মরিশাসে একই কোম্পানিতে মেয়েকে ধর্ষণ, বাবাকে নির্যাতন
পূর্ব আফ্রিকার দেশ মরিশাসে মেয়ে যে কোম্পানিতে ধর্ষণের শিকার হন, সেই একই কোম্পানিতে বাবাকে জিম্মি করে রেখে মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। প্রথমে মেয়ে ও পরে বাবা দেশে ফিরে এ ঘটনার বিচার চেয়েছেন। ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত কোম্পানির মালিক ভিনদেশি হলেও তাঁকে এ কাজে সহযোগিতা করেন কয়েকজন বাংলাদেশি।
ধর্ষণের একপর্যায়ে ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে মরিশাসের একটি ক্লিনিকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয়। ওই নারী দেশে ফিরে মামলা করেছেন। মরিশাসে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনের মাধ্যমে অভিযোগ পেয়ে দেশটির পররাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয় বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি মামলা করেছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি মরিশাসের গণমাধ্যমেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ধর্ষণের শিকার নারী অভিযোগ করছেন, মামলা তুলে নিয়ে আপস করা এবং তা না করলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন এ ঘটনায় অভিযুক্ত বাংলাদেশিরা।
গত বুধবার এই বাবা ও মেয়ের সঙ্গে কথা হয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মরিশাস পৌঁছানোর পর সেখানে ফায়ার মাউন্ট টেক্সটাইল কোম্পানিতে হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন মেয়ে। আর গত ২৮ ডিসেম্বর মেয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন। তাঁর বাবা মরিশাস গিয়েছিলেন গত বছরের নভেম্বরে আর দেশে ফিরেছেন গত ৩০ আগস্ট।
মেয়েটির বাবা বললেন, তাঁর মেয়ের জীবন একদম শেষ। তিনি প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবেন, তা ভাবতেও পারেননি। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, মরিশাসে বাংলাদেশের হাইকমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের চাপে বাবা-মেয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন বলে তিনি জানালেন। সংশ্লিষ্ট এই সংস্থাগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন তিনি।
গত ১০ জুলাই ঢাকার রামপুরা থানায় পেনাল কোড, ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধনী ২০০৩) এবং ২০১২ সালের মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের পৃথক ধারায় জোরপূর্বক শ্রম শোষণ, ধর্ষণ ও ধর্ষণে সহায়তা এবং গর্ভপাত ঘটানোর অপরাধে আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ওই নারী। এর আগে তিনি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে সাহায্য চান। এর আগে তিনি আত্মহত্যাও করতে চেয়েছিলেন, তবে পরিবারের সহায়তায় বেঁচে যান।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন টেলিফোনে বলেন, মরিশাসে নির্যাতনের শিকার মেয়ের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে মেয়ে ও তাঁর বাবাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। মন্ত্রণালয় বিদেশে এ ধরনের নির্যাতনের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বদ্ধপরিকর।
মেয়ে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর দেশে ফিরে আসতে চান। দেশে ফেরার জন্য বাবাকে ওই কোম্পানিতে বাবুর্চি হিসেবে কাজে পাঠাতে বাধ্য হন মেয়ে। মেয়ের ভাষায়, তাঁর বাবাকে জিম্মি রাখতে বাধ্য করা হয়। তাই দেশে ফেরার আগেই ওই কোম্পানিতে বাবা কাজ নিলেও তিনি তাঁর বাবাকে নির্যাতন সম্পর্কে কিছুই জানাতে পারেননি। দেশে ফিরে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন মেয়ে। চিকিৎসা বিষয়ে ও বাবা সেখানে আছেন, সেই চিন্তায় আইনের আশ্রয় নিতে দেরি করেন। পরে মামলা করেন এবং একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল তাঁকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি আলোচনায় আসে।
মামলা ও সংবাদ প্রকাশের পর মরিশাসে তাঁর বাবার ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। ধর্ষণের শিকার মেয়েটির জন্ম ১৯৯৯ সালে। প্রথমে তাঁর বাবা বিদেশ যেতে চেয়েছিলেন আর্থিক অবস্থা উন্নয়নের আশায়। তবে বাবার সঙ্গে মেয়েকে দেখে রিক্রুটিং এজেন্সি গোলাম রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল থেকে বলা হয়েছিল—মেয়ে একবার বিদেশ যেতে পারলে তিনিই তাঁর বাবাকে বিদেশ নিতে পারবেন। বাবার দুর্দশা দেখে তখন মেয়ে নিজেই বিদেশ যেতে চেয়েছিলেন। মরিশাসে যাওয়ার পর এক সপ্তাহ ভালো ছিলেন। এরপরই কোম্পানির মালিক অনিল কলির নজর পড়ে তাঁর ওপর। নানা মানসিক নির্যাতন এবং কোম্পানিতে কর্মরত বাংলাদেশিদের সহায়তায় ওই নারীকে ধর্ষণ করেন কোম্পানির মালিক। ধর্ষণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মালিক কয়েকবার এবং পরে ওই কোম্পানির ক্যানটিন ইনচার্জ বাংলাদেশি মোহাম্মদ শাহ আলমও তাঁকে ধর্ষণ করেন। তারপর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে কোম্পানির হোস্টেল থেকে শাহ আলম ওই নারীকে তাঁর বাসায় রাখেন এবং পরে জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটান একটি ক্লিনিকে নিয়ে। নির্যাতনের শিকার নারী কোম্পানি থেকে পালিয়ে গেছেন, এ অভিযোগও আনা হয়েছিল। দেশে ফিরে কোম্পানির মালিক ও ধর্ষণের সহযোগী হিসেবে কোম্পানিতে কর্মরত শাহ আলম, ফুরকান, সিদ্দিক, আসলামসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ওই নারী।
মেয়ে মরিশাসে ধর্ষণসহ অন্যান্য নির্যাতনের কথা যখন বলছিলেন, তখন পাশে বসে এই বাবা ফুপিয়ে কাঁদতে থাকেন। জানালেন, মেয়ে মরিশাসে থাকা অবস্থায় যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতেন, তখন সঙ্গে শাহ আলম বা অন্য কেউ না কেউ থাকতেন। বুঝতেন মেয়ে কিছু বলতে চাইছেন, কিন্তু কিছুই বলতে পারতেন না মেয়ে।
দেশে ফিরে মেয়ে মামলা করার পর এই বাবাকে ১৫ দিন নজরবন্দী করে রাখা, থানায় মিথ্যা অভিযোগ করে হাতকড়া পরিয়ে থানায়ও নেওয়া হয়। তখন ওই দেশের এক মানবাধিকারকর্মীর মধ্যস্থতায় তিনি ছাড়া পান। মেয়েটির বাবার নামে টাকা চুরির মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, ঘরের বিছানা থেকে মুঠোফোন চুরি যাওয়াসহ নানা ঘটনা ঘটতে থাকে তখন।
এই বাবা বলেন, ‘আমাকে শাহ আলম বলতেন, বাঘের খাঁচায় থেকে বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করা চলে না। এখানে মেরে সাগরে ভাসিয়ে দিলে কেউ জানতে পারবে না বলেও হুমকি দিতেন।’
শাহ আলমের সঙ্গে কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড দিয়েছেন এই বাবা। তাতে শাহ আলম বলেন, মেয়ের মান–ইজ্জত যা যাওয়ার, তা তো গেছেই। মামলা করে তাঁকে এবং কোম্পানির মালিককে যদি জেল খাটানো হয়, তাহলেও তো সেই মান-ইজ্জত ফেরত আসবে না। অথচ মেয়ের বাড়াবাড়িতে ঘটনাটি মরিশাসের গণমাধ্যমেও চলে আসছে। তিনি নিজেও এতে ফেঁসে গেছেন। বিষয়টি অনেক ওপরের পর্যায়ে চলে গেছে। থানা–পুলিশ, মিডিয়া কী করতে পারবে; তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শাহ আলম। তাই যা ক্ষতি হওয়ার, তা তো হয়েই গেছে, এখন আপস করে ফেলাই ভালো।
পরে শাহ আলম তাঁর ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন, তাতে তিনি দাবি করেন, মেয়েটি তাঁর সঙ্গে একজন স্বামী-স্ত্রী যেভাবে থাকে, সেভাবেই ছিলেন। তাহলে ধর্ষণের অভিযোগ আসে কীভাবে?
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল ইসলাম মেয়ের নির্যাতন এবং বাবাকে জিম্মি করে নির্যাতন করার বিষয়টি লিখিতভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে জানান। শরিফুল ইসলামের এ অভিযোগের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা জানতে চেয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চায় কমিশন। পরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আদেশে মরিশাসে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, অন্য নারী কর্মীদের সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে কি না, তার প্রকৃত তথ্যচিত্র, রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, এমন সব বিষয় ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জানাতে বলা হয়েছে।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল ইসলাম বলেন, নারীরা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে ধর্ষণ বা অন্যান্য নির্যাতনের শিকার হলে তার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে, তা সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ব্যর্থতা। তিনি বলেন, ‘বিদেশে কাজ করতে গিয়ে একজন নারীও যেন নির্যাতনের শিকার না হন। নির্যাতনের শিকার হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। শ্রমবাজারে তা প্রভাব ফেলবে কি না, এসব ভেবে পিছু হটার কোনো কারণ নেই।’
শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত দেশে হওয়া মামলায় একজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাই মামলায় খুব বেশি অগ্রগতি হয়েছে, তা বলা যাচ্ছে না। তদন্তের প্রয়োজনে মরিশাসে যেতে হবে সংশ্লিষ্টদের। বিদেশে এ ধরনের নির্যাতন হলে সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার কার কী ভূমিকা, তা সুনির্দিষ্ট করে একটি ফ্রেমওয়ার্ক বা কৌশলপত্র চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। মরিশাস সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নিতে চাইছে, এটি একটি ভালো দিক। এখন বাংলাদেশ সরকার দায়ী ব্যক্তিদের সাজার আওতায় এনে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক, তা–ই চাই।’
নির্যাতনের শিকার ওই নারী গত ২০ জুন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বরাবর নিয়োগকর্তা ও সহযোগী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে লিখিত আবেদন করেছিলেন। এ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচের জন্য ভুক্তভোগী মেয়েকে এক লাখ টাকা দিয়েছে।
মরিশাসে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রেজিনা আহমেদ বলেন, নারীরা অবশ্যই বিদেশে কাজের জন্য যাবেন, তবে নারীর অধিকার ও কল্যাণ অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। রেজিনা আহমেদ আরও বলেন, নির্যাতনের শিকার মেয়ে মরিশাসে থাকা অবস্থায় কোনো অভিযোগ করেননি। দেশে ফিরে মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করলে মন্ত্রণালয় সে অভিযোগ পাঠায় মরিশাসে। মরিশাস সরকার তদন্ত করার জন্য দেশটির পররাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি মামলা করেছে। বাবা ও মেয়েকে নিরাপদে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
রেজিনা আহমেদ বলেন, মরিশাসে ২৫ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। তাঁদের মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা পাঁচ হাজারের কিছু বেশি। এই নারীর অভিযোগটিই দেশটিতে নারী শ্রমিকদের কাছ থেকে পাওয়া প্রথম অভিযোগ। মরিশাস সরকারের সহায়তায় বিষয়টির আইনি সুরাহা করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
ঢাকার রামপুরা থানায় মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, মামলায় এখন পর্যন্ত রিক্রুটিং এজেন্সির একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলায় অভিযুক্ত আসামিদের বেশির ভাগই মরিশাসে অবস্থান করছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ভিনদেশিও আছেন। করোনায় অনলাইনের মাধ্যমে বিদেশ থেকে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিছু অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
এই বাবা দেশে অটোরিকশা চালাতেন। তিনি মরিশাস যেতে খরচ করেছেন আড়াই লাখ টাকা। তাঁর দুই মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আর ছোট মেয়ের মরিশাস যেতে খরচ হয়েছিল ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
এই বাবা বললেন, বাবা ও মেয়ে দেশে ফিরে এলেও প্রকৃত ঘটনা কাউকে জানাতে পারছেন না। এই মেয়ের বিয়ে কীভাবে দেবেন, তা–ও চিন্তার বিষয়। বাংলাদেশের যে চিকিৎসক মেয়েকে দেখেছেন, তিনি জানিয়েছেন, গর্ভপাতের ঘটনায় মেয়ের ভবিষ্যতে মা হওয়ার ক্ষেত্রেও বাধার সৃষ্টি করবে।
এই বাবা বললেন, ‘সরকারের সহায়তায় মেয়েসহ জীবিত দেশে ফিরতে পেরেছি। এখন আমার অবস্থা রাস্তার একজন ভিক্ষুকের চেয়েও খারাপ। আমি চাই আমি ও আমার মেয়ে যেন ন্যায়বিচার পাই।’