শুক্রবার, ০৬ আগস্ট, 2০২1
নতুুন সময় ডেস্ক
Published : Saturday, 8 May, 2021 at 4:24 PM
করোনার নাম শোনেনি কেউ, দরকার পড়েনি মাস্ক-ভ্যাকসিনের!

করোনার নাম শোনেনি কেউ, দরকার পড়েনি মাস্ক-ভ্যাকসিনের!

আন্নামালাই টাইগার রিজার্ভ। ঘন সবুজ গাছপালা আর চড়াই-উতরাইয়ে ভরা জঙ্গল। পাহাড়ের কোলে একদিকে জীববৈচিত্র‍্যের অবাধ বিস্তার। অন্যদিকে দু’ধারে বসতি বেঁধেছে নানান জনজাতি। পুলায়ার এমনই একটি আদিবাসী সম্প্রদায়। এর দু’টি শাখা— কাট্টুপাত্তি আর কুজুপাত্তি। করোনার বিষদাঁত যখন গোটা দেশে ত্রাস সৃষ্টি করেছে, তখন এই দুই সম্প্রদায়ের একজন মানুষও তা টের পাননি।

না, মূল সমাজ থেকে এঁরা মোটেও বিচ্ছিন্ন নন। দূরত্ব আছে, কিন্তু ন্যূনতম যোগাযোগের সুতোটা আলগা হয়ে যায়নি। তাহলে কীভাবে অতিমারীর আঁচ থেকে এঁরা বেঁচে গেলেন? স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকার বাসিন্দাদের জবানিতে উঠে এসেছে সেই ছবি।

আন্নামালাইয়ের ঘন অরণ্যে পুলায়ার জাতির মোট ১৫০টি পরিবারের বাস। রোজকার দরকারি জিনিসটুকু আনতেই শহরে যাওয়া। এ ছাড়া চিকিৎসার জন্য মাঝেমধ্যে সমতলে নামতে হয়। নইলে বছরের প্রায় পুরোটাই দুর্গম পাহাড়ে থেকে কেটে যায়।

বছর সাঁইত্রিশের এস. সেলভি তিন সন্তানের মা। তাঁর বক্তব্য, ‘খুব প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাই না। ইদানীং শুনছি করোনা নামে কী একটা রোগ এসেছে। নীচে সবাই মাস্ক পরে চলাফেরা করছে। এই কারণে আমরা শহরে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।’

শহর বলতে মোট দু’টি গন্তব্য। এক, আট্টাকাত্তি। যেখানে যেতে হলে পায়ে হেঁটে ৭ কিলোমিটার জঙ্গল পেরোতে হয়। তারপর আলিয়ার থেকে বাস ধরে সোজা শহর। অন্যদিকে ডাক্তার দেখানোর ঠিকানা এরিসিনামপত্তি। মেরেকেটে ৪০ কিমির পথ। একবারে পৌঁছনো যায় না। দু’বার গাড়ি বদলে হাসপাতালে যান কেউ কেউ।

যদিও আজকাল তার তেমন দরকার পড়ছে না। স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে নার্স, চিকিৎসকেরা মাসে একবার হাজিরা দিচ্ছেন। সঙ্গে গর্ভবতী মহিলা ও সদ্যোজাতদের জন্য টিকা কিংবা ওষুধ। তাঁদের মুখেই ‘থারুপ্পুসি’-র কথা শুনছেন কেউ কেউ। সেটা খায় না মাথায় দেয়, সেলভির কাছে বিষয়টা ঠিক স্পষ্ট নয়। কানাঘুষো খবর, করোনাকে আটকাতে টিকা দেওয়া হবে। ভ্যাকসিনেশন, থুড়ি ‘থারুপ্পুসি’-কে নিয়ে হাজারো গুজব ইতিমধ্যে আন্নামালাইয়ের উপত্যকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

কিন্তু এভাবে সমাজের মূলধারা থেকে অনেকটা আলাদা হয়ে থাকতে অসুবিধা হয় না? প্রশ্ন শুনে পাহাড়ি গ্রামবাসীদের মুখের ভাষা এতটুকু বদলায় না। বরং পাল্টা প্রশ্ন ভেসে আসে। কীসে খামতি রয়েছে? ইতিমধ্যে পাহাড়ের বুকে সোলার সিস্টেম বসানো হয়েছে। সেখানেই মোবাইলের ব্যাটারি দিব্যি চার্জ দেওয়া যায়। হাতে হাতে স্মার্টফোন নেই বটে। কিন্তু যাদের আছে, তারা হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের মতো বেসিক অ্যাপ ব্যবহার করতে জানে। ছেলেরা বড় হলে ট্রাইবাল হস্টেলে পড়তে চলে যায়। সেখানে থেকে আইটিআই, এসএসএলসি-র মতো কোর্স শেষ করে। তারপর চাকরি জুটলে লেগে পড়ে, নয়তো গ্রামে ফিরে খেতিবাড়ি কিংবা হাতের কাজে ভিড়ে যায়।

কিন্তু সামাজিক সচলতা তো এভাবে থামিয়ে রাখা যায় না। ইতিমধ্যে এলাকার তরুণদের মধ্যে শহরে যাওয়ার ঝোঁক বেড়েছে। ফরেস্টের কাজ করেন যাঁরা, তাঁদেরও কাজের সূত্রে বাইরে যেতে হয়। তাই করোনার আঁচ আজ না হোক কাল জনজাতিগুলির মধ্যে ছড়াতেই পারে।

বিপদ বুঝে সতর্ক হচ্ছে প্রশাসন৷ তামিলনাড়ু ‘একতা পরিষদে’র তরফে এস থানরাজ বলেন, ‘আদিবাসীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে৷ স্থানীয় স্বাস্থ্য দফতরের উচিত পাহাড়ি উপত্যকার মানুষদের এ বিষয়ে সচেতন করা।’ একতা পরিষদও ইতিমধ্যে আন্নামালাইয়ের প্রায় ৩৫টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ওয়াশেবল মাস্ক বিলি করেছে। ভাইরাসের শক্তি আর ধরন-ধারন নিয়েও বার্তা প্রচার করা হয়েছে।

কুজুপাত্তি আর কাট্টুপাত্তির কেউই অবশ্য এতে বিশেষ চিন্তিত নয়। বৃহস্পতিবারও ধূমধাম করে বাড়ি বাড়ি পুজোআর্চা চলেছে। মন দিয়ে লৌকিক দেবতা ভাইরাপত্তনের আরাধনা করলে ‘থারুপ্পুসি’-র দরকার পড়বে না। আজও মনেপ্রাণে একথা বিশ্বাস করেন সেলভি।



পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


DMCA.com Protection Status
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, বাড়ি ৭/১, রোড ১, পল্লবী, মিরপুর ১২, ঢাকা- ১২১৬
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
Developed & Maintainance by i2soft