|
প্রকৃতির পালাবদলে বদলে যাচ্ছে শীতের চিরচেনা রূপ
সানজিদা আক্তার সাথী, কুবি প্রতিনিধি
|
![]() প্রকৃতির পালাবদলে বদলে যাচ্ছে শীতের চিরচেনা রূপ কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বদলে যাচ্ছে সেই পরিচিত দৃশ্যপট। অগ্রহায়ণ পেরিয়েও অনেক সময় গরমের অনুভূতি কাটছে না। দিনের বেলায় কোথাও কোথাও ফ্যান কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র চালাতে হচ্ছে। আবার শীতের প্রকৃত তীব্রতা অনুভূত হচ্ছে দেরিতে। কখনো পৌষের শেষদিকে, কখনো মাঘের মাঝামাঝি এসে মিলছে শীতের আমেজ। তাই প্রশ্ন উঠছে আমাদের চেনা শীতকাল কি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে? প্রকৃতির এই পালাবদলে ক্রমেই হারাচ্ছে শীতের চিরচেনা আমেজ। বদলে যাচ্ছে শীতের চেনা ছন্দ বাংলাদেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল হিসেবে বিবেচিত হয়। এ সময় তাপমাত্রা কমে আসে, বাতাসে আর্দ্রতা ও কুয়াশার ধরন বদলায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শীতের আগমন, স্থায়িত্ব ও তীব্রতায় অনিয়মের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কোনো বছর শীত বিলম্বিত হচ্ছে, কোনো বছর স্বল্প সময়ের জন্য তীব্রতা দেখিয়ে আবার হারিয়ে যাচ্ছে। আবার কোথাও কয়েক দিন শৈত্যপ্রবাহের পরই তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। রিসার্চ সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ (আরসিসিসি) প্রকাশিত ২০২৪ সালের বাংলাদেশ বিষয়ক জলবায়ু তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, ১৯৬১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে গড় বার্ষিক তাপমাত্রা প্রতি দশকে প্রায় ০.১ থেকে ০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘ সময়ের এই পর্যবেক্ষণ দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতাকেই নির্দেশ করে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ‘চেঞ্জিং ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও ১৯৮০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার তাপমাত্রা নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৯৮০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত শীতকালে গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রতি দশকে প্রায় ০.৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির প্রবণতা পাওয়া গেছে। তবে এই পরিসংখ্যান ঢাকাকেন্দ্রিক; একে পুরো দেশের শীতের তাপমাত্রার পরিবর্তনের চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও এসব গবেষণা থেকে বোঝা যায়, জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন শীতের পরিচিত বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বছরে শীত দেরিতে আসা বা কম অনুভূত হওয়ার পেছনে বায়ুপ্রবাহ, মেঘের উপস্থিতি, কুয়াশা ও আঞ্চলিক আবহাওয়াগত পরিস্থিতিরও ভূমিকা থাকে। তাই একটি বা দুটি শীতের অভিজ্ঞতা দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পূর্ণ চিত্র ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কুয়াশার আড়ালে দূষিত ধোঁয়াশা শীতের সকাল মানেই একসময় ছিল ঘন কুয়াশার চাদরে মোড়ানো প্রকৃতি। কুয়াশার চাদরে ডেকে যেত দূরের মাঠঘাট, গাছপালা ও পথঘাট। দূরের দৃশ্যও স্পষ্ট দেখা যেত না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেক শহর ও শিল্পাঞ্চলের শীতের সকালের চিত্র বদলে গেছে। ফলে প্রকৃতির স্বাভাবিক কুয়াশার সঙ্গে বায়ুদূষণজনিত ধোঁয়াশার পার্থক্য অনেক সময় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। শীতকালে বাতাসের গতিবেগ কমে যাওয়া, বৃষ্টিপাতের স্বল্পতা এবং বায়ুমণ্ডলের স্থিতিশীল অবস্থার কারণে দূষিত কণা সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। এর সঙ্গে যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা, নির্মাণকাজের ধুলা ও শিল্পকারখানার নির্গমন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে মানুষকে শীতের নির্মল বাতাসের পরিবর্তে দূষিত বায়ুতে শ্বাস নিতে হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘অ্যাম্বিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি ইন বাংলাদেশ’ প্রতিবেদনে শীতকালে বায়ুদূষণের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রীষ্মের তুলনায় শীতকালে ঢাকার আগারগাঁও, সাভার এবং নারায়ণগঞ্জের বাতাসে পিএম ২.৫-এর ঘনত্ব কয়েক গুণ বেশি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শীত শুধু তাপমাত্রা কমার ঋতু নয়, অনেক এলাকায় এটি বায়ুদূষণের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। দূষিত বায়ুর এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগা মানুষের ওপর। ফলে শীতের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নির্মল বায়ু নিশ্চিত করাও এখন বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষি ও জীববৈচিত্র্যে পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের কৃষি, বিশেষ করে শীতকালীন ফসল উৎপাদনের সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। শীতের তাপমাত্রা, কুয়াশা, শিশির ও সূর্যালোকের ওপর অনেক ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নির্ভর করে। তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা, অনিয়মিত শীত কিংবা দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে। শীতকালীন সবজি, আলু, সরিষা ও অন্যান্য ফসলের জন্য নির্দিষ্ট আবহাওয়াগত পরিস্থিতি প্রয়োজন। তাপমাত্রা বেশি থাকলে কোনো কোনো ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। আবার অতিরিক্ত কুয়াশা ও আর্দ্রতা কিছু ফসলে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। এতে কৃষকদের উৎপাদন পরিকল্পনা ও চাষাবাদের কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হয়। শুধু কৃষিই নয়, আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে জীববৈচিত্র্যেও। শীতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনচক্র তাপমাত্রা ও ঋতুর পরিবর্তনে প্রভাবিত হতে পারে। পরিযায়ী পাখির আগমন, বিচরণ ও খাদ্যসংগ্রহের ক্ষেত্রেও আবহাওয়ার ভূমিকা রয়েছে। শীতের সময়কাল ও পরিবেশ বদলে গেলে এসব প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে কৃষি উৎপাদন কিংবা জীববৈচিত্র্যের নির্দিষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য শুধু শীতের পরিবর্তনকেই দায়ী করা যায় না। এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রয়োজন পৃথক গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত। তবে এটুকু স্পষ্ট, ঋতুচক্রের পরিবর্তন কৃষি ও প্রকৃতির সামনে নতুন ধরনের অভিযোজনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। হারিয়ে যাচ্ছে শীতের স্মৃতিমাখা আবহ শীত কেবল একটি ঋতু নয়; এটি বাঙালির জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। শীতের সকালে খেজুরের রস, ভাপা ও চিতই পিঠার ঘ্রাণ, বাড়ির উঠানে বসে রোদ পোহানো কিংবা গ্রামের পথে শিশিরভেজা ঘাসের ওপর হাঁটা, এসব অনুষঙ্গই শীতকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাংলায় শুরু হতো পিঠা তৈরির উৎসব। বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা বাড়ত। শিশুরা নতুন শীতের পোশাক পরে আনন্দে মেতে উঠত। কৃষকের ঘরে নতুন ফসল তোলার উচ্ছ্বাস আর মাঠজুড়ে সরিষার হলুদ ফুল প্রকৃতিকে করে তুলত আরও প্রাণবন্ত। সব মিলিয়ে শীত ছিল প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে উৎসবের এক বিশেষ সময়। কিন্তু আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব অভিজ্ঞতার ধরনও বদলাচ্ছে। অনেক এলাকায় শীতের স্থায়িত্ব কমে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। খেজুরের রস সংগ্রহের উপযুক্ত সময়, পিঠা তৈরির আয়োজন কিংবা শীতের সকালে বাইরে বের হওয়ার আনন্দ—সবকিছুই যেন আগের মতো নিয়মিত নয়। বিশেষ করে শহুরে জীবনে শীতের সেই প্রকৃত আবহ অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে। তবে শীতের স্মৃতিমাখা আবহ হারিয়ে যাওয়ার পেছনে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনই দায়ী নয়। নগরায়ণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ক্রমবর্ধমান দূরত্বও এর অন্যতম কারণ। তবু ঋতুর স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন এলে মানুষের জীবনযাপন, সামাজিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক অভ্যাসেও তার প্রভাব পড়ে। শীতকে বাঁচাতে প্রকৃতির সুরক্ষা জরুরি জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর দূর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এর প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তীব্র তাপপ্রবাহ কিংবা শীতের ধরনে পরিবর্তন সবকিছুই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে আসে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৈশ্বিক পর্যায়ে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়েও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ, বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ, জলাশয় রক্ষা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে যানবাহন ও শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মাণকাজের ধুলাবালি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যক্তিগত পর্যায়েও পরিবেশ রক্ষায় সচেতন ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনে বিদ্যুতের অপচয় কমানো, প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশদূষণ রোধে দায়িত্বশীল আচরণ এসব উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। শীত হয়তো আগের মতো একই সময়ে আসবে না; এর তীব্রতা কিংবা স্থায়িত্বেও পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা থামিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ঋতুর পরিবর্তন কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ। তাই প্রশ্নটি শুধু আমাদের চেনা শীতকাল হারিয়ে যাচ্ছে কি না, তা নয়। আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা কেমন প্রকৃতি রেখে যাচ্ছি, সেটিও এখন গভীরভাবে ভাবার সময়।
|
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
