ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বুধবার ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩
কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ আসলে কার, যা জানা গেল
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Tuesday, 26 April, 2022, 4:04 PM

কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ আসলে কার, যা জানা গেল

কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ আসলে কার, যা জানা গেল

রাজধানীর পান্থপথে অবস্থিত স্কয়ার হাসপাতালের উল্টো দিকে গলিপথে ঢুকলেই আবাসিক এলাকা উত্তর ধানমণ্ডি ও কলাবাগান লেক সার্কাস। পথচারী, দোকানি ও এলাকাবাসীর কাছে জানতে চাইলেই সবাই হাতের ইশারায় সামনে দেখিয়ে দিল তেঁতুলতলা মাঠ। সবার পরিচিত জায়গাটি লেক সার্কাস উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে রাস্তার মোড়ে।


সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের বর্ণনা ও নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই জায়গাটি পরিত্যক্ত।



নাজমা আছিরন নামের এক বিহারি নারী ছিলেন এই ৩২ শতক জমির মালিক। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দেশ ছেড়েছেন। সেখানে একটি তেঁতুলগাছ থাকায় জায়গাটি তেঁতুলতলা নাম পায়।


এই খোলা জায়গায় উত্তর ধানমণ্ডির বাসিন্দারা ঈদের নামাজ পড়ে। ঈদের জামাতের ইমামের জন্য একটি মিম্বারও করা আছে। আবার মহল্লার কেউ মারা গেলে গোসলের জন্য একটি পাকা ঘর তৈরি করা আছে ওই জমিতে। সেখানে জানাজাও হয় স্থানীয়দের। এর বাইরে প্রায় সারা দিনই শিশু-কিশোররা এই মাঠে খেলাধুলা  করে। স্থানীয় কয়েক প্রজন্ম বড় হয়েছে এই মাঠে খেলাধুলা করে। নানা দিবসে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়। এভাবেই ব্যবহার হয়ে আসছে তেঁতুলতলা মাঠ।


সত্তরোর্ধ্ব জোবেদা বেগম উত্তর ধানমণ্ডির বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘১৯৭০ সাল থেকে আমি এই এলাকায় থাকি। বিহারি এক নারীর জমি ছিল এটি। ’


এলাকাবাসীর পক্ষে আন্দোলন করা এস এম শহিদুল্লাহ সুজা ও মাহবুবুল আলম নথিপত্র দেখিয়ে জানান, নাজমা আছিরন নামের এক নারী এই ৩২ শতাংশ জমির মালিক ছিলেন। আরএস এবং এসএ খতিয়ান অনুযায়ী ওই জমি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসাবে নথিভুক্ত হয়।


নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ২০০৬ সালের পর তেজগাঁওয়ের আওলাদ হোসেন মার্কেটের মনু মিয়ার মেয়ে মমতাজ বেগম ও বেগম জাহান ওই জমির মালিকানা দাবি করে মামলা করেন। বিলকিস বানু নামের ধানমণ্ডির আরেক নারীও জমিটি বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেন। পরে তিনি হাইকোর্টে রিটও করেন।


বিলকিস বানুর স্বামী একজন আইনজীবী। কাজী ওবায়দুর রহমান। তাঁরাও উত্তর ধানমণ্ডির বাসিন্দা। বিলকিস বানু বলেন, ‘এটি সরকারি গ্যাজেটভুক্ত পরিত্যক্ত সম্পত্তি। আমি ভূমিহীন হিসেবে বরাদ্দের জন্য আবেদন করি। বরাদ্দ পেতে আইনগত পদক্ষেপ নিয়ে অনেক দূর এগিয়েছি। ’ তিনিও পুলিশের বাধার মুখে পড়েছেন জানিয়ে বলেন, ‘আমি পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধেও মামলা করেছি। আমি সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ২০১৫ সালে সেখানে একটি ছাপরাও তুলেছিলাম। কিন্তু একটি পক্ষ আমার ঘর ভেঙে দেয়। তখন আমি ভূমি মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে রিট আবেদন করি। ’ তিনি দাবি করেন, ২০১৮ সালে ঘর ভাঙার ঘটনাটি পিবিআই তদন্ত করে এবং তাঁর পক্ষে প্রতিবেদন দেয়। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট তাঁর পক্ষে রুল জারি করেন। পরে পুলিশ মামলা তুলে নিতে তাঁকে চাপ দেয়।


আরো দুই নারীও একই জমির মালিকানা দাবি করে মামলা করেছেন জানালে বিলকিস বানু বলেন, তারা ভুয়া। কথিত মমতাজ বেগম ও বেগম জাহানের নামে গায়েবিভাবে এলএ কেসের নোটিশ দেখানো হয়েছে। এরপর আর কোনো তথ্য দিতে পারেননি বিলকিস বানু। তবে তিনি বলেন, তথ্য গোপন করে খালি দেখিয়ে থানার জন্য জমিটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।


মমতাজ বেগম ও বেগম জাহানের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি।


২০২০ সালে স্থানীয়রা হঠাৎ জানতে পারে, মাঠটি কলাবাগান পুলিশ নিয়ে নিচ্ছে। এর পর থেকেই স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিবাদসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এলাকাবাসী ধরনা দিয়ে আসছে। কিন্তু প্রতিকার মেলেনি। এরই মধ্যে তেঁতুলতলা মাঠে খেলার কারণে একাধিক শিশু-কিশোরকে কান ধরে উঠবস করানোরও অভিযোগ পাওয়া গেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।


স্থানীয় মসজিদের মুসল্লি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘শুধু খেলাধুলা নয়, এখানে ঈদের নামাজ ও মহল্লার কেউ মারা গেলে জানাজাও হয়। জায়গাটি খালি থাকায় অনেকের চোখ পড়েছে জানতাম। এখন দেখি পুলিশ। সবখানে তো আর কথা বলা যায় না। ’


রবিবার প্রতিবাদ করে হয়রানির শিকার সৈয়দা রত্নার মেয়ে শেওতি শাগুফতা বলেন, ‘মূলত ২০২০ সালে আমরা সবাই জানতে পারি, এখানে থানা হবে। করোনার কারণে তৎপরতা বন্ধ ছিল। গত জানুয়ারি মাসে ফের তৎপরতা শুরু হলে প্রতিবাদ করা হয়। রবিবার দেয়াল তৈরির কাজ দেখে আমার মা দ্রুত কী করবেন বুঝে উঠতে না পেরে ফেসবুক লাইভে গিয়ে প্রতিবাদ করেন। ’


গত রবিবার ফেসবুক লাইভে গিয়ে এই মাঠে পুলিশের স্থাপনা নির্মাণকাজের প্রতিবাদ করায় সাংস্কৃতিক কর্মী ও সমাজকর্মী সৈয়দা রত্না ও তাঁর কিশোর ছেলেকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব প্রতিবাদ ও নাগরিক সমাজের তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদের মুখে প্রায় ১৩ ঘণ্টা পর মুচলেকা নিয়ে মা-ছেলেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হলেও গতকাল সোমবার সকালে নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখে পুলিশ। বিকেল ৩টার দিকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও এলাকাবাসী সেখানে গিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করে। তখন কাজ বন্ধ করেন শ্রমিকরা। পরিবেশ ও সংস্কৃতি কর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তেঁতুলতলা মাঠে নির্মাণকাজ বন্ধসহ পাঁচ দফা দাবি জানান। কিন্তু গতকাল রাত পর্যন্ত পুলিশ মাঠে অবস্থান নিয়ে ছিল।


এলাকাবাসী বলছে, উন্মুক্ত জায়গাটি শিশুদের খেলাধুলা, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাজে ব্যবহার হচ্ছিল। ভিন্ন জায়গায় থানা ভবন স্থাপন করে জায়গাটিকে উন্মুক্ত স্থান হিসেবে বরাদ্দ দেওয়ার দাবি করেছে এলাকাবাসী।


গতকাল দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিনটি গাড়ি নিয়ে পুলিশের প্রায় ৩০ জন সদস্য পাহারা দিচ্ছেন তেঁতুলতলা মাঠ। সেখানে কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিক দেয়াল তৈরির কাজ করছেন। মাঠের সামনের রাস্তায় ক্রিকেট খেলছিল কয়েকটি শিশু। বিকেলে প্রতিবাদ সমাবেশের সময় কাজ বন্ধ হতেই মাঠে ঢুকে পড়ে তাদের কয়েকজন। সোহান (১০), ইমন (১০), খলিল (১০), নইম (৬) ও বায়েজিদ (৫) মাঠে ছোটাছুটি করছিল। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সোহান লাটিম নিয়ে খেলছিল। সে বলল, ‘এখানেই আমার বাসা। দুই বছর ধরে বিকেলে মাঠে খেলতে আসি। কয়েক মাস হলো পুলিশ আমাদের খেলতে দেয় না। আজকে অনেক লোক আসছে, তাই ঢুকতে পারলাম। ’


অভিভাবকরা জানান, গত ৩১ জানুয়ারি সকালে তেঁতুলতলা মাঠে থানা ভবন নির্মাণের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়। ওই দিন দুপুরেই থানা পুলিশের ১০-১২ জন সদস্যের উপস্থিতিতে মাঠের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়। মাঠে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার সময় শিশুরা খেলা থামায়নি। সেদিন শিশুদের কয়েকজনকে কান ধরে উঠবস করান পুলিশের কয়েকজন সদস্য। ওই শিশুরা যাতে মাঠে আর খেলতে না যায়, সে জন্য কান ধরে উঠবসের ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারণের হুমকিও দেওয়া হয়।


এ ঘটনা জানাজানি হলে ৬ ফেব্রুয়ারি এক এসআই ও তিন কনস্টেবলকে কলাবাগান থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। ওই ঘটনায় তদন্ত কমিটি হলেও তাঁদের বিরুদ্ধে আর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status