ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ আশ্বিন ১৪৩৩
রড-সিমেন্টের দামে আগুন, পুরোনো রেটে দিশেহারা ঠিকাদার
মো.মোক্তার হোসেন বাবু
প্রকাশ: Tuesday, 22 September, 2026, 5:33 PM

রড-সিমেন্টের দামে আগুন, পুরোনো রেটে দিশেহারা ঠিকাদার

রড-সিমেন্টের দামে আগুন, পুরোনো রেটে দিশেহারা ঠিকাদার

রড-সিমেন্ট থেকে শুরু করে বালু, পাথর ও বিটুমিন-নির্মাণকাজের প্রায় সব প্রধান উপকরণের দাম বেড়েছে। এর সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় ও ব্যাংকঋণের সুদ। ফলে কয়েক বছর আগে নির্ধারিত দরপত্রের রেটে চলমান অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাড়তি আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন ঠিকাদাররা।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, শুধু নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিই নয়, প্রকল্পের বিল পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা, ব্যাংক গ্যারান্টি ও সিকিউরিটির টাকা আটকে থাকা, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং প্রকল্পস্থল বুঝিয়ে দিতে দেরির কারণে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এতে অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

সওজ, এলজিইডি, গণপূর্ত অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের অধীনে চলমান প্রকল্পগুলোতে এর প্রভাব পড়ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। সড়ক-মহাসড়ক, সেতু-কালভার্ট, সরকারি ভবন, রেল অবকাঠামো ও নগর উন্নয়নকাজে বিপুল নির্মাণসামগ্রীর প্রয়োজন হওয়ায় উপকরণের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রকল্প ব্যয়ে।

পুরোনো রেটেই নতুন বাজার

ঠিকাদারদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগে যখন কোনো প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল, তখনকার বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে রেট শিডিউল তৈরি করা হয়। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় রড, সিমেন্ট, পাথর, বিটুমিনসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে গেলে সেই পুরোনো রেটে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে যেসব প্রকল্প ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা অনুমোদন কিংবা প্রশাসনিক জটিলতায় দীর্ঘদিন আটকে থাকে, সেগুলোতে সমস্যা আরও প্রকট হয়। ঠিকাদারদের দাবি, চুক্তি সম্পন্ন হলেও প্রকল্পস্থল সময়মতো বুঝে না পাওয়ায় কাজ শুরু করা যায় না। এর মধ্যে ব্যাংক সিকিউরিটি আটকে থাকে এবং ঋণের সুদ বাড়তে থাকে।

একজন ঠিকাদার বলেন, দরপত্রের সময় যে দামে রড, সিমেন্ট ও অন্যান্য উপকরণ কেনার হিসাব করা হয়েছিল, কাজ শুরুর সময় সেই দাম অনেক বেড়ে যায়। ফলে চুক্তিমূল্যের মধ্যে কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়।

ব্যাংক ঋণ ও সিকিউরিটিতে বাড়ছে চাপ

নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেক ঠিকাদার ব্যাংকঋণ ও চলতি মূলধনের ওপর নির্ভর করেন। ঋণের সুদ বাড়লে প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যয়ও বেড়ে যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে ব্যাংক গ্যারান্টি ও সিকিউরিটির অর্থ দীর্ঘদিন আটকে থাকায় নতুন কাজে বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে বলে দাবি ঠিকাদারদের।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ঠিকাদার সমিতির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ আলাউদ্দীন বলেন, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণে ঠিকাদাররা এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছেন। এর সঙ্গে অনেক ঠিকাদারের কোটি কোটি টাকা ব্যাংক সিকিউরিটি হিসেবে আটকে আছে।

তিনি বলেন, অনেক ঠিকাদার ব্যাংকের পে-অর্ডারের বিপরীতে ঋণ নিয়ে প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করেন। কিন্তু সরকারি কোনো জটিলতায় সময়মতো কাজ শুরু বা শেষ করা না গেলে ঋণের সুদের বোঝা বাড়তে থাকে। আইনি জটিলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও বিল পরিশোধে দেরির কারণে অনেক ঠিকাদার লোকসানের মুখে পড়ছেন।

আলাউদ্দীন বলেন, সরকারি কোনো জটিলতা বা বিলম্বের কারণে ঠিকাদার যাতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। ব্যাংকঋণের সুদের চাপ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিগত পদক্ষেপও প্রয়োজন।

প্রকল্পস্থল না পেয়েও আটকে থাকে টাকা

বাংলাদেশ ঠিকাদার সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ সামছুল কাউনাইন (কুতুব) বলেন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণেও অনেক ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করতে পারেন না।

তাঁর ভাষ্য, সরকারি প্রকল্পে কাজের জন্য অনেক সময় নির্ধারিত জায়গা যথাসময়ে ঠিকাদারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় না। ফলে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরও কাজ শুরু করা সম্ভব হয় না। অথচ ব্যাংক সিকিউরিটির টাকা আটকে থাকে এবং ঋণের সুদ বাড়তে থাকে।

তিনি বলেন, বছরের পর বছর সিকিউরিটির অর্থ আটকে থাকায় ঠিকাদারদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি চাপও বাড়ছে। এ ধরনের সমস্যা দ্রুত সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

নিয়মিত রেট শিডিউল হালনাগাদের দাবি

ঠিকাদারদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি নির্মাণকাজের রেট শিডিউল নিয়মিত হালনাগাদ করা। তাঁদের মতে, কয়েক বছর আগের বাজারদর ধরে তৈরি করা রেট শিডিউল দিয়ে বর্তমান বাজারদরে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা বাস্তবসম্মত নয়।

তাঁরা বলছেন, প্রকল্পের মেয়াদ দীর্ঘ হলে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মূল্য সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কাজের বিল দ্রুত পরিশোধ, ব্যাংক সিকিউরিটি অবমুক্ত করা এবং ঠিকাদারদের জন্য অর্থায়ন সুবিধা সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

জটিলতা কমানোর তাগিদ

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নির্মাণ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা অনুমোদন, প্রকল্পস্থল হস্তান্তরসহ প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত সমাধান করা গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কমবে। এতে একদিকে ঠিকাদারদের বাড়তি অর্থের চাপ কমবে, অন্যদিকে প্রকল্পের ব্যয় ও সময় দুটিই নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।

নির্মাণ খাতের সঙ্গে রড-সিমেন্ট শিল্প, পরিবহন, শ্রমবাজার ও ব্যাংকিং খাতসহ অর্থনীতির বিভিন্ন অংশ সরাসরি যুক্ত। ফলে দীর্ঘদিন নির্মাণকাজে ধীরগতি থাকলে এর প্রভাব সংশ্লিষ্ট ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ওপরও পড়তে পারে।

এ অবস্থায় নির্মাণসামগ্রীর বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ, সময়মতো বিল পরিশোধ, ব্যাংক সিকিউরিটি দ্রুত অবমুক্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বাস্তবসম্মত মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থা চালুর দাবি জানাচ্ছেন ঠিকাদাররা। তাঁদের মতে, সরকারি সংস্থা, ব্যাংক, নির্মাণসামগ্রী উৎপাদক ও ঠিকাদারদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বর্তমান আর্থিক চাপ অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status