ভারতের আসাম সীমান্ত গলিয়ে নতুন ৪টি পয়েন্টে আসছে ইয়াবা। কুড়িগ্রামের রৌমারী টু জামালপুর মহাসড়কটিকে ইয়াবা পাচারের নতুন রুট বানিয়েছে আন্তর্জতিক ইয়াবা পাচার চক্র। এ রুটে একাধিক হাতবদল হয়ে রাজধানীসহ দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে ইয়াবার বড় বড় চালান।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের বৈরী সম্পর্কের ফলে টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় নতুন এ রুট চালু করেছে ইয়াবা পাচারের একাধিক সিন্ডিকেট। প্রতিদিনই বিপুল ইয়াবা সীমান্ত গলিয়ে নতুন পদ্ধতিতে ও নতুন রুটে আসছে বাংলাদেশে।
৯ আগস্ট রাজধানীর রামপুরায় ভারতের আসামের নাগরিক ছবুর মিয়া ও রৌমারীর তেকানী ঝগড়ার চর গ্রামের জাকির হোসেন ও শামসুল আলম ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হলে ইয়াবা পাচারের নতুন রুটের খবরটি ফাঁস হয়।
নতুন এই রুটে মাঝেমধ্যেই বড় বড় চালান ধরা পড়ছে আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে। তবে পাচারের তুলনায় উদ্ধার, গ্রেপ্তার ও মামলার সংখ্যা কম বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। এ রুটের প্রবেশ পথ খোদ রৌমারী থানা পুলিশের হাতে ইয়াবা উদ্ধার মাত্র ২২৮ পিস ও ১১ গ্রাম ইয়াবার গুড়া। গ্রেপ্তার হয়েছে ১১জন।
কুড়িগ্রামের রৌমারী থানার ওসি আবু মো. দিলওয়ার হাসান ইনাম এ প্রতিবেদককে বলেন, সীমান্তে ইয়াবা পাচার রোধের মূল দায়িত্ব বিজিবির। বিজিবি নাইট পেট্রোলসহ সীমান্তে টহল জোরদার ও নিয়মিত অভিযান তৎপরতা শক্তিশালী করলে পাচার কিছুটা কমে আসার সম্ভবনা রয়েছে।
ওসি আবু মো. দিলওয়ার হাসান ইনাম পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে দাবি করলেও পাচারের তুলনায় ইয়াবা উদ্ধার খুবই সীমিত। জামালপুরের দুই উপজেলা বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ এবং কুড়িগ্রামের উলিপুর, নাগেশ্বরী, রাজিবপুর ও রৌমারী উপজেলায় অনুসন্ধান এবং সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলগুলোর লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হুন্ডি ব্যবসারীরাই এই ইয়াবা পাচারের সাথে জড়িত। বাংলাদেশী ইয়াবা সিন্ডিকেটের হুন্ডির টাকা যাচ্ছে ভারতে, বিনিময়ে ইয়াবা পাঠাচ্ছে সেখানকার মাদক কারবারীরা।
ভারতের আসামের সীমান্তঘেঁষা কুড়িগ্রামের ৪টি উপজেলা ও জামালপুরের দুই উপজেলার সীমান্তের কাঁটাতার গলিয়ে স্থলপথে ও নদীপথে আসছে ইয়াবার চালান। পরিবহনে সহজতর ও অধিক লাভজনক হওয়ায় বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ইয়াবার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের মধ্যে ইয়াবার ট্রানজিট পয়েন্ট কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা।
জেলার রৌমারীসহ উলিপুর, নাগেশ্বরী ও রাজিবপুর উপজেলার সীমান্তের ওপার থেকে আসা ইয়াবার ডাম্পিং স্টেশন রৌমারী হয়ে রৌমারী টু জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ-ঢাকা রুটে নানা পরিবহনে ও নানা কায়দায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে ইয়াবা। পাচারের ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে নারী, শিশুসহ নানা বয়সের সীমান্ত এলাকার দরিদ্র মানুষ। ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ভাড়ায় খাটা এসব নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোররা রাজধানীসহ নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে ইয়াবার চালান।
বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, রৌমারী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা নাইট কোচের ড্রাইভার ও হেলপাররা এই ইয়াবার চালান পরিবহনের সাথে জড়িত। রৌমারীর পরিবহন সেক্টরকে ম্যানেজ করেই বাস-সিএনজিসহ নানা পরিবহনে ভাড়ায় খাটা ইয়াবার ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত নারী-পুরুষ-শিশু-কিশোরদের মাধ্যমে পাচার হচ্ছে ইয়াবার চালান। এছাড়া পাচার হচ্ছে ব্যক্তিগত পরিবহনের মাধ্যমেও।
যেভাবে আসছে ইয়াবার চালান
মিয়ানমার থেকে আসামের ইয়াবা পাচারকারীরা চালান এনে মাইনকার চর সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। বৈধ পথেও ইয়াবা পাচারের অভিযোগ উঠেছে। মাইনকার চর ইমিগ্রেশন হয়ে পাসর্পোটধারী যাত্রী ও পাথরসহ মালবাহী গাড়িতে কুড়িগ্রামের রৌমারীর বাংলা বাজার ইমিগ্রেশন দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে ইয়াবার বড় বড় চালান। আসামের পাসর্পোটধারী নাগরিক ছবুর মিয়া এ পথেই বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে লাগেজে ১০ হাজার পিস ইয়াবা নিয়ে ঢাকায় অবস্থানকালে আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর কাছে গ্রেপ্তার হয়। গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে এ রুটে বেশ কয়েকটি চালান এনেছেন বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে ভারতীয় এই মাদক পাচারকারী।
মোবাইল নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে মাদকের চালান নিয়ে ভারতের আসামের মাইনকার চর ও বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ফুলবাড়ি সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে নেমে আসে ইয়াবা পাচারকারীরা। দুই পাশের কৃষিজমিতে কৃষক-কৃষাণীর ছদ্মবেশে ইয়াবার চালান আদান-প্রদান হয়। এছাড়াও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ক্রিকেট বলের মতো স্কচটেপ দিয়ে পেচিয়ে, সিগারেটের প্যাকেটে ভরে কাঁটাতারের ওপার থেকে ঢিল মেরে এপারের নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা হয়। আগে থেকেই মোবাইলে স্থান ও সময়ের কথা বলা থাকে। রাখালের ছদ্মবেশে গরু চরাতে গিয়ে কিংবা ঘাস কাটবার ছলে এসব ইয়াবা সংগ্রহ করে ভাড়ায় চালিত লোকজন। সীমান্ত এলাকায় যাদের জমি আছে তারাও কৃষিকাজের জন্য ক্ষেতে গিয়ে ইয়াবা সংগ্রহ করে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়।
এছাড়া নদীপথেও ইয়াবা পাচার হচ্ছে। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা সীমান্ত পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদীতে পলিথিনে, ব্যাগে, প্লাস্টিকের বোতলে করে ইয়াবা বেঁধে গরুর সাথে ভাসিয়ে দেয়া হয়। এই চোরাই গরুর প্রতিটি হালে থাকে একজন করে কামলা। তারা বাংলাদেশ সীমান্তের নদীর এপার পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যায়। হাত বদল হয়ে উলিপুরের সংগ্রহকারীরা গরুসহ ইয়াবার চালান পাচারকারীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। বিনিময়ে পাচ্ছে ৫ থেকে ৬শ টাকা।
নাগেশ্বর উপজেলার সীমান্ত দিয়েও ইয়াবার চালান আসছে। উলিপুর ও নাগেশ্বরের ইয়াবার চালান সিএনজি, মোটর সাইকেল ও ভ্যানগাড়ি যোগে রৌমারী ও রাজীবপুরে পৌঁছে। সময় সুবিধা মত এসব চালান নাইটকোচসহ নানা পরিবহনে রৌমারী-বকশীগঞ্জ-জামালপুর ও রৌমারী-দেওয়ানগঞ্জ-জামালপুর রুটে হাত বদল হয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে যাচ্ছে ইয়াবার চালান।
ইয়াবা পাচার সিন্ডিকেট
ইয়াবা পাচার ঘিরে কুড়িগ্রমের ৪টি ও জামালপুরে ২টি উপজেলায় গড়ে উঠেছে শক্তিশালী একাধিক সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটের মূল হোতা রৌমারীর বামুনের চর গ্রামের মজিবর রহমানের ছেলে হুন্ডি ব্যবসায়ী মিনহাজ উদ্দিন। দীর্ঘদিন ধরে মিনহাজ গরু পাচার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত ছিল। গরু পাচার বন্ধ হওয়ায় সে নেমে পড়ে হুন্ডি ব্যবসায়। তার সাথে যোগ দেয় মোকছেদ মিয়ার ছেলে আক্কাছ, বক্কারের ছেলে হযরত আলী, মজিবরের ছেলে মুন্নাফ, গনির ছেলে আলম, মপুর ছেলে বিষু, চাঁন মিয়ার ছেলে আজাদ, আব্দুল শেখের ছেলে ইকবাল, আলীর ছেলে ফুল মিয়া ও লাল মিয়া, আয়নাল আলীর ছেলে ছোবার, সাইজুদ্দিনের ছেলে মতিয়ার, তারার ছেলে রাজ্জাক, চাঁন মিয়ার ছেলে আমজাদ, লুৎফর, শাহীন, সাকোয়াত, আক্কাছ, আজাদ, আজাহার, ফকির চাঁন, রনজু, তায়েজ, ইরশাদ, মিজান, শহিদ, আশরাফুল, শফিকুল, আনিস জামাল, মালু, আলম মেম্বার ও মালেকসহ প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ। এরা রৌমারীর বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা।
দেওয়ানগঞ্জ থানার ওসি এমএম মইনুল ইসলাম বলেছেন, এই রুটে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। নিয়মিত টহল বৃদ্ধি করেছি। সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তি ও পরিবহন পাওয়া মাত্রই চেকিং করা হচ্ছে।
তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী দেওয়ানগঞ্জ পুলিশের হাতে জুলাই মাসে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে ৪ হাজার ৮শ ৭ পিস। ২৬ জন আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার ২৪জন। মামলার সংখ্যা ১৭টি।
আগস্ট মাসে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে ১৩ হাজার ৯শ ৩৫ পিস। ২১ জন আসামির মধ্যে গ্রেফতার ১৯ জন। মামলার সংখ্যা ১৬টি। এ মাসে ৮ তারিখ পর্যন্ত ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে ৬ হাজার ২শ ২ পিস। ১০ জন আসামির মধ্যে গ্রেফতার হয়েছে ৯ জন। মামলার সংখ্যা ৮টি।
বকশীগঞ্জ থানার ওসি মো. হযরত আলী বলেছেন, আমার এরিয়ায় চেকপোস্ট বসানো হবে। কোনো পরিবহন চেকিং ছাড়া যেতে দেয়া হবে না। এলাকাবাসীদের নিয়ে এ রুটে ইয়াবা পাচার বন্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবো।
জামালপুরের পুলিশ সুপার মো. দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, রৌমারী-জামালপুর মহাসড়কে সাম্প্রতিক ইয়াবার বড় বড় চালান ধরা পড়েছে। এ রুটে ইয়াবার চালান বন্ধে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। ঘন ঘন তল্লাশি চালিয়ে বড় বড় চালান ধরা হচ্ছে, পাচারকারীদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। গ্রেপ্তারকৃতরা রৌমারী, রাজিবপুর, উলিপুরের মানুষ। ইয়াবা পাচারে কোনোভাবেই জামালপুরের পথ ব্যবহার করতে দেয়া হবে না পাচারকারীদের। পাচারসহ মাদক ব্যবসায়ী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেয়া হবেনা। ইয়াবা পাচার জিরো টলারেন্সে আনা হবে।
৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল নজরুল ইসলাম ইয়াবা পাচার নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বলেন, ইয়াবা পাচার তো হাওয়া থেকে হয় না, মানুষেই পাচার করে। পাচারের সাথে বিজিবি’র কোনো সদস্য জড়িত থাকলে তাদের বাড়ি চলে যেতে হবে। পাচার বন্ধে বিজিবির টহল ও নজরদারি জোরদার করা হবে। সেই সাথে বেশি বেশি সচেতনমুলক সভা-সেমিনার করে সীমান্ত এলাকার মানুষকে সচেতন করতে হবে। এই পাচার বন্ধ করতে হলে বিজিবি, পুলিশ, র্যাবসহ সমাজের নানা শ্রেণিপেশার মানুষের সম্মিলিত প্রয়াসে ইয়াবা পাচার বন্ধ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।