথচলা যেন এক নিরন্তর অভিযাত্রা। প্রযুক্তির কলম হাতে, তিনি চলেছেন সমাজ পরিবর্তনের গান গেয়ে। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
